বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনার নাম, একটি সংগ্রামের ইতিহাস, একটি অদম্য জাতির পরিচয়। এই দেশ বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে আজ উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে আছে। তবুও প্রশ্ন জাগে, কেন আমরা এখনো কাক্সিক্ষত শৃঙ্খলা, সুশাসন ও ন্যায্যতার জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি? সমস্যার তালিকা দীর্ঘÑ দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্য, প্রশাসনিক জটিলতাÑ সবই যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, এই জটিল সমস্যাগুলোর একটি সহজ, অথচ শক্তিশালী সমাধান রয়েছে। শুধু নিয়ম মানলেই বাংলাদেশের সব কিছু বদলে দেয়া সম্ভব। এটি কোনো কল্পনা নয়, কোনো আবেগতাড়িত উচ্চারণ নয়; বরং একটি বাস্তবসম্মত ও পরীক্ষিত সত্য। নিয়মÑ সভ্যতার প্রথম শর্ত।
সভ্যতার শুরুই হয়েছিল নিয়ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। মানুষ যখন বুঝতে শিখল যে, একে অপরের অধিকারকে সম্মান না করলে সহাবস্থান সম্ভব নয়, তখনই নিয়মের জন্ম। আইন, বিধি, শৃঙ্খলা এসব কোনো রাষ্ট্রের অলংকার নয়, বরং অস্তিত্বের ভিত্তি।
বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই আইন তৈরি করি, কিন্তু মানি না। সড়কে ট্রাফিক আইন আছে, কিন্তু তা ভাঙা যেন এক ধরনের স্বাভাবিক অভ্যাস। সরকারি অফিসে সময়সূচি আছে, কিন্তু তা মানার বাধ্যবাধকতা অনেক ক্ষেত্রে নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নীতিমালা আছে, কিন্তু প্রয়োগে ঘাটতি প্রকট। ফলে নিয়ম বইয়ের পাতায় থাকে, বাস্তব জীবনে নয়।

ঢাকার সড়কে একদিন দাঁড়িয়ে থাকলেই বোঝা যায়Ñ আমাদের সমস্যার বড় একটি অংশের নাম ‘নিয়ম না মানা’। লাল বাতি অমান্য করা, ফুটপাত দখল করা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো এসব যেন দৈনন্দিন চিত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সমস্যার সমাধান কি খুব কঠিন? উত্তর হলো, না। যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ট্রাফিক আইন মেনে চলে, তবে কয়েক দিনের মধ্যেই দৃশ্যপট পাল্টে যেতে পারে। উন্নত বিশ্বের শহরগুলোতে কোনো জাদু নেই; আছে কেবল নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা।

দুর্নীতি আসলে নিয়ম ভাঙার আরেক নাম। যেখানে নিয়ম আছে কিন্তু তা ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়, সেখানেই দুর্নীতির জন্ম। একটি ফাইল দ্রুত এগিয়ে নিতে ঘুষ দেওয়া, টেন্ডারে অনিয়ম করা, ক্ষমতার অপব্যবহার সবই নিয়ম লঙ্ঘনের ফল।
বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি বহুল আলোচিত বিষয়। কিন্তু এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো নিয়ম মেনে চলা এবং নিয়ম প্রয়োগ নিশ্চিত করা। যখন নিয়ম ভাঙার সুযোগ থাকবে না, তখন দুর্নীতিও কমে আসবে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নীতিমালার অভাব নেই। কিন্তু প্রয়োগের সংকট প্রকট। কারিকুলাম আছে, মূল্যায়ন পদ্ধতি আছে, শিক্ষক নিয়োগের নিয়ম আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এসব নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না।
যদি শিক্ষক সময়মতো ক্লাস নেন, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত উপস্থিত থাকে, পরীক্ষায় নকল বন্ধ হয়Ñ তাহলেই শিক্ষার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। এখানে বড় কোনো সংস্কারের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন শুধু বিদ্যমান নিয়মগুলোর কঠোর প্রয়োগ। শৃঙ্খলার অভাবে স্বাস্থ্যখাতে মানবিক বিপর্যয় ঘেটেছে। হাসপাতালে দীর্ঘ লাইন, ডাক্তারদের অনুপস্থিতি, রোগীদের ভোগান্তিÑ এসব সমস্যা প্রায়ই আমরা দেখি। অথচ, স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্ধারিত নিয়মগুলো যদি ঠিকভাবে মানা হয়, তাহলে অনেক সমস্যাই সহজে সমাধান করা সম্ভব। ডাক্তারদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকা, রোগীদের সিরিয়াল মেনে চলা, ওষুধ সরবরাহে স্বচ্ছতাÑ এসবই নিয়মের অংশ। কিন্তু যখন নিয়ম মানা হয় না, তখন সেবার মান কমে যায়।
একটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে প্রশাসনের ওপর। যদি প্রশাসন নিয়ম মেনে চলে, তবে জনগণের আস্থা বাড়ে; আর যদি নিয়ম ভঙ্গ হয়, তবে আস্থা ভেঙে পড়ে।

বাংলাদেশে অনেক সময় দেখা যায়, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয় না। এই বৈষম্য দূর করতে হলে প্রয়োজন নিয়মের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। নিয়ম মানা শুধু রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি ব্যক্তিগত দায়িত্বও। আমরা যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হই, তাহলে সমাজে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
রাস্তা পরিষ্কার রাখা, নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এসব ছোট ছোট নিয়ম মানার মধ্যেই বড় পরিবর্তনের বীজ নিহিত থাকে। নিয়ম মানলেই গতি পাবে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি।
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করে নিয়মের ওপর। কর প্রদান, ব্যবসায়িক নীতিমালা অনুসরণ, শ্রম আইন মেনে চলা এসবই অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। বাংলাদেশে যদি সবাই নিয়মিত কর প্রদান করে এবং ব্যবসায়িক নৈতিকতা বজায় রাখে, তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও দ্রুত হতে পারে।

রাজনীতিতেও নিয়ম মানার সংস্কৃতি প্রয়োজন। রাজনীতি একটি দেশের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। কিন্তু যদি রাজনৈতিক অঙ্গনে নিয়ম মানার সংস্কৃতি না থাকে, তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে। সংবিধান মেনে চলা, নির্বাচনী বিধি অনুসরণ, সহনশীলতা বজায় রাখা এসবই নিয়মের অংশ। এগুলো মানা হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব। নিয়ম মানতে নাগরিকের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কেন নিয়ম মানি না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মানসিকতায়। আমরা অনেক সময় মনে করি, নিয়ম ভাঙা কোনো বড় বিষয় নয়; বরং এটি এক ধরনের বুদ্ধিমত্তা। এই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। নিয়ম মানা দুর্বলতার নয়, বরং শক্তির পরিচয়, এই ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা অত্যন্ত উচ্চ। সড়কে শৃঙ্খলা, প্রশাসনে স্বচ্ছতা, শিক্ষায় নৈতিকতা সবকিছুই নিয়মের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। তারা কোনো জাদু দিয়ে উন্নত হয়নি; তারা শুধু নিয়ম মেনে চলেছে। বাংলাদেশও একই পথে এগোতে পারে।

সম্ভাবনার বাংলাদেশে নিয়ম মানলেই পজিটিভ পরির্বতন সম্ভব। বাংলাদেশের সম্ভাবনা অপরিসীম। তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিÑ সবকিছুই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি।
কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন নিয়মের প্রতি অটল শ্রদ্ধা। পরিবর্তনের সূচনা আমাদের হাতেই।
বাংলাদেশ বদলাতে কোনো অলৌকিক শক্তির প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই বড় কোনো বিপ্লবের। প্রয়োজন শুধু একটি ছোট, কিন্তু শক্তিশালী সিদ্ধান্ত, আমরা নিয়ম মানবো। যদি প্রতিটি নাগরিক নিজ নিজ জায়গা থেকে নিয়ম মেনে চলে, তাহলে পরিবর্তন অনিবার্য। সড়ক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানÑ সবখানেই শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
তাই আজ সময় এসেছে নিজেকে প্রশ্ন করারÑ আমি কি নিয়ম মানছি? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে পরিবর্তনের পথে আমরা এক ধাপ এগিয়ে গেছি। আর যদি ‘না’ হয়, তবে এখনই সময় নিজেকে বদলানোর। কারণ সত্যটি খুবই সর শুধু নিয়ম মানলেই বাংলাদেশের সব কিছু বদলে দেয়া সম্ভব।
লেখক: উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews