জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কানাডাজুড়ে দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাতের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকায় আগুন আর আগের মতো রাতের বেলায় দুর্বল হচ্ছে না। ফলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই সমান তালে জ্বলছে বনাঞ্চল, আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা।
কানাডিয়ান ইন্টারএজেন্সি ফরেস্ট ফায়ার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশজুড়ে ৮৫৭টিরও বেশি দাবানল সক্রিয় রয়েছে। শুধু বৃহস্পতিবারই নতুন করে ২৩টি দাবানলের সূত্রপাত হয়েছে। এর মধ্যে অন্টারিওর লেক সুপিরিয়রের উত্তরাঞ্চলের আগুন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় থান্ডার বে অঞ্চলের কাছাকাছি প্রায় ১৫টি এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে রাতের বেলা তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় এবং বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় আগুনের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পেত। সেই সময় দমকল বাহিনী ভারী যন্ত্রপাতি ও স্প্রিঙ্কলার ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সুযোগ পেত। কিন্তু এখন রাতের তাপমাত্রাও অনেক বেশি থাকায় সেই সুবিধা আর মিলছে না।
অ্যালবার্টা ফায়ার চিফ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রধান র্যান্ডি শ্রোডার বলেন, আগুনের এই নিরবচ্ছিন্ন ২৪ ঘণ্টার বিস্তার দমকলকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে দাবানল নিয়ন্ত্রণের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
দাবানলের ধোঁয়া এখন কানাডার সীমান্ত ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা (এনওএএ) জানিয়েছে, আপার মিডওয়েস্ট, গ্রেট লেকস ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বায়ুদূষণজনিত সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মিশিগান ও মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসসহ কয়েকটি অঞ্চলে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না গিয়ে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কানাডিয়ান ওয়াইল্ডল্যান্ড ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেম জানিয়েছে, অধিকাংশ দাবানল এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে অন্টারিওর পশ্চিমাঞ্চলের বড় দাবানল থেকে সৃষ্টি হওয়া ঘন ধোঁয়ায় থান্ডার বে ও টরন্টোর বায়ুর মান মারাত্মকভাবে অবনতি হয়েছে। একই সঙ্গে অপেক্ষাকৃত হালকা ধোঁয়া গ্রেট লেকস অতিক্রম করে নিউইয়র্ক পর্যন্ত পৌঁছেছে, যার ফলে আকাশ ধোঁয়াটে দেখা যাচ্ছে এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি লালচে দেখাচ্ছে।
কানাডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিসের দাবানল বিজ্ঞানী শিয়ানলি ওয়াংয়ের সহ-রচিত ২০২৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৭৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উত্তর আমেরিকায় দাবানল সক্রিয় থাকার সম্ভাব্য সময় প্রায় ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। গবেষকদের মতে, এই বৃদ্ধির বড় অংশই ঘটছে রাতের বেলায়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের ভাষ্য, গত এক শতাব্দীতে রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার অনেক অঞ্চলে দিনের তুলনায় বেশি। ফলে বনাঞ্চল দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে এবং দাবানল আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস