দূর থেকে দেখলে মনে হতো পাহাড়ঘেরা এক শান্ত শিক্ষানগরী। সবুজ পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে ছিল লালচে ইটের স্থাপনা, ধ্যানকক্ষ, পাঠশালা ও আবাসিক বিহার। সকালবেলায় ঘণ্টাধ্বনি আর বৌদ্ধ মন্ত্রপাঠের সুরে মুখর থাকত চারপাশ। বিশাল প্রাঙ্গণ ঘিরে সারিবদ্ধ কক্ষগুলোতে চলত পাঠদান। ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ভিক্ষু, পণ্ডিত ও শিক্ষার্থীদের পদচারণে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত প্রাচীন পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়।

ইতিহাসগ্রন্থগুলোর বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে পণ্ডিতবিহারকে অনেকটা এমন শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করা যায়। বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এর স্থাপত্য ও শিক্ষাকাঠামোয় তৎকালীন প্রাচীন বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুস্পষ্ট প্রভাব ছিল। নালন্দা ও বিক্রমশীলার আদলে এখানে আবাসিক ব্যবস্থাসহ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষালয় পরিচালিত হতো। ধারণা করা হয়, অন্তত ১৮টি পৃথক শিক্ষাকেন্দ্র নিয়ে গড়ে উঠেছিল পুরো প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি বিহারে শিক্ষক, ভিক্ষু ও শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল স্বতন্ত্র আবাসন ও পাঠব্যবস্থা।

প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডেই অবস্থিত ছিল—এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য থাকলেও এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে রয়েছে মতভেদ। একদল গবেষকের মতে, দশম শতাব্দীতে (মতান্তরে অষ্টম শতকে) চট্টগ্রাম নগরের রংমহল পাহাড় এলাকায়, বর্তমান জেনারেল হাসপাতাল–সংলগ্ন স্থানে এর প্রতিষ্ঠা হয়। অন্যদিকে কেউ কেউ পটিয়ার চক্রশালা, আনোয়ারার দেয়াঙ পাহাড় কিংবা সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় এলাকাকে পণ্ডিতবিহারের সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

গবেষকদের মতে, পাল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক ধর্মপালের শাসনামলেও পূর্ব বাংলায় বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটে। অষ্টম শতকে তিনি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে সাম্রাজ্যকে উত্তর ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। বৌদ্ধধর্মের গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি বহু বিহার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তাঁর আমলে বাংলায় জ্ঞানচর্চা, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ যোগাযোগের প্রসার ঘটে। সেই সময় বাংলার বিভিন্ন বিহার তিব্বত, নেপাল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য–গবেষক আহমদ শরীফ তাঁর ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, নালন্দাবিহারের প্রভাব কমে আসার পর চট্টগ্রাম বৌদ্ধধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর মতে, চট্টগ্রামের পণ্ডিতবিহারের খ্যাতি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত ছিল। লোকশ্রুত অনুযায়ী, এ বিহার সীতাকুণ্ড বা চক্রশালা এলাকায় অবস্থিত ছিল। এ ছাড়া পণ্ডিতবিহার ও তীর্থিকদের সঙ্গে বৌদ্ধভিক্ষুদের শাস্ত্রীয় বিতর্কের বর্ণনা থেকে ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকেই চট্টগ্রাম বিদ্যাচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews