এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব ও নাটের গুরু, আয়নাঘরের কারিগর, গুম, খুন ও দুর্নীতি সাথে জড়িত সাবেক ডিজিএফআইয়ের শীর্ষ দুই সেনা কর্মকর্তা সাবেক লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন ও শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও তদন্তকারী সংস্থার কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ডিবির দায়িত্বরত কর্মকর্তা, ডিবিপ্রধানসহ কোনো কর্মকর্তাই দুই আসামির দেয়া তথ্য গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করছেন না।
তবে এক-এগারোর দুই কুশীলব লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন ও শেখ মামুন খালেদের অপকর্ম একে-একে বেরিয়ে আসছে ভুক্তভোগী এবং সমাজমাধ্যমে।
স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী ও সমাজমাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনকে সামনে রেখে তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার বারীর স্থলে তারই যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বসানো হয় তদানীন্তন কর্নেল শেখ মামুন খালেদকে। তিনি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার বাসিন্দা বলে প্রতিষ্ঠালাভের আশায় সেখানে অনেক অর্থকড়ি খরচ করে এলাকার প্রতিষ্ঠিতদেরকে আরো প্রতিষ্ঠিত এবং অপ্রতিষ্ঠিতদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেন। আদতে তার বাড়ি গোপালগঞ্জে নয়।
এক-এগারোর সেনা শাসন আমলে ভবিষ্যৎ বিবেচনায় রেখে শেখ মামুন খালেদ সাবজেলে থাকা সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার আস্থা অর্জনের জন্য স্ব-উদ্যোগে একই ধরনের আপ্যায়ন, উভয়কেই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশ্বাস দিয়ে সবকিছুই করেন। যদিও ওই সময়কার ডিজিএফআইয়ের তার সহযোগী কিছু সেনা কর্মকর্তা, যাদেরকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই মামুন খালেদের দ্বৈত চরিত্রের সাক্ষী হওয়ার অপরাধে ঢাকায় আসার পথ রুদ্ধ করে দেন। তৎকালীন কর্নেল মামুন খালেদ রাতারাতি প্রমোশন পেয়ে ভেল্কিবাজির মাধ্যমে প্রথমে ব্রিগেডিয়ার, এরপর মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি ও পরে ডিজিএফআইয়ের ডিজি হওয়ারও সুযোগ তৈরি করে নেন। সুতরাং তার জেনারেল হওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল চাতুর্যে ভরা।
তথ্য অনুযায়ী ২০০৭ সালের রাজনৈতিক দুর্যোগের মধ্যে মামুন খালেদ তার খালাতো ভাই শরীফ শাহ কামাল তাজকে খুলনা বিএনপির সাধারণ নেতা থেকে শীর্ষ নেতার কাতারে অধিষ্ঠিত করতে চান। তিনি নিজে দুই নেত্রীকে যেমন একই মেনুতে খাবার খাওয়ান এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখান, অন্য দিকে খালাতো ভাইকে বিএনপির শীর্ষ নেতা বানাতে কলকাঠি নাড়েন। এরই ধারাবাহিকতায় তখন মামুন খালেদের সহযোগিতায় তার খালাতো ভাই শরীফ শাহ কামাল তাজ তরুণ নেতা হিসেবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডের নামে খুলনার বিএনপি রাজনীতিতে বেশি সক্রিয় হন এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রচারণা শুরু করেন। মামুন খালেদের ক্ষমতার দাপটে, প্রভাবে ও নির্দেশে তার ভাই তাজকে স্থানীয় প্রশাসন হাই-প্রোফাইল প্রটোকল দেয় এবং যে কোন অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে থাকলে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে থাকতে হতো বিশেষ অতিথি হিসেবে। মামুন খালেদের প্রভাবে তাজ নানা ব্যবসা-বাণিজ্য ও কমিশন বাবদ ওই সময়ই প্রায় দু শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে মামুন খালেদ এক দিকে শেখ হেলালের মামাবাড়ি সূত্রের আত্মীয় বলে পরিচয় দিতে শুরু করেন। অন্য দিকে বিএনপি ঘরানায় লাইন রাখার দ্বৈত চরিত্রটিও অনুসরণ করেন। বিএনপির সাথে যোগাযোগের কৌশল হিসেবে খালাতো ভাইকে বিএনপির কাছে আইটি বিশেষজ্ঞ বলে পরিচয় দেয়ার ব্যবস্থা করেন এ মামুন, যদিও তার খালাতো ভাই মূলত পড়াশোনা করেছেন কমার্স বিষয়ে। চলচ্চিত্র জগতে সুপরিচিত শাহ কামাল তাজ, ২০০৯ সালে সুপার হিরো এবং সুপার হিরোইনদের নাম ঘোষণা ও পুরস্কার প্রদান করে বিশেষভাবে আলোচিত হন। উক্ত অনুষ্ঠানের পর থেকেই মামুন খালেদের কাছে তাজ আরো যোগ্য হয়ে ওঠেন। তিনি মামুনের মনোরঞ্জনের জন্য একাধিক সুন্দরী নির্বাচন করেন।
এক দিকে দেশের সেরা দুই দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে তিনি বোকা বানিয়ে নাকানি-চুবানি খাইয়েছেন; অন্য দিকে তিনি ললনাদের রঙ্গমঞ্চে নতুন হিরো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্মিতাসহ অনেকেরই নাম তার নামের সাথে জড়িয়ে রয়েছে।
মামুন খালেদের পারিবারিক অবস্থা : মামুন খালেদের বাবা পুলিশের একজন কনস্টেবল থেকে পদোন্নতি পেয়ে হাবিলদার এবং পরে এএসআই হয়ে অবসরগ্রহণ করে বর্তমানে তারই বাসায় রয়েছেন। তার শ্বশুর শেখ মোহাম্মদ কাশিম একজন চেইনম্যান থেকে ক্রমান্বয়ে পদোন্নতি পেয়ে তহশিলদার হয়ে অবসরে যান। অথচ জামাইয়ের বদৌলতে সে তহশিলদার আজ শত কোটি টাকার মালিক হয়ে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।
মামুন খালেদের বড়ভাই শেখ আলিমুজ্জামান পাকিস্তানে লেখাপড়া করেছেন। সেখানে সেটেল্ড হয়েছেন; কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই মামুন খালেদ তাকে দ্রুত পাকিস্তান হতে প্রথমে সুইজারল্যান্ড, পরে সিঙ্গাপুর এবং সবশেষে বাংলাদেশে (মামুন খালেদ ডিজিএফআইতে থাকাবস্থায়) নিয়ে আসেন। এর মাধ্যমে মামুন খালেদ তার পরিবারের পাকিস্তানপ্রীতির বিষয়টি আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে আড়াল করার চেষ্টা করেন। মামুন খালেদ ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। তার তৃতীয় ভাই শেখ শরীফ ইকবাল পাকিস্তানে প্রথমে মাদরাসায় ও পরে ইসলামী আইন বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে পাকিস্তানেই চাকরি শুরু করেন। পাকিস্তানি গন্ধ ধামাচাপা দেয়ার জন্য মামুন খালেদ তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তিনি দেশে এসে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে ইসলামী আইন পড়াতেন। পরবর্তীতে মামুন খালেদ তাকে দুবাই-এ তারই দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত ধনসম্পদ দেখাশোনার জন্য ‘সেটেল্ড’ করেছেন। চতুর্থ ভাই শেখ মোস্তফা আজিজ তালেবানের সাথে জড়িত হয়ে আফগানিস্তানে যুদ্ধে মারা যায়।
খুলনাবাসী মামুন খালেদকে জামায়াত-বিএনপির একনিষ্ঠ কর্মী জেনেই তার ভাই শাহ কামাল তাজকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে গ্রহণ করে। যদিও নির্বাচনে জয়লাভ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ইতঃপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আরোহণ করার পর খালেদ মামুন মুহূর্তের মধ্যে রাতারাতি দু’টি পদোন্নতি ও ডিজি, ডিজিএফআইর মতো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পদ দখলের সুযোগ বাগিয়ে নেন। এ সুযোগকে কেন্দ্র করে লে. জেনারেল মামুন খালেদ নিজে আওয়ামী লীগের ও ভাই শাহ কামাল তাজের মাধ্যমে বিএনপির সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার পাশাপাশি খুব কৌশলে উভয়কূল রক্ষা করে চলছিলেন। এ ক্ষেত্রে, তিনি উভয় দলের কিছু শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারককে ভয়ভীতি ও অর্থ দিয়ে নিজের কব্জায় রাখেন।
অপর দিকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাংবাদিক আবু রূশদ তার কোর্সমেট লে. জেনারেল (অব:) মামুন খালেদ সম্পর্কে গতকাল নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে মামুনের অপকর্মের তথ্য তুলে ধরেছেন। সামরিক পোশাকে তারা অপশাসনকে সমর্থন দিয়ে দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করা, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে সিন্ডিকেট করা, অবৈধ অর্থের পাহাড় গড়া নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি প্রকাশ পাচ্ছে। গ্রেফতারের পর তাদেরকে রিমান্ডে নিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।
ওয়ান-ইলেভেনের আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো, সিন্ডিকেট করে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা এবং দুদকের মামলায় আরো ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও মানি লন্ডারিংয়ের মোট ১১টি মামলা রয়েছে।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘অস্বাভাবিক প্রভাবশালী’ কর্মকর্তা হয়ে উঠেছিলেন। ‘গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ওই সময় গ্রেফতার ও নির্যাতনের পেছনে তার সরাসরি ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময়ে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে এবং ঢাকার কচুক্ষেতের ডিজিএফআই হেড কোয়ার্টারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এবং বড় বড় ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে। ওই সময়ে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাও অর্ন্তভুক্ত ছিলেন। দুই নেত্রীকে তখন জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় দুইটি পৃথক বাড়িতে অন্তরিন রাখা হয়েছিল।