দুনিয়াজুড়ে সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা কিংবা না রাখা নিয়ে একটি জোরালো বিতর্ক চলছে। কেউ কেউ বলছেন অপরাধ নির্মূলে দৃষ্টান্তমূলক সাজা হিসেবে এটি বহাল রাখা উচিত; আবার কেউ বলছেন, শাস্তি দিয়ে অপরাধ প্রবণতা নির্মূল করা যায় না; তাই এটি পরিহার করাই উচিত। আইনের দৃষ্টিভঙ্গী হচ্ছে প্রয়োজনে ১০ জন অপরাধী মুক্তি পাবে; তবুও যেন একজন নিরপরাধ মানুষের শাস্তি না হয়। বিতর্কে প্রথম পক্ষের যুক্তি হচ্ছে শাস্তির কঠোরতার কারণে অপরাধ-প্রবণতা কমে আসে। ঘৃণ্য মানবতাবিরোধী অপরাধ খুন, মানবপাচার, এসিড সন্ত্রাস, যৌতুকের জন্য হত্যা, শিশু ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ নির্মূলে ফাঁসি বা মৃত্যুদ-ের সাজা বহাল রাখতে হবে। খুনের বদলা খুন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-কে ক্রসফায়ারের নামে আইনের লেবাস পরিয়ে দায়মুক্তি দেয়ার অপচেষ্টাও সভ্যসমাজ দেখেছে। আবার নিরপরাধ মানুষকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা মিথ্যা সাজানো মামলা দিয়ে শক্তিধরদের বিচারের নামে প্রহসনের কথা ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। অন্যদিক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে কখনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায় না; বরং অপরাধীকে তার কাজের জন্য অনুতপ্ত করানোই সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত মনে করে অনেকেই।
আমাদের দেশে মোট ১৭টি আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে এবং সব মিলিয়ে ৬০টি অপরাধ মৃত্যুদ-যোগ্য। বিশ্বে ৯২টি দেশে মৃত্যুদ- আইনত নিষিদ্ধ। আর ৪৬টি দেশে মৃত্যুদণ্ডের কার্যত কোনো প্রয়োগ নেই। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ১৩৮টি দেশ সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করে পর্তুগাল, ১৯৭৬ সালে। আর এই তালিকায় সর্বশেষ যোগ হয় ২০০৮ সালে উজবেকিস্তান ও আর্জেন্টিনা। ২০০৮ সালে বিশ্বে সর্বাধিক মৃত্যুদ- দেয়া হয় চীনে, কমপক্ষে ১৭১৮ জনকে। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি। গত বছর ইরান ও সউদী আরব যথাক্রমে ৩৪৬ ও ১০২ মৃত্যুদ- দেয়। রায় প্রদানের দিক থেকেও সর্বাধিক চীন।
২০০৮ সালে ৭০০৩ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করে চীনে। তার পরের অবস্থান ইরাক ও পাকিস্তানের, যথাক্রমে ২৮৫ ও ২৩৬ বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করা হয়। গত বছর বাংলাদেশের ১৮৫ বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করা হয়। অঞ্চলভিত্তিতে সব থেকে বেশি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এশিয়ায়, প্রায় ৭৬%। আর সব থেকে কম মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় ইউরোপ ও সাব-সাহারান আফ্রিকায়, ইউরোপে শুধু ১টি দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান চালু আছে, সেটি বেলারুশ। অঞ্চলভিত্তিতে ২য় সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড মধ্যপ্রাচ্যে, প্রায় ২১%। এর মধ্যে ইরানে ৩৪৬ ও স্উদী আরবে ১০২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় । যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর ৩৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতে গত বছর মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়। এই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ১৫টি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করা হলো। রাষ্ট্র কর্তৃক জীবন সংহার হচ্ছে সরকার গ্রহণ করতে পারে এমন কঠোরতম ব্যবস্থাগুলোর একটি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বাস করে যে, মৃত্যুদণ্ড জীবনের অধিকারকে লঙ্ঘন করে, অপরাধ কমানোতে এর কোনো সুস্পষ্ট প্রভাব নেই এবং আধুনিক অপরাধ বিচার পদ্ধতিতে এর কোনো স্থান নেই। এখন বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি দেশ আইন করে বা প্রায়োগিকভাবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে মৃত্যুদণ্ড প্রদানকারী দেশগুলো থেকে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ দেশগুলোর অপরাধ প্রবণতার পরিসংখ্যান থেকেই এটি প্রমাণিত হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ শক্ত। গত বছর বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় পাঁচজনকে এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান হয় ১৮৫ জনকে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩৪টি ধারার মধ্যে ১২টিতেই বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার বিধান ছিল। মৃত্যুদণ্ডের বিধান-সংবলিত ধারাগুলো ছিল ৪, ৫(১) (২) (৩), ৬(১) (২), ৮, ৯(২) ও (৩), ১১ (ক), ১২ এবং ৩০। পরে ৫ ও ৬ ধারার অপরাধ অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ এবং মানব পাচার-সংক্রান্ত দুটি আইনের অংশ হয়ে যাওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইন থেকে এসব ধারা বিলুপ্ত হয়।
যে কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মৃত্যুদণ্ডের ধারার সংখ্যা ৭টি। এখন আবার আইন সংশোধন করে ধারা ৯(১)-এ যাবজ্জীবন শাস্তির পরিবর্তে করা হচ্ছে ‘যাবজ্জীবন অথবা মৃত্যুদণ্ড’। এই সংশোধনীর ফলে আইনে মোট ৮টি ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। প্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীতে অপরাধের শাস্তি হিসেবে বিশেষত হত্যার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদ-ের বিধান আছে। ১৮০০ সালের মধ্যে ব্রিটেনে ২০০টা অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল।
ইসলামিক শরিয়া আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড একটি প্রচলিত শাস্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই বিভিন্ন মানবতাবাদী লেখক, দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারকগণ মৃত্যুদ-ের বিরোধিতা করতে শুরু করেন। এটা মানবতাবিরোধী, অমানবিক ও অধঃপতিত একটা শাস্তি। ১৯৪৮ সালে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত হওয়ার পর ৪টি দেশ অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের আইন বাতিল করে। ১৯৭৭ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ তে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর ১৪০টি দেশ মৃত্যুদণ্ডের আইন বাতিল করে। মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি মানেই রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করা। এ দণ্ড সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের দুটি বিধানকে লঙ্ঘন করে। প্রথমটি হলো জীবনধারণের অধিকার। দ্বিতীয়টি হলো অত্যাচার থেকে মুক্ত হয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১৫০ জন বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, যারা পরবর্তীতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন। অনেক মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রধান ভূমিকা পালন করে, যা অত্যাচার করার মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। সমাজের দরিদ্র শ্রেণি, সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বেশি মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয় বিচার নিরপেক্ষতার অভাবে। দেশে মৃত্যুদণ্ডের আইন রাখা মানবিক আদর্শের পরিপন্থি।
মৃত্যুদ-ের পক্ষে যুক্তি : প্রত্যেক মানুষের বাঁচার অধিকার আছে। যারা সজ্ঞানে একজন মানুষের বাঁচার অধিকার হরণ করে তারা নিজেদের বেঁচে থাকার অধিকারও হারায়। মৃত্যুই তার যথার্থ প্রাপ্য। মৃত্যুদণ্ডের ফলে শুধু হত্যাই নয়, অন্য যেসব অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডর বিধান আছে সেই অপরাধগুলো সহজে করবে না অপরাধীরা। মৃত্যুদণ্ড খুন করতে ইচ্ছুক মানুষদের একটা ভীতির মধ্যে রাখতে সমর্থ্য হয়। মৃত্যুদণ্ড আইন বাতিল হলে অপরাধপ্রবণ লোকদের সাহস বেড়ে যাবে এবং তারা বড় ধরনের অপরাধ করতে উৎসাহিত হবে। বাংলাদেশের অতীতে বহু আলোচিত খুনি এরশাদ শিকদারের কথা কি আপনার মনে আছে? সে ৬০টি খুন করেছিল। ১ম ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের পর যদি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো তবে কি বাকি ৫৯ জন মানুষের জীবন রক্ষা পেত না? অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে যুক্তি হলো অবশ্যই প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার আছে এবং কারো বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করা ঠিক নয়। বিকল্প হিসেবে যদি ৩০ বছর জেল দেয়া হয় তবে তা মৃত্যুর চেয়েও কম হবে না। কেউ বন্দি জীবন চায় না, খাঁচায় বন্দি পাখির জীবন কারোর কাম্য নয়। সবাই আকাশে উড়া পাখির মতো মুক্তভাবে সমাজে চলে ফিরে বেড়াতে যায়।
মৃত্যুদণ্ড আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২ এর পরিপন্থি। মৃত্যুদণ্ডের ফলে একজন সন্তান তার পিতা-মাতার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়। অপরদিকে ভিক্টমেরও জীবন ধারণের অধিকার ও তার পরিবারের দুঃখ যন্ত্রণায় বিষয়টিও প্রণিধানযগ্য। এখানে ক্রিমিনাল বিহেভিয়ার সংশোধনের সুযোগ নেই habitual murderer, cold blooded murder দের ক্ষেত্রে সংশোধনের সুযোগ কম। এজন্য তাদের জন্য মৃত্যুদণ্ড রাখা উচিত। যাতে সমাজে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা যায়। তবে কেউ যদি পরিস্থিতির শিকার হয়ে খুন করে, যেমন জমিজমা বিরোধ, তখন মৃত্যুদণ্ড দেয়া অমানবিক।
মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ক্ষেত্রে অপরাধী কোন সামাজিক অবস্থায়, কোন প্রেক্ষাপটে, কোন অপরাধ করেছে তা ব্যক্তিত্ব বিবেচনায় রেখে এই শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে। কখনো কখনো মৃত্যুদণ্ড বিপরীত প্রভাব ফেলে। যারা জানে যে তাদের মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে তারা তখন তাদের অপরাধের সাক্ষীদের হত্যা করে যারা তাদের চিহ্নিত করতে এবং দোষীসাব্যস্ত করতে সক্ষম হতে পারে। ওপরের বিষয়গুলোর সার্বিক বিবেচনায় সর্বক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান না রেখে বরং, বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে যেমন অভ্যাসগত খুনিদের ক্ষেত্রে তা বহাল রাখা উচিত।
লেখক : আইনবিদ, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী।