গত ১৪ মে সহযোগী একটি দৈনিকে ‘প্রশিক্ষণের গন্তব্য এখন পাকিস্তান’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের গন্তব্য দীর্ঘদিন ধরেই ছিল ভারত। তবে রাজনৈতিক পালাবদলের পর সে কার্যক্রম এখন বন্ধ। তাই প্রথমবারের মতো কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তান গিয়েছেন। এতে আরো বলা হয়েছে যে, নেতৃত্ব ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় সরকারের ১২ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বর্তমানে পাকিস্তানের লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন একজন অতিরিক্ত সচিব ও ১১ জন যুগ্ম সচিব। ৪ মে থেকে শুরু হওয়া এ প্রশিক্ষণ আগামী ২১ মে পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও প্রশিক্ষণের সব ব্যয় পাকিস্তান সরকার বহন করবে। নিয়মানুযায়ী প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তারা সরকারের নিকট প্রতিবেদন পেশ করবেন। বলা বাহুল্য, এর আগে ২০১৪ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দিল্লিভিত্তিক ন্যাশনাল সেন্টার ফর গুড গভর্নেন্সের সাথে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তারা মূলত ভারতের উত্তরাখণ্ডের মুসরির লাল বাহাদুর শাস্ত্রির রাষ্ট্রীয় প্রশাসন একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন।

এর আগে ২০২৫ সালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের প্রাক্কালে উভয় দেশের মধ্যে বিভিন্ন সমঝোতা চুক্তির পাশাপাশি শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও একটি পারস্পরিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং তারই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা, প্রকৌশল, কম্প্যুটার সায়েন্স, সমাজবিজ্ঞান ও হিউম্যানিটিজ বিষয়ে আন্ডার গ্রাজুয়েট, গ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল স্কলারশিপ প্রোগ্রামের অধীনে প্রাথমিকভাবে ৫০০টি বৃত্তি প্রদানের সিদ্ধান্ত হয় যা সম্প্রসারণযোগ্য। এ বৃত্তির অধীনে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের আসা-যাওয়া থেকে শুরু করে ছাত্রাবাসে থাকা-খাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি, বই-পুস্তক ও যাবতীয় শিক্ষা উপকরণ ও গবেষণা বাবত পর্যাপ্ত অর্থ পাবেন। ইতোমধ্যে মাসখানিক আগে এ বৃত্তি নিয়ে ৪৩ জন বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রীর একটি দল পাকিস্তানেও চলে গেছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষা প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তানের এই সমঝোতা ও সহযোগিতার অভিযাত্রাকে আমি অভিনন্দনযোগ্য বলে মনে করি। এটি একটি শুভ লক্ষ্মণ।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার আগে আমি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সংজ্ঞা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। সংজ্ঞা দুটি বৃটিশ ম্যানপাওয়ার কমিশনের রিপোর্ট ১৯৮১ থেকে নেয়া। সংজ্ঞানুযায়ী ‘Education is defined as activities which aim at developing the knowledge, skills and moral values and understanding required in all aspects of life, rather than a knowledge and skill relating to only a limited to field of activaty. The purpose of education is to provide the condition essential to young people and adults to develop an understanding of the traditions and ideas influencing the society in which they live and to enable them to make a contribution to it. It involves study of their own culture and of the laws of nature as well as acquisition of linguistic and other skills which are basic to learning, personal development, creativity and communication

অর্থাৎ জীবনের সীমাবদ্ধ কোনো একটি ক্ষেত্রের জন্য নয় বরং শিক্ষা হচ্ছে মানুষের সামগ্রিক জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট ও প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিক মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত সকল কর্মকাণ্ডের সমষ্টি। শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে, স্বল্প ও প্রাপ্ত উভয় বয়সের সকল মানুষের জন্য এমন একটি প্রয়োজনীয় ও অনুকূল পরিবেশ প্রদান করা যাতে তারা যে সমাজে বসবাস করে সে সমাজকে প্রভাবান্বিত করে এমন সব ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ধারণা বিশ্বাসকে তারা অনুধাবন ও বিকশিত করতে পারে এবং সে সমাজে অবদান রাখতে পারে। এ শিক্ষার সাথে জড়িত আছে তার নিজস্ব সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক আইন ও বিধিবিধান তথা সমাজের প্রচলিত নিয়ম-কানুন, ভাষা ও অন্যান্য দক্ষতার উন্নয়ন যা বিদ্যার্জন, ব্যক্তিসত্তার উন্নয়ন, সৃজনশীলতা এবং যোগাযোগ ও ভাবের আদান-প্রদানের মৌলিক শর্ত।

শিক্ষার উপরোক্ত সংজ্ঞাটির পরিব্যাপ্তি বিশাল। জীনের সর্বক্ষেত্রে বিস্তৃত। বৃটিশ ম্যানপাওয়ার কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত প্রশিক্ষণের সংজ্ঞাটি হচ্ছে নিম্নরূপ :

“Training is a planed process to modify attitude, knowledge or skill behaviour through learning experience to achieve effective performance in an activity or range of activities of the individual and satisfy the current and future manpower needs of the organisation. Development is defined as the growth or realisation of a person’s ability through conscious or unconscious learning.

মোদ্দাকথা প্রশিক্ষণ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাজের জ্ঞান, দক্ষতা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে তাকে অধিকতর উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার নাম। শিক্ষাকে যদি মানব জীবনের ভিত্তি বা মেরুদণ্ড তথা পরিকাঠামো বলা হয় তাহলে প্রশিক্ষণ হচ্ছে তার উপরে তৈরি ইমারত। এটাকে কেউ কেউ উন্নয়ন বা প্রবৃদ্ধিও বলে থাকেন যা সচেতন বা অবচেতনত বিদ্যার মাধ্যমে মানুষের সামর্থ্য বা জেহেন থেকে আদায় করা হয়।

প্রশিক্ষণকে শিক্ষা থেকে আলাদা করা যায় না। কোনো একটা জাতিকেও তার ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাস থেকে আলাদা করা কঠিন। এক্ষেত্রে সাময়িক বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তবে এটা অস্বীকার করা যায় না যে, মানুষের জীবনে কালচার বা সংস্কৃতির প্রভাব অপরিসীম এবং এর সচেতন বিচ্যুতি ব্যক্তির জীবনে বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। কালচার বা ধর্মবিশ্বাসের ক্লোনিংও হয় না।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বৃটিশ কাউন্সিল ইউএসএআইডি, আইবিএফআর, কমনওয়েলথ সচিবালয়সহ অনেকগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই অঞ্চলের ছাত্রছাত্রী এবং সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা-প্রশিক্ষণের ব্যাপারে ব্যাপক সহযোগিতা করে এসেছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বৃটিশ কাউন্সিল এসব স্টাইপেন্ড/ফেলোশীপ সিংহভাগ দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য হ্রাস পাওয়ায় গত তিন দশক ধরে এক্ষেত্রে স্থবিরাবস্থা বিরাজ করে এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে এ বাজার ভারতের হাতে চলে যায় এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার কার্যকারিতা হারায়। অনেকে মনে করেন ভারতের বিদ্যমান অবস্থা ও বুরোক্রেটিক অবস্থা থেকে বাংলাদেশের শেখার মতো কিছু নেই। শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষণার্থীরা সেখানে গিয়ে তাদের কালচার, নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধ হারায়, পাশাপাশি ব্রেনওয়াশেরও শিকার হয়। বলা বাহুল্য, ভারতীয় কালচার ও মূল্যবোধ এবং জীবনাচারের সাথে আমাদের মিল নেই। তাদের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে উচ্চ নিম্নতর সমাজের বরেণ্য ব্যক্তিরা নিজের মূত্র গোমূত্র সেবন করে গর্ববোধ করেন; আমাদের কাছে যা খুবই অপবিত্র। খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ তাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ব্যবস্থাকে সারা দুনিয়ায় নিন্দনীয় করে রেখেছে। সাম্প্রতিককালে সারা ভারতে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন , মসজিদ ভাঙা ও তাতে অগ্নিসংযোগ, নামাযে বাধা ও গরু কুরবানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তাদের চরম সাম্প্রতিদায়িকতারও পরিচয় বহন করে। চিকিৎসাক্ষেত্রে তাদের কিছু কিছু সাফল্য আমাদের আকৃষ্ট করলেও অভ্যুত্থান-উত্তরকালে দেখা গেছে যে পার্শ্ববর্তী অনেক দেশেই তাদের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যায়, এমনকি আমাদের নিজের দেশেও।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিল নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্তিতিতে প্রধান উপদেষ্টা এর সভাপতি। এই কাউন্সিলের কাজ হচ্ছে সরকারি খাতের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার তদারক, বিসিএস কর্মকর্তাদের মৌলিক প্রশিক্ষণের মেয়াদ নির্ধারণ, বিদেশ প্রশিক্ষণের সুপারিশ প্রণয়ন, প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তাদের দক্ষতা জ্ঞান ও আচরণে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ চাহিদা নিরূপণ, কারিকুলাম উন্নয়ন ও সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নীতিনৈতিকতা, আচরণবিধি অন্তর্ভুক্তকরণের বিষয়াবলী বিবেচনা করা প্রভৃতি। বিরাট বহরের এই প্রশিক্ষণ কাউন্সিলটির সদস্যরা কখনো সকলেই এক সাথে বৈঠকে বসতে পারেন কিনা সন্দেহ আছে, তবে এর অধীনে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত একটি সাব কমিটি আছে যা বিদেশ প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। আবার এ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী বিদেশ প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালাও জারি করেন। বছরে একজন কর্মকর্তা কতবার বিদেশে যেতে পারবেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ন্যূনতম কতবছর তার অধিত বিষয়ে কাজ করবেন এবং অবসরে যাবার কত বছর আগ পর্যন্ত প্রশিক্ষণ, ফেলোশীপ, শিক্ষাসফর বা সভা-সমাবেশ অথবা কনফারেন্সে যোগ দেয়ার সুযোগ পাবেন প্রভৃতিও এ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত থাকে।

১৯৮৩ সালে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের আমলে এ কাউন্সিলটি গঠিত হয়েছিল এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই পারিষদটি পরিপূর্ণ সক্রিয় ছিল। এরশাদ আমলেই ১৯৮৪ সালের ২৮ এপ্রিল সাভারে বাংলাদেশ পাবলিক এডমিনিস্টেশন ট্রেনিং সেন্টার বা বিপিএটিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন সিনিয়র সচিব ড. শেখ মাকসুদ আলী এর প্রথম রেক্টর ছিলেন। খ্যাতনামা সচিবদের মধ্যে জনাব আনিসুজ্জামান, হেদায়েতুল ইসলাম, আবদুস সালাম, ক্ষণদা মোহন দাস প্রমুখ। এই প্রতিষ্ঠানের রেক্টরের দায়িত্ব পালন করেছেন, বর্তমানে জনাব রাকিব হোসেন এ দায়িত্বে আছেন।

জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিলটি পুনরুজ্জীবিত করে তাকে সক্রিয় করে তোলা দরকার। আমাদের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ চাহিদা নিরূপণ কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট, সিলেবাস ও প্রশিক্ষণ সামগ্রির আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত মূল্যায়ন ও পরিধারণের ব্যবস্থা করা হলে প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ হবে এবং তা জাতি গঠনে কাজে আসতে পারে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনবোধে লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমির সহযোগিতাও নেয়া যেতে পারে বলে আমি মনে করি।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews