রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি ব্যাংকে জেনারেল ম্যানেজার গ্রেডে পদোন্নতি দানের জন্য ইন্টারভিউ চলছিল। বাংলাদেশে ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক (যিনি পরবর্তীতে ডেপুটি গভর্নর হয়েছিলেন) জেনারেল পদ প্রত্যাশী কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করছিলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, আচ্ছা বলুন তো দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের দুরবস্থার মূল কারণ কী? পদোন্নতির জন্য ইন্টারভিউ প্রদানকারী কর্মকর্তা কোনো ধরনের দ্বিধা না করেই জবাব দেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভুল নীতির কারণেই ব্যাংকিং সেক্টরে দুরবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থমন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব, যিনি ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিলেন তিনি উত্তরদাতার নিকট জানতে চান বাংলাদেশ ব্যাংকের ভুল নীতির কারণে ব্যাংকিং সেক্টরে কিভাবে দুরবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে একটু ব্যাখ্যা করবেন কি? উত্তরদাতা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে থাকে তার বেশিরভাগই ঋণখেলাপি এবং দুষ্ট গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করে। একজন ঋণ গ্রহীতা যদি বুঝতে পারেন তিনি ৫০ কোটি টাকা ৫ বছর আটকে রাখলে ২ কোটি বা তিন কোটি টাকা সুদ মওকুফ সুবিধা পাবেন তাহলে তিনি ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করে তা আটকে রাখবেন এটাই স্বাভাবিক। আর একজন ঋণগ্রহীতা যদি ৫ বছর ৫০ কোটি টাকা ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করে কোন সুদ মওকুফ সুবিধা না পান তাহলে তিনি নিরূৎসাহিত হবেন এবং পরবর্র্তীতে ঋণখেলাপি হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন।
সেদিন জেনালের ম্যানেজার পদপ্রার্থী ভদ্রলোকের উত্তর শুনে ইন্টারভিউ বোর্ডের সকল সদস্য বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। ইন্টারভিউ বোর্ডে সাধারণত কেউ এমনভাবে উত্তর দেয় না। কিন্তু তিনি এমন উত্তর দিয়েছিলেন রাগে-ক্ষোভে। কারণ তার নিকট ইন্টারভিউয়ের আগে একজন পরিচালক উৎকোচ দাবি করেছিলেন। যেহেতু তিনি বুঝে গিয়েছিলেন তার পদোন্নতি হবে না তাই তিনি এমনভাবে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। জেনারেল ম্যানেজার পদপ্রার্থীর উত্তর অস্বাভাবিক মনে হলেও এটাই বাস্তবতা। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য যেসব নীতি প্রণয়ন করে তার বেশিরভাগই ঋণখেলাপিদের স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত। কিভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে তার কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি একক গ্রাহক সর্বোচ্চ ঋণ সীমা বৃদ্ধি করেছে। আগে কোনো ব্যাংক তার মোট বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ একক গ্রাহক বা কোনো উদ্যোক্তা গোষ্ঠীকে সরাসরি ঋণ হিসেবে প্রদান করতে পারবে। আগে এটা ছিল ১৫ শতাংশ। এছাড়া নন-ফান্ডেড ঋণ দেয়া যেতো ১০ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড মিলিয়ে একক গ্রাহককে মোট ২৫ শতাংশ ঋণ দিতে পারতো। এখন ব্যাংকগুলো চাইলেই ফান্ডেড ঋণ হিসেবে তাদের একক গ্রাহককে ২৫ শতাংশ ঋণ দিতে পারবে। তবে কোনো ব্যাংক যদি একক গ্রাহককে ২৫ শতাংশ ফান্ডেড বা সরাসরি ঋণ দান করে সে ক্ষেত্রে নন-ফান্ডেড ঋণ দিতে পারবে না। কারণ ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড মিলিয়ে মোট ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেয়া যাবে। এ নতুন আইনের ফলে যেসব গ্রাহক কোনো ব্যাংক থেকে একক সীমার বাইরে ঋণ নিয়েছিল তারা সীমার মধ্যে চলে আসবে। আর যারা আগের তুলনায় বেশি ঋণ নিতে চাইবে তারাও সহজেই বর্ধিত আকারে ঋণ নিতে পারবে। দৃশ্যত আইনটি ভালো মনে হলেও এর ক্ষতিকর দিকটি ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ নতুন আইনের সুযোগ নিয়ে একটি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী আগের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি ঋণ নিতে পারবে। বর্তমানে আমরা প্রত্যক্ষ করছি, দেশের ব্যাংক ঋণের বৃহদাংশই সামান্য কয়েকটি উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর হাতে আটকে আছে। এ মুহূর্তে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিস্তৃত করার জন্য ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি সহজীকরণ করা আবশ্যক। কিন্তু সে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। একটি ব্যাংক ইচ্ছে করলে তাদের বিনিয়োগযোগ্য তহবিল মাত্র ৪টি উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর অনুকূলে ঋণ হিসেবে মঞ্জুর ও ছাড়করণ করতে পারে। আমাদের দেশের যেসব উদ্যোক্তা গোষ্ঠী রাজনৈতিক শক্তিতে বলিয়ান তারা চাইলেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পুরো ব্যাংকটিকে বিনিয়োগযোগ্য তহবিল শূন্য করে ফেলতে পারে।
এদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণের উপর বৃহৎ অঙ্কের ঋণদানের যে সীমারেখা ছিল তাও শিথিল করা হয়েছে। আগে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ শতাংশের কম তারা তাদের বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের ৫০ শতাংশ বৃহৎ ঋণ হিসেবে প্রদান করতে পারতো। নতুন আইনে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশ তারাও বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের ৫০ শতাংশ বড় আকারের ঋণ হিসেবে প্রদান করতে পারবে। আর খেলাপি ঋণের হার মোট বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের ১০ শতাংশের বেশি কিন্তু ১৫ শতাংশের কম তারা তাদের মোট বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের ৪৬ শতাংশ বড় ঋণ হিসেবে প্রদান করতে পারবে। খেলাপি ঋণের হার ১৫ শতাংশের বেশি কিন্তু ২০ শতাংশের কম হলে মোট বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বড় ঋণ হিসেবে প্রদান করতে পারবে। খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশের বেশি কিন্তু ২৫ শতাংশের কম হলে বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের ৩৪ শতাংশ বড় আকারের ঋণ হিসেবে প্রদান করা যাবে। আর খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি হলে মোট বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বড় ঋণ হিসেবে প্রদান করা যাবে। যে আইনি সংস্কার করা হয়েছে তা নানা উপায়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করেও যারা ঋণখেলাপির দায়মুক্ত রয়েছেন তাদের স্বার্থ হাসিল করবে। নতুন আইনের বাস্তবায়ন করা হলে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা আরো সংগীন হয়ে পড়বে।
ঋণখেলাপিদের দায়মুক্তি দেবার একটি চমৎকার পন্থা হচ্ছে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ ব্যবস্থা। গতবছর (২০২৫) সেপ্টেম্বর মাসের শেষে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এটা ব্যাংকগুলোর ছাড়কৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ডিসেম্বর, ২০২৫ এসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। এটা ব্যাংকগুলোর ছাড়কৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার এ কৃতিত্বের জন্য অবশ্যই সাধুবাদ পেতে পারতেন যদি বকেয়া কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো যেতো। কিন্তু তারা সেটা করতে পারেননি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর জন্য ব্যাংকগুলো ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ আইনের অপব্যবহার করেছেন মাত্র।
ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ বা লোন একাউন্টস রিশিডিউলিং বলতে সাধারণত এমন একটি ব্যবস্থাকে বুঝায় যেখানে একজন ঋণ গ্রহীতার বকেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা হ্রাস বা বর্ধিতকরণ করা হয়। তবে বাস্তবে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ বলতে আমরা বুঝি যেখানে একজন গ্রহীতার ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়। ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা কমানোর প্রয়োজন হয় না। কারণ ঋণ গ্রহীতা চাইলে সিডিউলকৃত নির্ধারিত সময়ের আগে যে কোন দিন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে দিতে পারেন। এতে ব্যাংক বরং খুশিই হবে। কিন্তু কোন ঋণ গ্রহীতা যদি নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করেন তাহলে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাবটি খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে। বিশেষ যৌক্তিক কোন কারণে একজন ঋণ গ্রহীতা যদি নির্ধারিত সময়ে তার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারেন তাহলে তাকে ঋণখেলাপি তালিকাভুক্ত হবার ঝুঁকি থেকে বাঁচানোর জন্য সাময়িক ভাবে ঋণ হিসাব পুন:তফসিলিকরণ করে দেয়। পৃথিবীর সবদেশেই ব্যাংকিং সেক্টরে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ সুবিধা প্রত্যক্ষ করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো আর কোন দেশে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ সুবিধার অপব্যবহার করা হয় কিনা তা আমার জানা নেই।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায় ১৯৯১ সালে। সে সময় বিএনপি সরকার গঠনের পর উন্নয়ন সহযোগিদের দেয়া শর্তানুযায়ী, ২০ মে বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয় দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে ১৭১ জন বৃহৎ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করে। তালিকায় স্থানপ্রাপ্তদের নিকট ব্যাংকগুলোলোর পাওনা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল দেড় কোটি টাকা থেকে তদুর্ধ। বলা হয়েছিল, পরবর্তীতে এ ধরনের ঋণখেলাপিদের আরো তালিকা প্রকাশ করা হবে। কিন্তু তালিকা প্রকাশের পর দেশের ঋণখেলাপিদের মধ্যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা সরকারের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেন। সরকার এ সময় খেলাপি ঋণের ১০ শতাংশ এককালিন ব্যাংকে নগদ ডাউন পেমেন্ট আকারে জমা দিয়ে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেয়। মূলত সেই সময়ই মানুষ ব্যাপকভাবে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ আইন সম্পর্কে জানতে পারে। এরপর খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ আইনের ব্যবহার চলতে থাকে। মূল আইনে ছিল কোন একটি প্রকল্পের খেলাপি ঋণ হিসাব সর্বোচ্চ তিনবার পুনঃতফসিলিকরণ করা যাবে। প্রতিবারের মেয়াদ হবে তিন বছর করে। প্রথমবার ঋণ হিসাব পুনঃতফিসলিকরণের জন্য খেলাপি ঋণের ১০ শতাংশ, দ্বিতীয়বার ২০ শতাংশ এবং তৃতীয়বারের জন্য ৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট আকারে ব্যাংকে নগদে জমা দিতে হতো।
ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ আইনের বড় ধরনের অপব্যবহার করা হয় ২০১৫ সালে। ২০১৪ সালের বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই সময় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। সরকারের একবছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের বিরোধী দলগুলো সরকারের পতনের দাবিতে দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন স্থানে রহস্যজনকভাবে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সে সময় সরকার সমর্থক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আন্দোলনের সময় তাদের ক্ষতি হয়েছে এ অজুহাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের এক বিশেষ সুবিধা আদায় করে নেয়, যদিও এ ব্যবস্থার নাম দেয়া হয়েছিল ঋণ হিসাব পুনর্গঠন। ৫০০ কোটি টাকা ও তদূর্ধ্ব খেলাপি ঋণের স্থিতি সম্বলিত ঋণ হিসাবগুলো ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলিকরণ করে নেয়া হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যাংকিং সেক্টরে এর আগে আর কখনোই এভাবে ঋণ হিসাব পুনর্গঠন করা হয়নি। সে সময় প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল যে, আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য যদি এ সুবিধা দেয়া হয় তাহলে সেটা সবার জন্য কেন অবারিত করা হলো না? কারণ যারা ৫০০ কোটি টাকার কম ঋণখেলাপি তারা কি আন্দোলনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি? ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ আইনের বড় অপব্যবহার শুরু হয় এখান থেকেই। ঋণ হিসাব পুনর্গঠনের নামে ১১ টি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী ১৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করে নেয় বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে আ হ ম মোস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নগদে প্রদান সাপেক্ষে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেয়া হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ শেষ হবার মাত্র কিছুদিন আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ ব্যাংক আবারো একই ধরনের সুযোগ প্রদান করে। অক্টোবর মাসে এ সুযোগ দেয়া হয়। এতে বলা হয়, ঋণখেলাপিরা নগদ ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট ব্যাংকে জমা দান সাপেক্ষে তাদের খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের জন্য আবেদন জানাতে পারবেন। ব্যাংক আবেদন প্রাপ্তির পর তিন মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা বা আবেদনকারী ২ বছরে গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য তাদের ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করাতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক হঠাৎ করেই কেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এমন একটি সুবিধা প্রদান করলো ঋণখেলাপিদের? অনেকেই মনে করেন, রাজনৈতিক দলের যেসব নেতা-কর্মী ঋণখেলাপি তাদের নির্বাচনের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করার জন্যই এমন একটি সুবিধা দেয়া হয়। কারণ জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় নির্বাচনে কোন ঋণখেলাপি অংশ নিতে পারেন না। বর্তমান জাতীয় সংসদে ৩৯ জন ঋণখেলাপি সদস্য রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের এ বিশেষ সুযোগ দেয়া না হলে তাদের পুরো খেলাপি ঋণ একবারে জমা দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে হতো। বিশেষ ছাড়ে ৩০০টি শিল্প গোষ্ঠী তাদের ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণ করে নেয়। যারা পুনঃতফসিলিকরণের মাধ্যমে ঋণ হিসাব নিয়মিত করে নিয়েছেন তাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আর ঋণখেলাপি বলা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের প্রতি কতটা উদার তার অনেক দৃষ্টান্ত দেখানো যেতে পারে। আগে নিয়ম ছিল কোন উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর একটি প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে পড়লে গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে ব্যাংক ঋণ পাবার ক্ষেত্রে অযোগ্য বিবেচিত হতো।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলের শেষের দিকে এ আইন পরিবর্তন করা হয়। বলা হয়, কোনো উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে পড়লেও অন্যগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তির কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। সম্প্রতি আবারো ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট প্রদান সাপেক্ষে ২ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেয়া হয়েছে।
লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।