‘বাবা, আজ আমরা জিতব তো?’ প্রশ্নটি খুব ছোট। উত্তরটা কঠিন। বাবা সন্তানের দিকে তাকিয়ে হাসেন। ‘জিতব।’

বাবা জানেন না দল সত্যিই জিতবে কি না। ফুটবলে কেউ জানে না। বাবারা সন্তানকে হারার গল্প দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করতে চান না। টেলিভিশনের সামনে পাশাপাশি বসে দুই প্রজন্ম। একজনের চোখে স্বপ্ন। অন্যজনের চোখে স্মৃতি। শিশুটি আজকের নায়কদের চেনে। লামিন ইয়ামাল। কিলিয়ান এমবাপ্পে। জুড বেলিংহাম। আরলিং হালান্ড।

বাবার পৃথিবীতে ছিলেন অন্য নায়ক- ম্যারাডোনা, রোনালদো, জিদান, রোনালদিনিও, মেসি। 

ছেলে গোল দেখে চিৎকার করে। বাবা সেই চিৎকারের ভেতর নিজের শৈশব খুঁজে পান। একদিন তিনিও ছোট ছিলেন। বাবার পাশে বসে বিশ্বকাপ দেখেছিলেন। টেলিভিশন এত বড় ছিল না। ছবিও এত পরিষ্কার ছিল না। কখনো বিদ্যুৎ চলে যেত। গভীর রাতে খেলা দেখতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। বাবা ডেকে তুলতেন, ‘ওঠ, খেলা শুরু হয়ে গেছে।’

সেই শিশুটিও একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাবা, আজ আমরা জিতব তো?’

সময় চলে গেছে। বাবা নেই। কিংবা বয়সের ভারে এখন আর রাত জেগে খেলা দেখেন না। সেই ছোট্ট ছেলেটি নিজেই আজ বাবা। পাশে বসে আছে তার সন্তান।

পৃথিবী বদলে গেছে। টেলিভিশন বদলেছে। স্টেডিয়াম বদলেছে। জার্সির নকশা বদলেছে। মাঠের নায়ক বদলেছে। প্রশ্নটি বদলায়নি। বিশ্বকাপ এভাবেই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যায়। ট্রফি হাতে হাতে বদলায়। নায়ক বদলায়। স্মৃতি থেকে যায়। কোনো বাবার স্মৃতি একদিন সন্তানের স্বপ্ন হয়ে ওঠে।

বাবা বলেন, ‘আমি তোমার বয়সে ম্যারাডোনাকে দেখেছি। রোনালদো কী খেলত, তুমি দেখনি।’ কেউ বলেন জিদানের কথা। কেউ রোনালদিনিওর হাসির কথা। কেউ মেসির বাঁ পায়ের কথা। কেউ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অসম্ভব লাফের গল্প বলেন। শিশুটি সব গল্প বিশ্বাস করে। আবার একটু সন্দেহও করে। তার কাছে পৃথিবীর সেরা ফুটবলার তো ইয়ামাল কিংবা এমবাপ্পে। বাবার নায়করা তার কাছে পুরোনো ভিডিওর মানুষ। বাবা হাসেন।

একদিন তিনিও নিজের বাবার গল্প শুনে এমনই ভেবেছিলেন।

খেলা শুরু হয়। বাবা আর ছেলে পাশাপাশি বসে থাকেন। একটি আক্রমণে দুজন একসঙ্গে সামনে ঝুঁকে পড়েন। একটি শটে দুজন একসঙ্গে চিৎকার করেন। গোল হলে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেন। সেই কয়েক সেকেন্ডে বয়সের পার্থক্য থাকে না। বাবা আবার শিশু হয়ে যান। সন্তান হয়ে যায় তার বন্ধু। ফুটবল এমনই।

একটি বল কখনো দুই প্রজন্মের মাঝখানের দূরত্ব মুছে দেয়। সব ম্যাচ জেতা যায় না।

শেষ বাঁশি বাজে। দল হেরে যায়। শিশুটির চোখে জল। সে চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ আগে যে বিশ্বাস নিয়ে বলেছিল, ‘আমরা জিতব’, সেই পৃথিবী হঠাৎ ভেঙে গেছে। বাবা সন্তানের মাথায় হাত রাখেন।

কী বলবেন? তিনি এই কান্না চেনেন। বহু বছর আগে তিনিও এমন একটি রাতে কেঁদেছিলেন। একটি পেনাল্টি মিসে। একটি ভুলে। একটি শেষ বাঁশিতে। তখন তার বাবাও হয়ত মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘আবার বিশ্বকাপ আসবে।’

আজ একই কথা তিনি নিজের সন্তানকে বলেন। ‘আবার বিশ্বকাপ আসবে।’

চার বছর একটি শিশুর কাছে অনেক সময়। একজন বাবার কাছে খুব বেশি নয়। তিনি জানেন, পরের বিশ্বকাপে সন্তানটি আরেকটু বড় হবে। তার পরেরটিতে হয়ত বাবার চেয়ে বেশি ফুটবল বুঝবে। একদিন হয়ত বাবার পাশে বসার সময়ও থাকবে না। কোনো এক রাতে আবার তারা পাশাপাশি বসবে।

কিছু স্মৃতি মানুষকে ফিরিয়ে আনে। একদিন সেই শিশুটিও বড় হবে। তার পাশেও বসবে ছোট্ট কেউ। টেলিভিশনে তখন নতুন বিশ্বকাপ। নতুন নায়ক। নতুন জার্সি।

হঠাৎ একটি ছোট্ট কণ্ঠ জিজ্ঞেস করবে— ‘বাবা, আজ আমরা জিতব তো?’

সে হয়ত কিছুক্ষণ চুপ থাকবে। নিজের বাবার কথা মনে পড়বে। সেই ঘর। সেই টেলিভিশন। সেই রাত। সেই হার। সেই আনন্দ। তারপর হাসবে। বলবে, ‘জিতব।’

কারণ বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের গল্প নয়। এক বাবার স্মৃতি। আরেক সন্তানের স্বপ্ন। এক প্রজন্মের কান্না। আরেক প্রজন্মের বিশ্বাস। খেলা শেষ হয়। বিশ্বকাপও শেষ হয়। বাবারা একদিন চলে যান। সন্তানেরা বড় হয়ে যায়। একটি প্রশ্ন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে ‘বাবা, আজ আমরা জিতব তো?’



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews