ইরানের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন রাজনৈতিক জুয়া খেলছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তেহরানের সরাসরি হুমকি মোকাবিলায় আবুধাবি এখন বেছে নিয়েছে তেল আবিবের হাত। দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্র সৌদি আরবকে একপ্রকার দূরে ঠেলে দিয়ে এবং ইরানের প্রকাশ্য বিরোধিতা উপেক্ষা করেই ইসরায়েলের সঙ্গে নিজেদের সামরিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও জোরদার করছে আমিরাত। যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক বিশাল বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পর্যটন ও বাণিজ্যের বৈশ্বিক হাব হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৯০ শতাংশ বাসিন্দাই বিদেশি নাগরিক। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাকেই এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে দেশটির নীতি-নির্ধারকেরা। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য আরব দেশগুলোর তীব্র সমালোচনাকে পাত্তা না দিয়ে আবুধাবি বাজি ধরেছে ইসরায়েলের ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, নিজের অস্তিত্ব রক্ষার এই তাগিদ আমিরাতকে এক ভিন্ন মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের দিক থেকে ধেয়ে আসা প্রায় ২৮০০-এর বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সফলভাবে প্রতিহত করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আর এই সুরক্ষার পেছনে নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করেছে ইসরায়েলের সর্বাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’।
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি নিজেই নিশ্চিত করেছেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসরায়েল তাদের আয়রন ডোম ব্যাটারি এবং দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও অপারেটরদের আমিরাতে পাঠিয়েছে, যা আবুধাবির আকাশসীমাকে এক অভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছে।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর মাধ্যমে বাহরাইনের পাশাপাশি প্রথম উপসাগরীয় দেশ হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে চলমান ইরান-ইসরায়েল ও মার্কিন সংঘাতের জেরে এই সম্পর্ক এখন আর কেবল কূটনৈতিক স্তরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রূপ নিয়েছে এক নিবিড় সামরিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে।
থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল মনে করেন, দূরবর্তী ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই আমিরাত ইসরায়েলকে তাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বেছে নিয়েছে।
এই ঘনিষ্ঠতা একদিকে আবুধাবিকে আকাশপথে সুরক্ষা দিলেও, অন্যদিকে চিরবৈরী ইরানের সঙ্গে তাদের উত্তেজনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে। একই সঙ্গে এই পদক্ষেপের কারণে রিয়াদের সাথে আবুধাবির দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশই বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে এই অঞ্চলের প্রধান ‘উচ্ছৃঙ্খল ও আগ্রাসী’ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে এই পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে নাম উল্লেখ না করে বেশ কিছু আরব দেশের ‘ফাঁপা সহমর্মিতা’ ও নিষ্ক্রিয়তার তীব্র সমালোচনা করেছেন আমিরাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
আমিরাত সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক উপদেষ্টা নাদিম কোটিচ এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এটি তাদের দেশের জন্মলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের সংকট। যখন আরব বিশ্বের অনেকেই শুধু মৌখিক উদ্বেগ প্রকাশ করছিল, ঠিক সেই কঠিন সময়ে ইসরায়েলিরা আমিরাতের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এবং কার্যকর সামরিক সহযোগিতা প্রদান করেছে। ফলে আবুধাবির কাছে এখন মধ্যপ্রাচ্যের পুরনো সংজ্ঞার চেয়ে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের সাথে এই ক্রমবর্ধমান মাখামাখির জেরে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক ফাটল এখন সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। গত ডিসেম্বরে ইয়েমেন সংকট নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল, তা আরও তীব্র হয় চলতি মাসে সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ‘ওপেক’ থেকে আমিরাতের নাটকীয়ভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণার মাধ্যমে। এছাড়া আরব লীগের নীতি নিয়েও প্রকাশ্য ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে আবুধাবি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, তারা এখন থেকে নিজেদের স্বার্থে সম্পূর্ণ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে।
আঞ্চলিক এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন যে, তিনি যুদ্ধের মধ্যে অত্যন্ত গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন। যদিও আবুধাবি এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন ইসরায়েলি নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজের রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই নেতানিয়াহু এই গোপন সফরের গল্প ছড়াচ্ছেন।
তবে রটনা যাই হোক না কেন, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে চলা এই ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই যে আরব দেশগুলোর চিরচেনা জোট ও সমীকরণকে চিরতরে বদলে দিচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
সূত্র: ইউরোএশিয়া টাইমস
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ