কানাডায় অনলাইন নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে ফেডারেল সরকার। অটোয়া একটি নতুন ডিজিটাল অ্যান্ড ডেটা প্রোটেকশন কমিশন অব কানাডা গঠনের পরিকল্পনা করছে, যা একই সঙ্গে অনলাইন নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে প্রাইভেসি কমিশনারের হাতে থাকা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর তদারকির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নতুন কমিশনের কাছে চলে যাবে। ফলে ডিজিটাল খাতে নজরদারি, তদন্ত এবং আইন প্রয়োগের ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে একীভূত হবে।

সরকারের যুক্তি হলো, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা সবকিছু এখন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই আলাদা আলাদা সংস্থার পরিবর্তে একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ থাকলে আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে। তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে ইতোমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের একাংশের দাবি, সরকার কার্যত একটি ‘সুপার রেগুলেটর’ তৈরি করছে, যার হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা থাকবে। অন্যদিকে ডিজিটাল অধিকার ও শিশু নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী এবং আধুনিক একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন।

- Advertisement -

লিবারেল সরকার গত জুন মাসে প্রযুক্তি নীতি সংস্কারের অংশ হিসেবে দুটি পৃথক বিল উত্থাপন করে। বিল সি-৩৪ মূলত ডিজিটাল নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। এই বিল অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে ১৬ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীরা প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে না পারে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট ও এআই সেবাদানকারী কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমও এই আইনের আওতায় নিয়ন্ত্রিত হবে। এর লক্ষ্য হলো, অপ্রাপ্তবয়স্কদের অনলাইন ঝুঁকি কমানো এবং এআই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা। অন্যদিকে বিল সি-৩৬ ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে আরও কঠোর নীতিমালা প্রস্তাব করেছে। বিশেষ করে শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উচ্চ মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে। ফলে শিশুদের ডেটা ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

প্রস্তাবিত ডিজিটাল অ্যান্ড ডেটা প্রোটেকশন কমিশন অব কানাডা-তে পাঁচজন কমিশনার থাকবেন। তাদের সবাইকে ফেডারেল মন্ত্রিসভা নিয়োগ দেবে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, কমিশনটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করতে প্রায় ১৮ মাস সময় লাগতে পারে। কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার মধ্যে থাকবে : প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারি করা। আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করা। অনলাইন নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা সংক্রান্ত বিধি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। প্রয়োজন হলে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা আরোপ করা।

প্রস্তাবিত আইনে জরিমানার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান কমিশনের নির্দেশনা অমান্য করলে তাদের ওপর সর্বোচ্চ ১ কোটি কানাডীয় ডলার অথবা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক মোট রাজস্বের ৩ শতাংশ পর্যন্ত লেভি আরোপ করা যেতে পারে। আর যদি অপরাধ গুরুতর বলে বিবেচিত হয়, তাহলে জরিমানার পরিমাণ বেড়ে সর্বোচ্চ আড়াই কোটি কানাডীয় ডলার অথবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক বার্ষিক রাজস্বের ৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এই জরিমানার পরিমাণ কয়েকশ কোটি ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

নতুন কমিশন গঠিত হলে কানাডায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে ডেটা সুরক্ষা, শিশু নিরাপত্তা এবং এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতি অনুসরণ করতে হবে। শুধু আইন মেনে চলাই নয়, নিজেদের প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যালোচনা এবং ঝুঁকি মূল্যায়নও করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মতোই কানাডাও এখন প্রযুক্তি খাতকে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের পথে এগোচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকার একদিকে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার বিশ্বজুড়েই বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সেই বাস্তবতায় কানাডার প্রস্তাবিত নতুন ডিজিটাল নিয়ন্ত্রক সংস্থা শুধু দেশের প্রযুক্তি খাতেই নয়, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, নাকি অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করবে সে প্রশ্নের উত্তর মিলবে আইন কার্যকর হওয়ার পরই।

সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

- Advertisement -



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews