২০২৬ সালে একটি নতুন স্মার্টফোন কিনতে গেলে যদি আপনার মনে হয় দাম আগের চেয়ে বেশি, তাহলে আপনার অনুভূতি ভুল নয়। বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের দাম বাড়ছে এবং বাংলাদেশও এর বাইরে নেই। কিন্তু, এই দামবৃদ্ধির কারণ স্থানীয় কোনো সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সরাসরি প্রতিফলন, যার কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) দ্রুত বিস্তার।

আজকের দুনিয়ায় এআই টুল চালাতে যে পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি দরকার, তার জ্বালানি হলো মেমোরি চিপ। বিশেষত, ডির‍্যাম (ডায়নামিক র‍্যান্ডম অ্যাক্সেস মেমোরি) ও ন্যান্ড ফ্ল্যাশ; এই দুটি চিপ ছাড়া না চলে এআই ডেটা সেন্টার, না চলে স্মার্টফোন।

বর্তমানে সারাবিশ্বেই এআইয়ের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো এআইয়ের পাশাপাশি, যেকোনো ফিচার বা অ্যাপ্লায়েন্সও এখন এআই-নির্ভর হয়ে গেছে। এআইয়ের প্রতি মানুষের নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবেও সক্ষমতা অর্জন করেছে। দেখা যাচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠান অনেক সময় পুরো বছরের মেমোরি চিপ একসাথে অর্ডার করে দিচ্ছে। এই অসম প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অনেক সময়ই স্মার্টফোন উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্বের বড় এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তাদের ডেটা সেন্টারে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। এই ডেটা সেন্টারগুলো হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি (এইচবিএম) দিয়ে পরিচালিত হয়, যা সাধারণ ডির‍্যামের চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক। ফলে স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রনের মতো বিশ্বের শীর্ষ মেমোরি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা এআই ডেটা সেন্টারের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বের এই তিনটি প্রধান মেমোরি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতা এন্টারপ্রাইজ ও হাইপারস্কেল ক্রেতাদের দিকে সরিয়ে নিয়েছে; ফলে, ভোক্তা বাজারে মেমোরি চিপের সরবরাহ কমে গেছে। এমনকি, মাইক্রন টেকনোলজি তার দীর্ঘ ২৮ বছরের পুরনো ‘ক্রুসিয়াল’ ভোক্তা মেমোরি ব্র্যান্ড বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ, এআই-চালিত প্রবৃদ্ধি বড় এন্টারপ্রাইজগুলোকে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

পরিসংখ্যান এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ডির‍্যাম চিপের দাম প্রায় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ ও ন্যান্ড ফ্ল্যাশ চিপের দাম ৫ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০২৬ সালের শুরু নাগাদ মোট মেমোরি চিপের দামবৃদ্ধি প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছে।

বাংলাদেশে এই প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। ঢাকার খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, গত কয়েকমাসে র‍্যাম মডিউল ও মেমোরি-নির্ভর হার্ডওয়্যারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্ট্যান্ডার্ড ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ র‍্যামের দাম ২০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে স্থানীয় বিক্রেতারা জানিয়েছেন। একটি ১৬ গিগাবাইট ডিডিআর৫ ৬০০০ মেগাহার্জ র‍্যাম মডিউল, যার দাম গতবছর অক্টোবরে প্রায় ৭,৮০০ টাকা ছিল, ডিসেম্বর মাসেই তা প্রায় ২৮,৫০০ টাকায় পৌঁছে যায়।

একটি স্মার্টফোনের মোট উৎপাদন খরচের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে মেমোরি চিপ। মিড-রেঞ্জ ফোনে মেমোরি চিপের খরচ মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এই খরচ বাড়লে উৎপাদকদের সামনে তিনটি পথ থাকে, দাম বাড়ানো, স্পেসিফিকেশন কমানো, অথবা এই দুইটির সমন্বয়।

কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে স্মার্টফোনের গড় বিক্রয়মূল্য প্রায় ৬.৯ শতাংশ বাড়তে পারে এবং এক্ষেত্রে, মেমোরি চিপের খরচকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বৈশ্বিক স্মার্টফোন চালান ২.১ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়া ও ভারতে গতবছর নভেম্বরে এবং নেপালে ডিসেম্বরে দামবৃদ্ধি কার্যকর হওয়ার পর, এবছর বাংলাদেশেও স্মার্টফোনের দামে এই প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ক্ষেত্রভেদে, স্মার্টফোনের দাম প্রায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে, এখানে সব প্রাইস-রেঞ্জের ফোন সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। এন্ট্রি-লেভেল স্মার্টফোনের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি। ২০০ ডলারের নিচের স্মার্টফোনের কম্পোনেন্ট খরচ ২০২৫ সাল থেকে ইতোমধ্যে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে এবং ২০২৬ সালে আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। মিড-রেঞ্জের ক্ষেত্রে কম্পোনেন্ট খরচ প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। প্রিমিয়াম ডিভাইসগুলো তুলনামূলকভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও তাদের কম্পোনেন্ট খরচও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের মতো মূল্যসংবেদনশীল বাজারে সাধারণত ক্রেতারা ১৫,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকার মধ্যে ফোন কেনেন। আর এই সেগমেন্টেই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।

নতুন প্রজন্মের স্মার্টফোনে অন-ডিভাইস এআই ফিচার যুক্ত হচ্ছে। এই এআই ফিচারগুলো কার্যকরভাবে চালাতে আরও শক্তিশালী প্রসেসর ও বেশি পরিমাণ র‍্যাম প্রয়োজন। ফলে, উন্নত হার্ডওয়্যার কনফিগারেশনেও উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা শেষপর্যন্ত স্মার্টফোনের দামের সাথে যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ, এআই শুধু ডেটা সেন্টার থেকে মেমোরি টেনে নিচ্ছে না; ফোনের ভেতরেও এআই ফিচার যোগ করতে গিয়ে ফোন উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ব্যয়বহুল কম্পোনেন্ট ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এআই-সম্পর্কিত চাহিদার কারণে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সাপ্লাই-চেইনের এই পরিবর্তন অদূর ভবিষ্যতে শেষ হওয়ার আপাত সম্ভাবনা নেই। ফলে, স্মার্টফোনের দামের ওপর এই চাপ আগামী বছরগুলোতেও অব্যাহত থাকতে পারে।

সহজে বলতে গেলে, বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআইয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকতে যে মেমোরি চিপ কিনছে, সেই একই চিপ আপনার পকেটের স্মার্টফোনেও প্রয়োজন। সরবরাহ কম, চাহিদা বেশি; ফলে এর দাম বাড়ছে। এটি আসলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি অর্থনীতির ক্ষেত্রে একধরনের কাঠামোগত রূপান্তর।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews