সময় বয়ে যায় নদীর স্রোতের মতো, কিন্তু মেক্সিকোর গোলপোস্টের নিচে একজোড়া গ্লাভস যেন সময়ের ঘড়িটাকেই থামিয়ে দিয়েছে। ২০০৬ সালে যখন জার্মানির সবুজ গালিচায় মেমো ওচোয়া নামক ২০ বছরের এক তরুণ প্রথমবার পা রেখেছিলেন, তখন পৃথিবীটা ছিল অন্যরকম। আইফোন ছিল কেবল এক কল্পনা, আর মানুষের কানে বাজত জেমস ব্লান্টের সুর। দুই দশক পার হয়ে গেছে। প্রজন্ম বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, বদলে গেছে ফুটবলের ব্যাকরণও। কিন্তু বদলাননি কেবল গিয়ের্মো ওচোয়া। নীল আকাশ আর সবুজ জার্সির মাঝে ওচোয়া যেন এক অবিনশ্বর বটবৃক্ষ। ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজের ষষ্ঠ ও শেষ আসরে মাঠে নামার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে মেক্সিকান এই কিংবদন্তি নিজেকে নিয়ে গেলেন ফুটবলের অমরত্বের সোপানে।

১৯৮৫ সালে গুয়াদালাজারার এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে জন্ম নেওয়া এই গোলরক্ষক ছোট থেকেই ছিলেন ছকভাঙা। যেখানে মেক্সিকোর প্রতিটি অলিগলিতে স্ট্রাইকার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শিশুরা বড় হয়, সেখানে ওচোয়া চেয়েছিলেন গোল রুখতে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক ক্লাব আমেরিকায় যখন তার অভিষেক হয়, তখন তার চোখে ছিল অদম্য জেদ আর মাথায় সেই চিরচেনা কোঁকড়ানো চুল, যা পরবর্তীতে মেক্সিকান ফুটবলের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। তখনই বোদ্ধারা বুঝেছিলেন, এ কেবল জাল রক্ষা করতেই আসেনি, সে এসেছে মেক্সিকোর আবেগ রক্ষা করতে। তার রিফ্লেক্স ছিল চিতার মতো ক্ষিপ্র, আর দৃষ্টি ছিল ঈগলের মতো তীক্ষè। মেক্সিকোর ফুটবল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে ওচোয়ার বেশি সময় লাগেনি। মেক্সিকান সমর্থকদের কাছে তিনি কেবল একজন গোলরক্ষক নন, তিনি তাদের ‘স্যান মেমো’ বা সেন্ট মেমো।

মেক্সিকোর ‘অমর দেয়াল’ মেমো ওচোয়ামেক্সিকো ফুটবলের সঙ্গে ওচোয়ার সখ্যতা ঠিক কতটা গভীর, তা বোঝা যায় গ্যালারির চিৎকারে। তিনি কেবল একজন খেলোয়াড় নন, তিনি এক ভরসার নাম। যখনই জাতীয় দলের রক্ষণে প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগ সুনামির মতো আছড়ে পড়েছে, তখনই চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন ওচোয়া। তার হাত দুটো যেন কেবল রক্ত-মাংসের নয়, বরং মেক্সিকান জনগণের আবেগের ঢাল। ক্লাব ফুটবলে তার অবস্থান যেখানেই থাকুক না কেন, বিশ্বকাপের রঙিন মঞ্চে ওচোয়া মানেই এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ২০০৬ সালে জার্মানি এবং ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় সাইডবেঞ্চে বসেই শিখেছেন আগামীর লড়াই। ২০১৪ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের অবিশ্বাস্য ছয়টি সেভ, বিশেষ করে নেইমারের সেই হেড কিংবা থিয়াগো সিলভার শট যেভাবে ওচোয়া রুখে দিয়েছিলেন, তা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় ২৫টি সেভ কিংবা ২০২২ সালে কাতারে লেভানডস্কির পেনাল্টি রুখে দিয়ে ওচোয়া বারবার প্রমাণ করেছেন-তার কাছে বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র।

২০২৬ সালে যখন আমেরিকা, মেক্সিকো ও কানাডায় বিশ্বকাপের বাঁশি বাজবে, তখন ঘরের মাঠে ওচোয়া কেবল টানা ছয়টি বিশ্বকাপে স্কোয়াডে থাকার রেকর্ডের জন্য নয়, এটি তার প্রিয় মাটির দর্শকদের শেষবারের মতো সেলাম জানানোর মঞ্চ। এর পর যখন ওচোয়া তার গ্লাভসজোড়া তুলে রাখবেন, তখন কেবল মেক্সিকোর পোস্ট খালি হবে না, বরং ফুটবলের এক রোমান্টিক যুগের অবসান ঘটবে। আইফোনহীন যুগে শুরু হওয়া সেই মহাযাত্রা শেষ হবে এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এসে। বিদায় বেলায় ওচোয়া আমাদের শিখিয়ে যাচ্ছেন, আবেগ আর পরিশ্রম থাকলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়েও টিকে থাকা যায় ‘অমরত্বের দেয়াল’ হয়ে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews