ভিয়েতনামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘ট্রাম্প অর্গানাইজেশন’-এর বিশাল বিলাসবহুল প্রকল্প গড়ে তুলতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পূর্বপুরুষদের কবর সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সরকার। প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই মেগা প্রকল্পে পাঁচ তারকা হোটেল, বিলাসবহুল ভিলা এবং একটি আন্তর্জাতিক মানের গলফ কোর্স তৈরি করা হচ্ছে। তবে পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত কবর উচ্ছেদের এই সরকারি সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম ‘দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ভিয়েতনামের হুং ইয়েন প্রদেশে চার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই প্রকল্পটির কাজ গত বছর শুরু হয়। এই প্রকল্পের কারণে ওই অঞ্চলের চার হাজারেরও বেশি পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলেও স্থানীয় কৃষকদের একটি বড় অংশ এতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। অনেকেই আধ্যাত্মিক ও আবেগীয় কারণে তাদের পূর্বপুরুষদের সমাধি স্থানান্তরিত করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা হোয়াং আন জা ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ১৯৬৭ সাল থেকে অর্থাৎ বর্তমান ভিয়েতনাম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই এখানে তার প্রপিতামহের কবর রয়েছে। তাই কোনো গলফ কোর্সের জন্য তিনি কেন তা সরিয়ে নেবেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। আরেক স্থানীয় কৃষক চান মিন হাই জানান, বিষয়টি তাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও আধ্যাত্মিক। সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই এই সব কবরস্থানে খননকার্য চালিয়ে পূর্বপুরুষদের শান্তি ভঙ্গ করতে চান না।
এদিকে শুধু আবেগীয় কারণই নয়, আর্থিক বৈষম্যের অভিযোগও তুলছেন স্থানীয় কৃষকরা। নগুয়েন দুক থিও নামের এক কলা চাষী জানান, শুরুতে দেশের উন্নয়নের কথা ভেবে তারা এই প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সরকার তাদের জমির দাম হিসেবে প্রতি বর্গমিটারে মাত্র ৩ ডলারের মতো নামমাত্র মূল্য প্রস্তাব করে, যা বর্তমান বাজারদরের চেয়ে অনেক কম। এই তীব্র স্থানীয় প্রতিরোধের মুখে ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকা এই বিলাসবহুল প্রকল্পের কাজ অনেকটাই ঝুলে গেছে।
বিগত বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের ব্যবসার বিস্তার ঘটিয়েছে ট্রাম্প অর্গানাইজেশন। গত বছরের মে মাসে ভিয়েতনামের এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের ছেলে এরিক ট্রাম্প এটিকে সমগ্র এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সেরা প্রকল্প হিসেবে দাবি করেছিলেন। তৎকালীন ভিয়েতনামী প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিনও এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনামের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য সাধারণ পরিবেশগত সমীক্ষা ও জনসাধারণের মতামতের প্রক্রিয়াকেও পাশ কাটিয়ে দ্রুত সবুজ সংকেত দিয়েছিল হ্যানয় প্রশাসন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভিয়েতনামী পণ্যের ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপের হুমকির পর ওয়াশিংটনকে সন্তুষ্ট করতেই ভিয়েতনাম সরকার এই প্রকল্পকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। তবে হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে বরাবরই দাবি করা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পারিবারিক ব্যবসার দৈনন্দিন সিদ্ধান্তের সাথে যুক্ত নন এবং তার সমস্ত ব্যবসা ট্রাস্টের মাধ্যমে সন্তানরা পরিচালনা করছেন।
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ