১. গুজবের সমাজে সত্যের নিঃসঙ্গতা
একসময় গুজব ছড়াত চায়ের দোকানে। এখন ছড়ায় মানুষের হাতের মুঠোয়। আগে ‘শুনছি’ বলে কথা শুরু হতো, এখন ‘বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে’ লিখে মানুষ নিজের কল্পনাকেও সত্যের পোশাক পরিয়ে দেয়। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই সময়ে সত্য আর মিথ্যার লড়াই হয় না; বরং লড়াই হয় কার মিথ্যা বেশি দ্রুত ছড়াতে পারে। সম্প্রতি সাইবার অপরাধ, গুজব, ভুয়া তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার- এসব নিয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, আমাদের সামাজিক মানসিকতারও সংকটকে সামনে আনে। এখন মানুষ খবরের সত্যতা যাচাই করার আগে সেটি শেয়ার করতে বেশি আগ্রহী। যেন তথ্য নয়, আতঙ্কই সবচেয়ে বড় বিনোদন।
সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, যারা সারাক্ষণ সমাজের অবক্ষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি হাহাকার করেন, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি গুজব ছড়ান। কেউ বলে ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে, কেউ বলে বড় কোনো বিপর্যয় আসছে, কেউ আবার রাতারাতি মানুষকে দেশ ছেড়ে পালানোর পরামর্শ দেয়। অথচ পরে দেখা যায়, এসবের কিছুই সত্য নয়। কিন্তু ততক্ষণে মানুষের মনে ভয় ঢুকে গেছে। গার্সিয়া মার্কেস লিখেছিলেন, মানুষ সেই গল্পটাই বেশি বিশ্বাস করে, যেটা সে বিশ্বাস করতে চায়। বাংলাদেশও এখন সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে তথ্যের চেয়ে পক্ষ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সত্য অনেক সময় জনপ্রিয় হয় না, কিন্তু গুজব খুব দ্রুত ভাইরাল হয়। সব শব্দ সাহসের নয়। কিছু শব্দ কেবল ভিতরের ভয়কে লুকিয়ে রাখে। আর এই কারণেই কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
২. তরুণদের ঘিরে নতুন রাজনৈতিক খেলা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় লড়াই তরুণদের ঘিরে। সবাই তাদের নিয়ে ব্যস্ত। কেউ তাদের পরিবর্তনের সৈনিক বানাতে চায়, কেউ ধর্মের রক্ষক, কেউ ডিজিটাল বিপ্লবের মুখ। কিন্তু খুব কম মানুষই তরুণদের মানুষ হিসেবে বুঝতে চায়। সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার তরুণদের ঘিরে নতুন কৌশল, নতুন ভাষা, নতুন সাংগঠনিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কেউ নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার কথা বলছে, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের নতুন রূপে হাজির হচ্ছে। কারণ সবাই বুঝেছে, আগামী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষা নির্ধারণ করবে এই প্রজন্ম।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, তরুণদের সামনে আমরা খুব বেশি স্লোগান দিচ্ছি, খুব কম দিচ্ছি বাস্তব পথ। তারা চাকরির অনিশ্চয়তা দেখে, সামাজিক বৈষম্য দেখে, রাজনৈতিক অবিশ্বাস দেখে। ফলে তারা খুব সহজেই কোনো বড় আবেগ বা পরিচয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ইতিহাস বলে, যখন কোনো সমাজ তার তরুণদের জন্য বাস্তব আশা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখন তরুণরা প্রতীকের পেছনে ছুটে। ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদ, মধ্যপ্রাচ্যে চরমপন্থা, দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় বিভাজন- সব জায়গায় এ বাস্তবতা ছিল। বাংলাদেশেও এখন সেই ঝুঁকি আছে। কারণ তরুণদের সঙ্গে আলাপ কম, ব্যবহার বেশি। সবাই তাদের শক্তি চায়, কিন্তু খুব কম মানুষ তাদের ভয়, একাকিত্ব বা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা বুঝতে চায়। সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় তখনই আসে, যখন সবাই খুব দ্রুত একমত হতে শুরু করে। কারণ তখন প্রশ্ন হারিয়ে যায়। আর যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সে সমাজ খুব দ্রুত স্লোগানের কারখানায় পরিণত হয়।
৩. মেয়ের ষোলো বছর এবং বাবাদের নীরব ভয়
৭ মে আমার মেয়ে নিজা জেইনের ষোলোতম জন্মদিন ছিল। বাবা হিসেবে এই বয়সটা আমাকে নতুনভাবে ভাবায়। কারণ ষোলো বছর শুধু বয়স নয়, এটি এক অদ্ভুত সেতুবন্ধন। শৈশব তখন পুরোপুরি যায়নি, আবার বড় হওয়ার দরজাটাও খুলে গেছে। এই বয়সে সন্তানরা সবচেয়ে বেশি হাসে, আবার সবচেয়ে বেশি কিছু লুকিয়েও রাখে। তারা অনেক কথা বলে, কিন্তু সব কথা বলে না। তারা স্বাধীন হতে চায়, আবার ভিতরে ভিতরে নিরাপদ আশ্রয়ও খোঁজে।
একজন বাবা হিসেবে আমি বুঝি, মেয়েরা খুব দ্রুত বড় হয়ে যায়। হঠাৎ করেই যে মেয়েটি হাত ধরে রাস্তা পার হতো, সে একদিন বলে, ‘আমি পারব’। তখন বাবারা চুপচাপ হাসেন। কারণ তারা জানেন, পৃথিবীটা এখনো খুব সহজ নয়। আমাদের সমাজে মেয়েদের নিয়ে দুই ধরনের অতিরিক্ততা আছে। কেউ তাদের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কেউ আবার স্বাধীনতার নামে পুরোপুরি একা ফেলে দেয়। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্বাস। সন্তান যেন ভুল করলে ভয় না পায়, সত্য বলতে সংকোচ না করে- সেই পরিবেশ তৈরি করাই সবচেয়ে জরুরি।
আজকের পৃথিবীতে এই বয়সের ছেলেমেয়েরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে। হাজার বন্ধু থাকলেও গভীর আলাপ কম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা স্বীকৃতি খোঁজে, নিজের আত্মবিশ্বাস তৈরি করে অন্যের প্রতিক্রিয়ার ওপর। ফলে ছোট একটি প্রত্যাখ্যানও তাদের ভিতরে বড় ভাঙন তৈরি করতে পারে। এই বয়সে সন্তানদের সবচেয়ে বেশি দরকার উপস্থিতি। সব সময় উপদেশ নয়। কখনো কখনো শুধু পাশে থাকা। তাদের নীরবতা বোঝা। তাদের ছোট ছোট ভয়কে গুরুত্ব দেওয়া। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, মেয়েরা বাবার খুব কাছের মানুষ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কথার গভীরতা আরও বেশি বুঝতে পারি।
৪. ক্ষমতার প্রতিধ্বনি এবং পতনের শুরু
ক্ষমতা খুব কম সময় বিরোধীদের কারণে ধ্বংস হয়। বেশির ভাগ সময় ক্ষমতা ধ্বংস হয় নিজের প্রতিধ্বনিতে। যখন চারপাশে সবাই খুব দ্রুত সম্মতি দিতে শুরু করে, তখনই পতনের শুরু হয়ে যায়। ইতিহাসে সাম্রাজ্যগুলো হঠাৎ ভাঙেনি। তারা খুব সুন্দরভাবে পচেছে। বাইরে থেকে স্থিতিশীলতা দেখা গেছে, ভিতরে ভিতরে জমেছে ভয়। কারণ ক্ষমতা যখন নিজের প্রতি আস্থা হারায়, তখনই সে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। যখন কোনো রাষ্ট্র বা ক্ষমতা মানুষের আনুগত্য মাপতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে তার ভিতরে ভয় কাজ করছে। নজরদারি কখনো আত্মবিশ্বাসের লক্ষণ নয়; বরং অনিরাপত্তার স্বীকারোক্তি। সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ দুর্নীতিবাজ নয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মনে করে সে কখনো ভুল হতে পারে না। বিনয়হীন নিশ্চিততা খুব নরম পথ ধরে স্বৈরতন্ত্রের দিকে নিয়ে যায়। আজকের পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রণের ধরন বদলে গেছে। আগে ভয় দেখিয়ে মানুষকে চুপ করানো হতো, এখন অতিরিক্ত শব্দ তৈরি করে সত্যকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এত তথ্য, এত বিতর্ক, এত কৃত্রিম উত্তেজনা তৈরি করা হয় যে সত্য নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
কিন্তু সত্যের একটি অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। সত্যকে জনপ্রিয় হতে হয় না। সত্য সময়ের কাছে টিকে থাকে। অনেক সময় সরে দাঁড়ানোই সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান। কারণ সব লড়াইয়ে অংশ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিছু মানুষ নীরবতাকে দুর্বলতা ভাবে। তারা বোঝে না সংযম কাকে বলে।
শেষ কথা
গুজব, তরুণদের রাজনীতি, সন্তানদের বেড়ে ওঠা আর ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব- এই চারটি বিষয় আলাদা মনে হলেও ভিতরে ভিতরে একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সবকিছুর কেন্দ্রেই আছে বিশ্বাসের সংকট। আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষ তথ্যের চেয়ে অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেয়। পরিবারে আলাপ কমছে, সমাজে সহনশীলতা কমছে, রাজনীতিতে ধৈর্য কমছে। ফলে সবাই নিজের ছোট ছোট প্রতিধ্বনির ভিতর বন্দি হয়ে যাচ্ছে।
আজকাল মানুষ শোনার চেয়ে বলতেই বেশি পছন্দ করে। বিতর্কের জায়গায় এসেছে ঘোষণা, আলাপের জায়গায় এসেছে আক্রমণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ ভুল স্বীকার করে না; বরং আরও জোরে নিজের অবস্থান পুনরাবৃত্তি করে। যেন নরম হওয়াটা অপরাধ, আর সংযম মানেই দুর্বলতা। অথচ সভ্য সমাজ কখনো শুধু শক্তি দিয়ে টিকে থাকে না, টিকে থাকে আত্মনিয়ন্ত্রণ দিয়ে। আমরা সন্তানদের সাফল্য শেখাই, কিন্তু ব্যর্থতা সামলানো শেখাই কম। তরুণদের প্রতিবাদ শেখাই, কিন্তু সহনশীলতা শেখাই না। রাষ্ট্র মানুষকে নিরাপত্তা দিতে চায়, কিন্তু অনেক সময় সেই নিরাপত্তার ভাষাই ভয়ের ভাষায় পরিণত হয়। আর যখন ভয় সমাজের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন মানুষ ধীরে ধীরে স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’
কিন্তু আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই, মানুষ এখন মানুষকেই সবচেয়ে কম বিশ্বাস করে। পরিবার সন্দেহ করে পরিবারকে, রাজনৈতিক দল সন্দেহ করে জনগণকে, জনগণ সন্দেহ করে প্রতিষ্ঠানকে। এই অবিশ্বাসের ভিতর দাঁড়িয়ে উন্নয়ন, প্রযুক্তি বা বড় বড় স্থাপনা খুব বেশি অর্থ বহন করে না। কারণ সভ্যতা শেষ পর্যন্ত কংক্রিট দিয়ে নয়, আস্থা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আর যে সমাজে আস্থা ক্ষয়ে যায়, সেখানে পতনের শব্দ অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়, শুধু সবাই তা শুনতে পায় না।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্র্ন্যান্স স্টাডিজ