অ্যান্টার্কটিকার জমাট বাঁধা বরফের নিচে শত শত বছর ধরে বন্দি হয়ে ছিল এক ভয়ংকর বিষ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের তাপে সেই বরফ গলতে শুরু করায় মুক্ত হয়ে পড়েছে বিষাক্ত ধাতু ‘পারদ’ (মার্কারি)। এটি দক্ষিণ মেরুর এই আদি ও নির্মল পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলার এক চরম হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।

চীনের বেইজিং ভিত্তিক পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক জানান, অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলছে। ফলে সেখানকার উপকূলীয় তলানিতে পারদের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিজ্ঞান সাময়িকী পিএনএএস এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসে সোমবার (২৭ জুলাই) এ সংক্রান্ত নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা, মেরু অঞ্চলের পরিবেশের ওপর পারদ জমার পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক।

পারদের বিষবলয় ও শিল্পবিপ্লবের প্রভাব

বিজ্ঞানীরা মহাদেশটির উত্তর-পশ্চিম অংশের অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের ১৬টি স্থান থেকে পলির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছেন। এতে দেখা গেছে, উপকূলীয় মহীসোপানে (সমুদ্রের তীরের কাছাকাছি অগভীর তলদেশ) বর্তমানে প্রতি বছর প্রতি বর্গমিটারে ৯৩ মাইক্রোগ্রাম হারে পারদ জমা হচ্ছে। অঞ্চলটি মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। তারপরও এখানকার পারদ জমার হার অন্যান্য মহাদেশীয় সোপানের তুলনায় দ্বিগুণ!

গবেষণায় দেখা গেছে, শিল্পবিপ্লবের পর থেকে পারদ সঞ্চয়ের এই হার ১৬০ শতাংশ বেড়েছে। স্বাভাবিক নিয়মেই প্রকৃতিতে অল্প পরিমাণে পারদ থাকে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও ভূগর্ভস্থ নাড়াচাড়ায় পারদ বাষ্প হিসেবে বাতাসে মেশে। পরে সমুদ্রের অতি ক্ষুদ্র উদ্ভিদ 'ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন' (পানিতে ভেসে থাকা অণুবীক্ষণিক উদ্ভিদ) তা শুষে নেয়। কোনো কোনো ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনকে ছোট মাছ খায়, আর এভাবেই পারদ প্রবেশ করে খাদ্যশৃঙ্খলে। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় এটি একটি নিরাপদ সীমার মধ্যে থাকে।

কিন্তু মানুষ যখন কয়লা পোড়ানো কিংবা ধাতু প্রক্রিয়াজাত করার মতো কাজ বাড়িয়ে দিল, তখন বাতাস ভারী হতে থাকল বিষাক্ত পারদে। তবে কেবল বায়ুমণ্ডলের পারদ দিয়ে অ্যান্টার্কটিকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যায় না। আসল কারণ বরফ গলে যাওয়া। বরফ যত গলছে, ভেতরের আটকে থাকা পারদ তত দ্রুত সাগরে মিশছে। একই সাথে সাগরের মুক্ত পানি উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় বায়ুমণ্ডল থেকে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনগুলোর আরও বেশি পারদ শুষে নেয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

শিল্পবিপ্লব শুরুর পর থেকে বরফগলা পানিতে পারদ নির্গমনের পরিমাণ বেড়েছে ৫৫০ শতাংশ। আর বায়ুমণ্ডল থেকে পারদ শুষে নেয়ার হার বেড়েছে ৩৫০ শতাংশ। বিগত ৩০ বছরে অ্যান্টার্কটিকার বরফের যে ক্ষয় হয়েছে, তার ৬০ শতাংশই ঘটেছে এই ছোট্ট উপদ্বীপ অঞ্চলে।

অ্যান্টার্কটিকার 'ডুমসডে' বা মহাপ্রলয়ের হিমবাহ হারাবে তার বরফের আস্তরণ

বর্তমানে ওই অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ হিমবাহ স্বাভাবিক সীমার চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে পেছনে হটে যাচ্ছে বা গলে ছোট হয়ে আসছে। পরিবেশের ওপর এর প্রভাবে এরইমধ্যেই স্পষ্ট। গত বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টার্কটিকার ৬২ শতাংশ সামুদ্রিক পাখির শরীরে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পারদ মিলেছে। এমনকি চার ভাগের এক ভাগ পাখি পারদের বিষক্রিয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

উল্লেখ্য, গোটা বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ অলবণাক্ত বা খাওয়ার পানি জমা আছে অ্যান্টার্কটিকার বরফের চাদরে। বৈশ্বিক উষ্ণতায় যদি এই সব বরফ গলে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানির উচ্চতা অন্তত ১৮৩ ফুট (৫৬ মিটার) পর্যন্ত বেড়ে যাবে। ফলে খুব সামান্য পরিমাণ বরফ গললেও তা বিশ্বজুড়ে বিপর্যয় ডেকে আনবে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এই মিষ্টি পানি পৃথিবীর সমুদ্রের স্বাভাবিক জলস্রোতের গতি ধীর করে দেবে। বদলে দেবে দক্ষিণাঞ্চলের জলবায়ু ।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার উপগ্রহ তথ্যে উঠে আসে, 'এল নিনো' (প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার প্রাকৃতিক ঘটনা) চলাকালে অ্যান্টার্কটিকার বরফের আস্তরণ প্রতি বছর ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত গলে যায়। একই বছরের মার্চে জানা যায়, মহাদেশটিজুড়ে থাকা ফ্রান্সের আকারের এক দানবীয় হিমবাহের আগের ধারণার চেয়েও বড় অংশ সাগরের পানিতে ভাসছে। ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে এটি আরও দ্রুত গলে গিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা হু হু করে বাড়িয়ে দিতে পারে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews