অ্যান্টার্কটিকার জনমানবহীন মহাদেশ ছাড়া বাকি যে ক’টি মহাদেশ আছে তার প্রায় সবগুলো স্পর্শ করার সুযোগ আমার হয়েছে। প্রায় ২০টি দেশে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক সপ্তাহ অবস্থান করার সুযোগ আমি পেয়েছি। এ সুযোগ অনেকেরই হয়, তবে আমার ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। নানা প্রয়োজনে বহু লোক নানা দেশে ভ্রমণ করে আমিও করেছি। তারা সাধারণত বড় বড় শহরে বেশি সময় কাটান, সভা-সমিতি করেন। বন্যপ্রাণী বনভূমি ও পরিবেশ বিষয়ক নানা সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, সম্মেলনে যারা যান বড় শহরে বিলাসবহুল হোটেলে থেকে উদ্বোধন অনুষ্ঠান করেন। আমরা ছোট-বড় মফস্বল শহরে যেতাম। যেসব দেশে গিয়েছি সেগুলোর শহরও বটেই গ্রামাঞ্চলও দেখার সুযোগ আমি পেয়েছি। ব্রিটেনসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের বনজঙ্গল, আমেরিকা, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের অনেক গভীরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আফ্রিকার কিছু অংশও দেখেছি। আমরা সাধ্যমত নানা জায়গায় গিয়েছি। সুতরাং আমার সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে এবং অন্যদের কাছে যা শুনেছি তার ভিত্তিতে কিছু অভিমত ব্যক্ত করতে পারি। প্রাকৃতিক পরিবেশের কথাই বলতে যাচ্ছি। অনেক বক্তৃতা শুনি বা পোস্টার দেখি যাতে লেখা থাকে ‘গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান’। শুনতে ভালই লাগে। যেকোনো গাছ লাগালেই পরিবেশ বাঁচে না। আমাদের বলতে হবে, দেশি গাছ লাগান ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বাঁচান। প্রাকৃতিক পরিবেশ বলতে গেলে অপ্রাকৃতিক পরিবেশের কথা এসে যায়। পার্থক্য আমাদের গভীরভাবে বুঝতে হবে। যেকোনো গাছ লাগালে যদি প্রাকৃতিক পরিবেশ বেঁচে যেত তা হলে কথা ছিল না। কিন্তু বাস্তবে তা নয়।

ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়ার প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবেশ হয় বিভিন্ন ধরনের। কোনো একটি স্থানের বায়ু, পানি, তাপ, মাটির ধরন ও গুণাগুণের ভিত্তিতে সে স্থানে উদ্ভিদ জন্মে। এটিই প্রাকৃতিক নিয়ম। একইভাবে উদ্ভিদের ধরনের উপর ভিত্তি করে সেখানে প্রাণীর আবির্ভাব ঘটে। আলো, বায়ু, আবহাওয়া, পানি ও মাটির সমন্বয়ে সে স্থানে অজৈব পরিবেশ গড়ে উঠে, তার উপর নির্ভর করে যে উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবির্ভাব হয় তাকে বলা হয় জৈব পরিবেশ। জৈব ও অজৈব পরিবেশ মুক্তভাবে সে স্থানের প্রাকৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলে। পরিবেশ বিদ্যায় পরিবেশগত পরামর্শ বলে একটি কথা আছে। সংক্ষেপে বলা যায়, উদ্ভিদহীন একটি স্থানে যখন কোনো উদ্ভিদ জন্মায়, তখন সেখানেও পরিবেশের পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ ওই গাছের কারণে পরিবেশ ভিন্ন রূপ নেয়, যেখানে আগের গাছ টিকতে পারে না, ভিন্ন গাছ জন্মায়। একইভাবে ভিন্ন প্রাণীর উদ্ভব হয়। এ ধরনের পরিবর্তন কয়েকবার ঘটার পর শেষ পর্যায়ে যে উদ্ভিদ ও প্রাণী দেখা যায় তাকে বলা হয় ‘ক্লাইমেটিক ক্লাইমেক্স’ বা চূড়ান্ত পর্যায়। অজৈব পরিবেশগত কোনো বিপর্যয় দেখা না দিলে একটি স্থানের জৈব পরিবেশ সঠিকভাবে পরিবর্তিত হয়ে সে স্থানে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃত্রিম উপায়ে অজৈব পরিবেশগত কোনো বিপর্যয় দেখা না দিলে একটি স্থানের জৈব পরিবেশ সঠিকভাবে পরিবর্তন না ঘটিয়ে সেখানে কৃত্রিমভাবে যদি অজৈব পরিবেশের পরিবর্তন করে ফেলা হয়, তবে সব ওলটপালট এবং বিলীন হয়ে যায়।

বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়াম উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন এলাকায় বেড়াতে যেতে চান। এটি স্বাভাবিক। এবার একটু প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেকার কথা বলছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি না হতো তবে তৃতীয় বিশ্বের তথা আফ্রো-এশিয়ার এবং দক্ষিণ আমেরিকার কোটি কোটি মানুষকে আজ হয়তো পরাধীনতার শৃঙ্খলে জীবন কাটাতে হতো। তবে এ দেশগুলোর স্বাধীনতা ঔপনিবেশিক দেশগুলোর দয়ার দান নয়। আবার এটা শুধু স্বাধীনতা আন্দোলনের ফসল, এটিও পুরোপুরি মানতে রাজি নই। যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিছুটা হলেও স্বচক্ষে দেখেছেন, তারা স্বীকার করবেন, পরাধীন দেশগুলোর স্বাধীনতা এসেছে ঐ দু’টি কারণের সফল সমন্বয় হিসাবে। এ মহাযুদ্ধের ফলে সমগ্র বিশ্বের পানিতে-স্থলে যে ভয়ঙ্কর দুর্যোগ নেমে এসেছিল তার ফলে এসব দেশকে শাসন করার ক্ষমতা ঔপনিবেশিক দেশগুলো হারিয়ে ফেলেছিলো। জাপানের বাইরে এ যুদ্ধ আরো কয়েক বছর চলছিল, কিন্তু জার্মানিতে অ্যাটম বোমা ফেলার সাহস মিত্রশক্তির হলো না, জার্মানিতে বোমাটি ফাটলে যুদ্ধ দুই বছর আগেই থেমে যেত।

যুদ্ধ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আসলে দুনিয়ার সর্বত্র এত ভয়ঙ্কর ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে লক্ষ-লক্ষ মানুষ বোমার আঘাতে ও আগুনে পুড়ে এবং ক্ষুধার জ্বালায় মরেছে এতে ইউরোপ-ব্রিটেন-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার জোট শক্তির কোমর ভেঙ্গে গিয়েছিল। সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ানোর জন্য হাতের কাছে এমন কিছু ছিল না, যাকে তারা লাঠি হিসাবে ব্যবহার করবে। তবে লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, সে যুদ্ধ ছিল সেয়ানে সেয়ানে। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো দুই দলে ভাগ হয়ে সে যুদ্ধ করেছিল। শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, এসব যুদ্ধবাজ দেশের মানুষ মরেছে শুধু বোমার আঘাতে। আর যুদ্ধে যাদের অংশগ্রহণ ছিল না তারা মরেছে একই সাথে বোমার আঘাতে এবং ব্যাপক দুর্ভিক্ষে। প-িত নেহরু বলেছিলেন, দুর্ভিক্ষের কারণে বাংলায় যত মানুষ মরেছে, ব্রিটেনে যদি তার অর্ধেক মাছিও মারা যেত তবে চার্চিলের মন্ত্রিসভার পতন ঘটত। ভেবে দেখুন, যুদ্ধ করল কারা আর দুর্ভিক্ষে মরল কারা। দুর্ভিক্ষে ব্রিটেনে একটি মানুষও মারা গেছে এমন কথা ইতিহাসে আছে কি?
উপমহাদেশের অনেক রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য অনেক অবদান রেখেছেন। আমি তাদের শ্রদ্ধা করি ও কৃতজ্ঞতা জানাই। কিন্তু শুধু তাদের আন্দোলনের ফলে উপমহাদেশ বা অন্য দেশের মানুষ স্বাধীনতা পেয়েছে, তেমনটি ভাবা ঠিক হবে না। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর কোমর ভেঙ্গে গিয়েছিল বলে শেষ পর্যন্ত ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ বলতে বলতে উপনিবেশগুলো ছেড়ে পালিয়েছে ওরা, এটা সত্য। কোনো কোনো দেশের ঔপনিবেশিক শক্তি শত শত বছর ধরে তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশের রক্ত কীভাবে শোষণ করে খেয়েছে তার ইতিহাস আছে। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো উপনিবেশের অশ্বেতাঙ্গ মানুষকে সাধারণভাবে কীটপতঙ্গ ছাড়া বেশি কিছু মনে করত না। আফ্রিকা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার আদি মানুষকে কি নিষ্ঠুরভাবে ঘরছাড়া হতে বাধ্য করেছিল সেসব কাহিনী এসব মহাদেশ সংক্রান্ত বই পড়লে জানা যাবে।

ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আমাদের উপমহাদেশের মানুষকে কিছুটা ভিন্ন চোখে দেখত। দেখবেই না কেন? অন্যরা সব মহাদেশে গিয়ে তাজমহলের মতো কিছু দেখতে পায়নি। আমাদের প্রাণী জগৎ ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে ব্রিটেন কীভাবে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে তা নিয়ে কাউকে কথা বলতে শুনি না। আসলে ব্যাপারটি কী? উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের অনেকে বোধ করি এ নিয়ে মাথা ঘামান না। অনেক উদ্ভিদবিজ্ঞানী অর্থকরী যেকোন গাছ হলে তাকে মেনে নিতে পারেন। কিন্তু আমরা তা পারি না। সবাই জানি, যেকোন এক স্থানের প্রাণী স্থানীয় উদ্ভিদের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। কিন্তু স্থানীয় প্রাণী স্থানীয় উদ্ভিদের সাথে হাজার হাজার বছর ধরে বিবর্তনের ফলে উদ্ভিদের ওপর একান্তই নির্ভরশীল। তাই যে উদ্ভিদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যেসব প্রাণীর আবির্ভাব ঘটেছে, সে উদ্ভিদ না হলে সেসব প্রাণী টিকে থাকতে পারে না। সুতরাং আমগাছটি কেটে ফেলে সেখানে বহু মূল্যবান মেহগনি গাছ লাগালে চমৎকার কাঠ হয়তো পাওয়া যাবে কিন্তু সে আম গাছকে আশ্রয় করে যেসব কীটপতঙ্গ পাখি ও পশু বেঁচেছিল এতদিন সেগুলো ঐ অচেনা গাছ থেকে খেয়ে বাঁচার জন্য কোনো সাহায্য বা খাদ্য পাবে না। যদি বাড়িতে দু’চারটি মেহগনি, ইউক্যালিপটাস ইত্যাদি বিদেশি গাছ লাগান এবং সারাদেশে যদি এসব গাছ দিয়ে চমৎকার বনাঞ্চল গড়ে তোলেন, তবে সুন্দর বাগান পাবেন। কিন্তু প্রাণীরা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে। এখন সেটি হচ্ছেও অনেক গাছ আছে, যার পরাগায়ন কীটপতঙ্গ ও পশুপাখি দিয়ে হয়; সেসব গাছ উৎপাদন করলে আপনার বাগানটি কেমন দেখাবে?

আম-জাম-কাঁঠালের মতো বহু গাছ আছে, যেগুলো ফল দেয়, কাঠ ও ছায়া দেয় এবং প্রাণীজগৎকে বাঁচায়। মেহগনি লাগালে একের ভিতর এক অর্থাৎ শুধু কাঠ পাবেন আর আম-কাঁঠাল লাগালে ফল, কাঠ পাবেন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা পাবে। অর্থাৎ একের ভিতর তিন। কিন্তু বলে লাভ নেই। ১৭৮১ সালের ইম্পেরিয়াল ফরেস্ট সার্ভিসের অধীনে সমগ্র উপমহাদেশের প্রাকৃতিক বন উজাড় করে সে জায়গায় মেহগনি, ইউক্যালিপটাস, অ্যাকাশিয়া, মিনজিটি, রেইন ট্রি ইত্যাদি কত না বিদেশি গাছ এনে কৃত্রিম বনায়ন শুরু হয়েছিল। বনায়নে কিছু দেশি গাছ ব্যবহার করা হয় যেমন শাল, গর্জন ইত্যাদি। চিন্তা করেন, একটি দেশীয় গাছ হোক বা তৃণলতা হোক, তার লতাপাতা-ফুল-ফল খেয়ে কত প্রাণীর প্রজাতি বাস করে। প্রাকৃতিক পরিবেশে একটি স্থানে ছোটো-বড় যদি ১০ প্রজাতির গাছ থাকে এবং প্রতিটি গাছকে কেন্দ্র করে যদি ১০ প্রজাতির প্রাণী বাঁচে, তাহলে সেখানে অন্তত ১০০ প্রজাতির প্রাণী পাওয়া যাবে। বনে যদি দেশি গাছ থাকে তবে অন্তত ১০-১২ প্রজাতির প্রাণী পাওয়া যাবে। বিদেশি প্রজাতির গাছ হলে একটি প্রাণী দেখা যাবে কি না সন্দেহ। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের স্বার্থে কোনো চিন্তা না করে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করতে শুরু করেছিল। সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার হল, উপনিবেশবাদীরা আমাদের মঙ্গলের জন্য বনায়ন করেনি। তাদের লক্ষ্য ছিল এদেশে গাছ লাগাবে আর সে গাছ কেটে কাঠ নিয়ে যাবে নিজেদের দেশে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। বৃক্ষ রোপনে জাতীয় পুরস্কার স্বর্ণপদক (১ম) প্রাপ্ত।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews