গত পাঁচ দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির দৃশ্যপটে যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এশিয়ার উত্থান। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও চীন—দুটি ভিন্ন বাস্তবতার দেশ—দুটি ভিন্ন পথ অনুসরণ করেও একটি অভিন্ন দর্শনের মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করেছে। সেই দর্শনটি হলো: দক্ষতাই সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।

একদিকে সিঙ্গাপুর সীমিত জনসংখ্যাকে উচ্চ-মূল্যের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করেছে, অন্যদিকে চীন তাদের বিশাল জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের ম্যানুফ্যাকচারিং ও প্রযুক্তি শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও জনসংখ্যা-নির্ভর অর্থনীতির জন্য এই অভিজ্ঞতা এখন আর কেবল অনুপ্রেরণা নয়—বরং একটি জরুরি শিক্ষা।

সিঙ্গাপুর মডেল: দক্ষতার সঙ্গে মর্যাদা ও আয়ের সংযোগ
সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে উঠেছে তাদের প্রগ্রেসিভ ওয়েজ মডেল (PWM) এবং Workfare Skills Support (WSS) ব্যবস্থার ওপর। এখানে বেতন বৃদ্ধি কেবল চাকরির মেয়াদের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং নির্দিষ্ট দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ অর্জনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একজন ক্লিনার বা নিরাপত্তা কর্মী উচ্চতর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলে নিয়োগকর্তা তাকে বেশি বেতন দিতে আইনগতভাবে বাধ্য।

এ ছাড়া WSS স্কিমের মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের নগদ প্রণোদনা দেওয়া হয়, যা শ্রমবাজারে ‘শিখুন এবং আয় করুন’ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে। সিঙ্গাপুর দক্ষতা উন্নয়নকে একটি জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিয়েছে—SkillsFuture তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জীবনব্যাপী শেখা, ভর্তুকিযুক্ত কোর্স এবং চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করেছে, কর্মীরা সবসময় পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে।

বর্তমানে ডিজিটাল লিটারেসি, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও হেলথকেয়ার—এসব খাতে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য তাদের প্রস্তুতিরই প্রমাণ।

চীন মডেল: কারিগরি শিক্ষার গণবিপ্লব
চীনের সাফল্যের মূলমন্ত্র ছিল শিল্পের চাহিদাকে সরাসরি শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। সারা দেশে হাজার হাজার ভোকেশনাল কলেজ স্থাপন করে তারা ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং পর্যন্ত দক্ষ জনশক্তি তৈরি করেছে। চীনের কোম্পানিগুলো সরাসরি কারিকুলাম প্রণয়নে অংশ নেয়, ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শেষ করেই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত থাকে।

চীনের Industrial–Educational Integration নীতির মাধ্যমে শিক্ষা আর ডিগ্রিনির্ভর থাকেনি; বরং বাজারনির্ভর হয়েছে। জার্মানির আদলে গড়ে ওঠা দ্বৈত শিক্ষা ব্যবস্থা—থিউরি ও প্র্যাকটিক্যালের সমন্বয়—এই সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।
সাম্প্রতিক সময়ে চালু হওয়া ‘Eight-Level Worker’ কাঠামো দক্ষতা অর্জনকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করেছে। দক্ষতার স্তর যত উঁচু, আয় ও পদোন্নতিও তত দ্রুত। পাশাপাশি AI, রোবোটিক্স, ড্রোন প্রযুক্তি, ইলেকট্রিক ভেহিকল, গ্রিন এনার্জি ও ডিজিটাল হেলথকেয়ারের মতো খাতে চীন যে জোর দিচ্ছে, তা ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে।

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ও করণীয়
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনসংখ্যা। কিন্তু দক্ষতার অভাবে এই জনশক্তির বড় অংশ এখনো স্বল্প-মূল্যের শ্রমে আটকে আছে। সিঙ্গাপুর ও চীনের অভিজ্ঞতা বলে, এই অবস্থা থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ হলো দক্ষতার সঙ্গে বেতন ও মর্যাদার সরাসরি সংযোগ।

শিল্প-ভিত্তিক কারিকুলাম, স্কিলস বোনাস, ডিজিটাল ভোকেশনাল ট্রেনিং, দক্ষতা-নির্ভর ন্যূনতম মজুরি এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ—এই পাঁচটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে দক্ষতা উন্নয়ন কেবল নীতিগত ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।
প্রস্তাবিত ‘স্মার্ট স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার: বাংলাদেশ ২০২৬’ ধারণাটি এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর মডেল হতে পারে। থিউরি, ল্যাবভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও পেইড ইন্টার্নশিপের সমন্বয়ে ছয় মাসেই একজন কর্মীর আয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) যুক্ত হলে এ উদ্যোগ টেকসইও হতে পারে।

সিঙ্গাপুর দেখিয়েছে কীভাবে ক্ষুদ্র জনশক্তিকে বিশ্বমানের দক্ষতায় রূপান্তর করা যায়, আর চীন দেখিয়েছে কীভাবে বিশাল জনসংখ্যাকে উৎপাদনী শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। বাংলাদেশ আজ যে উন্নয়ন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেখানে National Skill Development Authority-কে আরও কার্যকর করে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণই হতে পারে ২০৪৫ সালের উন্নত বাংলাদেশের চাবিকাঠি।

প্রশ্ন একটাই—আমরা কি তরুণদের কেবল কর্মসংস্থানের আশ্বাস দেব, নাকি দক্ষতার মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করব? সিদ্ধান্ত আজ নিলে, সুফল পাবে আগামী প্রজন্ম।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews