সারা দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার। কারণ ইরি-বোরো মৌসুমে এই লোডশেডিং উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া প্রচণ্ড গরমে কষ্ট পাচ্ছে মানুষ। তাই লোডশেডিং কমাতে সব ধরনের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার তিনি নিজ কার্যালয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং অর্থ ও বিদ্যুৎ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে এত লোডশেডিংয়ের কারণ জানতে চান। তিনি বলেন, ‘গরমে মানুষের কষ্ট হচ্ছে। যেভাবেই হোক বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতে সব ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।’ এ সময় বৈঠকে উপস্থিত অন্যরা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে চাহিদা অনুযায়ী ভর্তুকি পাওয়া যায় না। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানির বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পিডিবির কাছে এখন ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা আছে। অর্থ সংকটে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে আছে। তেল ও কয়লা কেনার টাকা নেই।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী অর্থ সচিবকে বিদ্যুতের বকেয়া বিল পরিশোধের নির্দেশ দেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানান, প্রধানমন্ত্রীকে অর্থ সংকটের কথা বারবার বলা হয়। কারণ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পিডিবি বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করে। এতে বছরে পিডিবির লোকসান হয় ৫২ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে পিডিবিকে ভর্তুকি দেওয়া হয় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এই ১৬ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকার কারণে পিডিবি এখন কোনো বকেয়া বিল দিতে পারছে না। এভাবে গত কয়েক বছর ধরে পিডিবি শুধু লোকসানই গুনে যাচ্ছে। এ তথ্য জানার পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে হবে। লোডশেডিং করা যাবে না। টাকা লাগলে জানাবেন। সরকার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু জনগণকে কষ্ট দেওয়া যাবে না।’
সূত্রগুলো আরও জানায়, গুরুত্বপূর্ণ এ বৈঠকে বিদ্যুৎ খাতের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবরের সূত্র ধরে বিদ্যুৎমন্ত্রীর কাছে এ খাতের বিভিন্ন বিষয় জানতে চান। তিনি বলেন, ‘কোনোভাবেই বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখা যাবে না। সামনে আরও গরম বাড়বে। এখন থেকে প্রস্তুতি না থাকলে গরমে জনগণ আরও কষ্ট পাবেন। তাই লোডশেডিং কমাতে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।’
গরম বাড়ায় গত কয়েকদিন ধরে ৫০০ থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় লোডশেডিং হয়েছে ১ হাজার ৫৩১ মেগাওয়াট। ওই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। আর বিদ্যুৎ বিতরণ হয়েছে ১৪ হাজার ৬৯ মেগাওয়াট। গরম বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। তখন লোডশেডিংও বাড়বে। পিডিবি জানিয়েছে, কয়লা সংকটসহ বিভিন্ন কারণে আপাতত এর চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু মঙ্গলবার উৎপাদন হয়েছে ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। কয়লার দর নিয়ে বিরোধ থাকায় ১৩২০ মেগাওয়াটের এসএস পাওয়ার কোম্পানির কেন্দ্রে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। মাতারবাড়ি কেন্দ্র ১৩২০ মেগাওয়াটের জায়গায় এখন দিচ্ছে ১ হাজার মেগাওয়াট। এছাড়া নরেনকো দিচ্ছে ৬০০ মেগাওয়াট। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও এখন উৎপাদন হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সরকারের কাছে পাওনা ১৪ হাজার কোটি টাকা। সেই টাকার জন্য তারা বারবার তাগাদা দিচ্ছে।
পিডিবিসহ সরকারি বিভিন্ন কর্মকর্তার অভিযোগ, ভর্তুকির টাকা নিয়ে অর্থ বিভাগের কয়েক কর্মকর্তা সংশ্লিষ্টদের হেনস্তা করছেন। ভর্তুকির টাকা চাইলে ওই কর্মকর্তারা (বিশেষ করে একজন যুগ্ম সচিব যিনি বিদ্যুৎ বিভাগে কাজ করে গেছেন) চিঠি দিয়ে নানা শর্ত দিয়ে থাকেন। এটা পুরো প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে দিচ্ছে।