শারমিন আহমদ: বিএসএফের পক্ষেই কিনল?
বাসন্তী মুখার্জি: হ্যাঁ। আমি বললাম, তুমি এসব বাড়ি কিনছ! এত সাংঘাতিক দামি বাড়ি। টাকা কোথায় পাচ্ছ? বাবা বলল, এগুলো সরকারের বাড়ি। আমাদের টাকায় নয়। বাবা বলল, তুই থাকবি তো এখানে থাক। আমি রোজ কলেজ থেকে ফিরে আসতাম। আর বাবা রোজ রাত্রিবেলা কোথায় চলে যেত।
একদিন আমি একটা স্যান্ডউইচ প্যাক করে দিয়েছিলাম বাবাকে। শসার স্যান্ডউইচ আর কয়েকটা কাজুবাদাম। আমি বললাম, যেখানেই যাও, রাতে যখন খাবারের টাইম হবে, তুমি খেয়ে নিও। সেদিন বাবা ফিরল বোধ হয় চারটা-সাড়ে চারটায়। আমি বললাম, খেয়েছ তুমি? বলল, না, আরেকজন খেয়েছেন, যিনি সাত দিন খেতে পারেননি। তাঁর ডায়াবেটিস। দেওয়ার মতো আর কোনো খাবার ছিল না।
কলেজ থেকে বিকেলবেলায় ফিরে এসে দেখি, বাড়ির সামনে অনেক লোক। আমি বললাম, এরা কারা, এ রকম ঘোরাফেরা করছে, খুব সন্দেহজনক লোক? বাবা তো গোপনীয়তার শপথ নিয়েছে। ফিসফিস করে বললেন, ওরা আজকে ক্যাবিনেট সারেন্ডার করেছে। যা হোক, ওরা দমদম এয়ারপোর্টে নিয়ে গেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদকে এবং আমীর-উল ইসলামকে। রুস্তমজি এলেন। আরও কয়েকজন অফিসার এসেছিলেন।
বাবা ওদের এয়ারপোর্টে একটু অন্ধকারের দিকে রেখেছিলেন। রুস্তমজিকে বললেন, আপনার সঙ্গে আলাদা কথা আছে। উনি তখন অন্য অফিসারদের ছেড়ে বাবার সঙ্গে কথা বলতে এলেন।
বাবা তখন তাঁকে ঘটনাটা বললেন। উনি প্রশ্ন করলেন, আপনি কী করে বুঝলেন এরা সত্যিই আসল লোক? বাবা বললেন, আমি কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলাম। ওরা সত্যিকারের লোক না হলে সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন না। আমি যাচাই করে নিয়েছি, এরা ঠিক লোক।
তখন তিনি বললেন, এরা তো খায়নি কিছু। আসাম হাউসে নিয়ে আসা হলো তাঁদের। আসাম হাউস ছিল বিএসএফের গেস্টহাউস কি সে রকমের কিছু একটা। গায়ে কাদাটাদা লেগে আছে। দাড়ি কামাননি। রুস্তমজি বললেন তাঁদের স্নানের ব্যবস্থা করতে। স্নান যে করবেন, স্নান করে পরবেনটা কী? এক কাপড়ে তো চলে এসেছেন।
তখন গভীর রাত, রাত দুটোর মতো। দোকানপাট সব বন্ধ। রুস্তমজি তখন নিজের স্যুটকেস খুলে একটা সিল্কের পাজামা–পাঞ্জাবি তাজউদ্দীন আহমদকে দিলেন, আরেকটা দিলেন আমীর-উল ইসলামকে। বাবাকে বললেন খাওয়ার ব্যবস্থা করতে।
দোকানপাট তো সব বন্ধ। বাবা কয়েকটা ডিম সংগ্রহ করল। বাবা দুটি রান্না জানত। মা শিঙাড়া বানিয়ে দিলে সেটা ভাজতে পারত, আর খুব ভালো অমলেট বানাতে ভালোবাসতেন। তো রাতে তিনি অমলেট বানালেন। ফলটল ছিল, একটা পাউরুটি ছিল। তাই দিয়ে তাঁদের কিছু খাওয়ালেন। তাঁরা বহুক্ষণ কিছু খাননি। আসার সময় বোধ হয় কৃষ্ণনগর বা ওরকম কোনো জায়গায় একটা ময়রার দোকানে মানুষদের ঘুম ভাঙিয়ে কিছু মিষ্টি খাইয়েছিলেন। কিন্তু আপনার বাবা মিষ্টি খেতে পারতেন না বলে এই স্যান্ডউইচটা খেয়েছিলেন।