৪ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ বা বিজেপি বিহারে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সেখানে প্রশান্ত কিশোরের নবগঠিত ‘জন সুরাজ পার্টি’ বাকিপুরে বিজেপির তিন দশকের আধিপত্যের অবসান ঘটিয়েছে। আসনটি বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবিনের দখলে ছিল, যিনি প্রচারণার সময় জেন জি বিক্ষোভকারীদেরকে “একটি ভাইরাস এবং দেশকে ভাঙতে বদ্ধপরিকর একটি তেলাপোকার দল” বলে অভিহিত করেছিলেন। এর ফলাফল একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে: “ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি বিজেপি কি নিজেকে পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে?”
এই পরাজয়ের মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে, ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এর আগে ৭ সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়েছিল ব্যঙ্গাত্মক ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’, যা মে’তে ইনস্টাগ্রামে সৃষ্টি করা হয়। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশটির কর্মহীন তরুণদের “তেলাপোকা” ও “পরজীবী”র সঙ্গে তুলনা করার পর সংগঠনটি গড়ে ওঠে।
এরপর, উত্তর প্রদেশে জেন জি-কে কাছে টানার বিজেপির উদ্যোগ, স্কুলে পেশাগত পরামর্শ এবং ইন্টারনেটের প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করে তৈরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও অনলাইনে উপহাসের শিকার হয়েছে। বিশ্লেষক আসিম আলি বলেন, দলটির মূলধারার গণমাধ্যম শক্তিশালীই রয়েছে, কিন্তু ইনস্টাগ্রামে ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের দিকে তৈরি হওয়া এর আবেগঘন সংযোগ এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
সায়েন্সেস পো-এর জিল ভার্নিয়ার্স বলেন, এই আন্দোলন ভিন্নমতাবলম্বীদের রাষ্ট্রবিরোধী, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত কিংবা সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার বিজেপির কৌশলকে ব্যাহত করেছে। ২০১৯-২০ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী ও কৃষক আন্দোলনের বিপরীতে এটি ছিল বহুত্ববাদী এবং সত্যিকার অর্থেই জাতপাতনিরপেক্ষ, যা বিজেপির উচ্চবর্ণের হিন্দু ঘাঁটির তরুণদেরও আকৃষ্ট করেছিল। একই সঙ্গে এতে তরুণদের মধ্যে মোদির ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভার্নিয়ের বলেন, “এই আন্দোলন যা করেছে তা হলো, জনমানসে তাঁকে সত্যিই একজন বুড়ো মানুষে পরিণত করেছে।”
ঠিক যেমনটা জন্তর মন্তরে ভারতের সমাজবাদী পার্টির ২৭ বছর বয়সী সংসদ সদস্য পুষ্পেন্দ্র সরোজ বলেছেন, সরকারের আগ্রাসন শিক্ষার্থীদের গ-ি ছাড়িয়ে আন্দোলনকে সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য এবং কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, “বাচ্চাদের মারধর করতে দেখা কেউই পছন্দ করে না।”
আগস্টের শুরুতে অনুষ্ঠিত তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে দুটিতেÑবাঙ্কিপুর ও মধ্যপ্রদেশের দাতিয়ায়Ñবিজেপি হেরে গেলেও গুজরাটের মাঞ্জালপুর আসনটি ধরে রেখেছে। তাই আলি এই ফলাফলকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী অঞ্জলি এই অস্থিরতাকে গত ১২ বছর ধরে এই দেশের তরুণদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “যতক্ষণ সাম্প্রদায়িক, জাতপাতভিত্তিক ও নারীবিদ্বেষী রাজনীতির অবসান না হবে, ততক্ষণ কোনো অর্থেই এটি বিজয় নয়।”
ভার্নিয়ার্স বলেন, গভীরতর ক্ষত তৈরি হয়েছে বিজেপির বৈধতার জায়গায়। তাঁর ভাষায়, “ওই আধিপত্যের পেছনে যে কর্তৃত্ব ছিল, বিক্ষোভগুলো তাতেই আঘাত করেছে।” এর ফলে বিজেপির রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং নাগরিকদের সেই ক্ষমতার নির্দেশ মেনে চলার ইচ্ছার মধ্যে একটি ফাঁরাক তৈরি হয়েছে। ভার্নিয়ার্স আরও বলেন, সিজেপি-র জাতীয় প্রচারণার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ নেই, কিন্তু স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংগঠন হিসেবে এটি বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচিকে প্রভাবিত করতে পারে। এদিকে, আলি মনে করেন না যে বিজেপি তার লক্ষ্য ত্যাগ করবে। তিনি বলেন, “আমি মনে করি না বিজেপি তার হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচি শিথিল করবে; বরং তারা এটিকে আরও জোরদার করবে।”