আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে একটি মৌলিক সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে- যুদ্ধ কখনোই হঠাৎ ঘটে না; এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কূটনৈতিক ব্যর্থতার অনিবার্য পরিণতি। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা নিরাপত্তা উদ্বেগ যখন আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায় না, তখন সেই সংকট ধীরে ধীরে সামরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘ধারণাগত কূটনীতি এবং ধারাবাহিক আলোচনাই সংঘাত-উত্তেজনা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।’ (আইসিজি, ২০২৪)।

আলোচনার দরজা বন্ধ হলেই সংঘর্ষের দরজা খুলে যায়, এই সত্য আজ কেবল তত্ত্বকথা নয়, বরং ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ সম্ভবত এ সত্যের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রমাণ। এই কূটনৈতিক ব্যর্থতার পরিণতি আজ রক্তাক্ত বাস্তবতায় স্পষ্ট। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৫ জনের অধিক সেনা নিহত ও প্রায় ২০০ আহত হয়েছে। ইরানে ১০,০০০-এরও বেশি বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস এবং ১,৩০০-এরও বেশি বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে। ইরানের মিনাব শহরে বালিকা বিদ্যালয়ে প্রাণ হারিয়েছে ১৬৫ জনের মতো শিশু শিক্ষার্থী। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়েছে এবং এর অর্থনৈতিক ক্ষতি পুরো মানবজাতিকে ভোগান্তিতে ফেলছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক নির্মম সত্য হলো- যারা যুদ্ধ বাধান, তারা জবাবদিহির বাইরে থাকেন; আর যারা যুদ্ধ ঘোষণা করেন না, তারাই সবচেয়ে বেশি মূল্য চোকান। বিশ্লেষক ড. জন অ্যালটারম্যান স্পষ্টভাবে বলেছেন : ইরান-মার্কিন সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে সামরিক শক্তি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, যদি কূটনৈতিক হাতিয়ারগুলো অনুপস্থিত থাকে ((CSIS, 2026)।

কূটনীতি নিজে নিজে সফল হয় না। এটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সেই মানুষদের ওপর যারা আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। কূটনীতির জন্য প্রয়োজন সৎ, মেধাবী, চরিত্রবান, নম্র এবং উচ্চশিক্ষিত মানুষ, যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাস ও বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর ও পরিপক্ব ধারণা রাখেন। একজন প্রকৃত কূটনীতিকের শুধু রাজনৈতিক নির্দেশনা অনুসরণ করার ক্ষমতা থাকলেই যথেষ্ট নয়; তার মধ্যে থাকতে হয় বিশ্লেষণী বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য, জটিল পরিস্থিতিতে দরকষাকষির দক্ষতা এবং বহু বছরের বাস্তব মাঠ-অভিজ্ঞতা।

কূটনীতিকে বাইরে থেকে দেখলে হয়তো সহজ মনে হয়, কিন্তু এর ভিতরের জটিলতা কেবল তারাই জানেন যারা এই পথে বছরের পর বছর হেঁটেছেন। একটি তীক্ষè উপমায় বিষয়টি বোঝানো যায় একজন দর্জি কাপড় সেলাই করেন, একজন মুচি জুতা সেলাই করেন, আবার একজন মেডিকেল সার্জনও সেলাই করেন। তিনটি ক্ষেত্রেই সুঁই-সুতার কাজ, তবু প্রেক্ষাপট, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ আলাদা। দর্জির হাতে অস্ত্রোপচার যেমন মারাত্মক ভুল, রাজনৈতিক অনুগতদের হাতে কূটনীতি তুলে দেওয়াও ঠিক তেমনি বিপজ্জনক। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে অদক্ষ বা রাজনৈতিকভাবে অনুগত কূটনীতিকরা নিজেদের কূটনৈতিক ব্যর্থতা আড়াল করতে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত ব্যবহার করেন। কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকির অতিরঞ্জিত বা ভুয়া যুক্তি তুলে ধরে যুদ্ধের পথে এগিয়ে যাওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন উঠে আসে : যদি যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়, তাহলে সেই যুদ্ধে প্রাণ হারান কারা? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, সেই যুদ্ধে প্রাণ দেন সাধারণ সৈনিকরা, যারা সেই জনগণেরই অংশ, যাদের নিরাপত্তার কথা বলে যুদ্ধের যুক্তি তৈরি করা হয়। এ বাস্তবতা আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গভীর  দ্বন্দ্বকে সামনে আনে। যুদ্ধের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার এ পদ্ধতি কতটা বাস্তবসম্মত তা আজ এক বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন। ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, রাষ্ট্রীয় ও জননিরাপত্তার ভুয়া অজুহাতে যারা এই যুদ্ধ বাধান, তারা জবাবদিহির ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। সংঘাতের মূল্য চোকায় সাধারণ মানুষ, তাদের জীবন দিয়ে, স্বজন হারিয়ে, জীবিকা হারিয়ে। অথচ যারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যারা কূটনীতির টেবিলকে সামরিক থিয়েটারে পরিণত করেছেন, তারা ক্ষমতার আলোয় নিরাপদ থাকেন। 

এই নিদারুণ বৈষম্য আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মার্কিন গবেষক ডেভিড লুকাস উল্লেখ করেছেন, কূটনীতি ব্যর্থ হলে সেনা অপারেশনগুলো প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির চেয়ে বড় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এমনকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রেও এই প্রশ্ন বহুবার উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী নানা কারণে আলোচিত ও সমালোচিত হলেও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার একটি গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠন, শান্তিচুক্তির মধ্যস্থতা এবং সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বহু গবেষক মনে করছেন যে, সেই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই বিতর্ক বিশেষভাবে তীব্র হয়ে ওঠে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময়। গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক নিয়োগ নীতিতে দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ভেঙে যায়।  

২০১৫ সালের ইরানি পারমাণবিক চুক্তি ছিল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বহু বছরের আলোচনার মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই চুক্তি যা আনুষ্ঠানিকভাবে Joint Comprehensive Plan of Action বা JCPOA নামে পরিচিত মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে শুরু করে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, ফলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকি বেড়ে যায়। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জিম ওয়ালশ বলেন, ২০১৮ সালের চুক্তি বাতিলের পরও ইরান একটি সময় পর্যন্ত চুক্তির নিয়মগুলো মেনে চলছিল এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন চলছিল; যা প্রমাণ করে কূটনীতি একটি কার্যকর বিকল্প ছিল। এই সময়ে মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক পদে যেসব ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের পেশাগত পটভূমিও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।  সমালোচকদের মতে, প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে পেশাদার কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য বা মিডিয়া পরিচিতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।  গুড অথরিটি বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : ট্রাম্প এবং রুবিও যেভাবে মার্কিন কূটনীতিকে ভেঙে দিয়েছেন, তা ইরান যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে। পেশাদার ফরেন সার্ভিস অফিসারদের বরখাস্ত করে এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই এমন ব্যক্তিদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পাঠিয়ে প্রশাসন কার্যত শান্তির সম্ভাবনাকেই হতাশ করেছে।

(Good Authority — Trump and Rubio dismantled U.S. diplomacy, মার্চ ২০২৬)।

♦ লেখক : মানবাধিকারকর্মী, প্যারিস, ফ্রান্স



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews