নাজমুস সাকিব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) ‘ম্যানার শেখানো’ ও ‘ফরমাল পরিচয়পর্বের’ নামে নবীন শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠেছে। ল্যাম্পপোস্ট গণনা, লাইব্রেরি ও ছাত্রী হলের সামনে সেলফি তোলা, উঁচু ভবনে উঠে ছবি তোলা, গভীর রাতে মেসের ছাদে আটকে রাখা এবং জোর করে ধূমপান করানোর মতো অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে অধিকাংশ ঘটনা আপসের মাধ্যমে মীমাংসা হওয়ায় প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ যাচ্ছে না বলে জানা গেছে।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, আইন, আল-ফিকহ অ্যান্ড ল, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, পলিটিক্যাল সায়েন্স, ফার্মেসি ও পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সময় ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে হয়রানি ও নির্যাতন করা হচ্ছে।
এর মধ্যে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীনদের তিন থেকে চার দফায় ক্লাসরুম, আবাসিক হলের বাইরে ও গভীর রাতে একত্রিত করা হয়। পরে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদেরকে ‘ফরমাল পরিচয়’ দিতে বলেন। পরিচয়ে ভুল হলে গালাগাল, অপমান ও বিদ্রুপ করা হয়। এমনকি এসব সময় নবীনদের মোবাইল ফোনও আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
ফরমাল পরিচয়ে ভুল হলে নবীন এসব শিক্ষার্থীদের একপর্যায়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাম্পপোস্ট গুনতে পাঠানো হয়। কেউ লাইব্রেরির নাম ভুল বললে তাকে লাইব্রেরির সামনে গিয়ে ছবি তুলে আনতে বলা হয়। আবার ছাত্রী হলের নাম ভুল বললে সংশ্লিষ্ট হলের সামনে গিয়ে সেলফি তুলতে পাঠানো হয়। এ ছাড়া এক শিক্ষার্থীকে একটি ভবনের পঞ্চম তলায় উঠে সেলফি তুলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফিরে আসতে বলা হয়। সময়মতো ফিরতে না পারায় তাকে গালাগাল ও অপমান করা হয়।
এ ঘটনায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সানি নেহালের নাম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসে। তার বিভাগের আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী ও কয়েকজন ছাত্রীও ক্লাসরুম ও হলকেন্দ্রিক ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে নবীনদের হয়রানিতে জড়িত বলে জানা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ নাহিদকে শাহ আজিজুর রহমান হলে একটি কক্ষে ডেকে নিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখেন ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সানি নেহাল। সেখানে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীও উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য নাহিদের ওপর মানসিক চাপ দেয়া হয় এবং অভিযোগ প্রত্যাহার না করলে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতে দেয়া হবে না বলে ভয় দেখানো হয়।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থী সানি নেহাল র্যাগিংয়ের কয়েকটি অভিযোগের অভিযোগ আংশিকভাবে স্বীকার করেন। তবে তার দাবি, এসব কার্যক্রমে তিনি একা জড়িত নন। একই ব্যাচের প্রায় সবাই বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত।
তিনি বলেন, ‘নবীন শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনার নাম জিজ্ঞেস করা, ভুল উত্তর দিলে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা দেখে আসতে পাঠানো, পুরো ক্যাম্পাসের ল্যাম্পপোস্ট গণনা করতে বলা, একই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১০-১২ বার পরিচয় নেয়া এবং ভুল হলে কঠোর বা অশালীন ভাষায় বকাঝকা করা, এসব কার্যক্রম পরিচালিত হতো। আমাকে ব্যবহার করা হয়েছে। সবাই করেছে, কিন্তু নাম এসেছে শুধু আমার।’
এক নবীন শিক্ষার্থীকে পাঁচতলায় উঠিয়ে সেলফি তুলতে পাঠানোর বিষয়ে নেহাল বলেন, ‘আমি বুঝতে পারিনি বিষয়টি এত বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে। যাকে পাঁচতলায় পাঠানো হয়েছিল, সে আমাদের বন্ধু ছিল। এক বছর ড্রপ দিয়ে এখন জুনিয়র হিসেবে ভর্তি হয়েছে। আমরা বিষয়টিকে মজা হিসেবে নিয়েছিলাম। তবে এখন বুঝতে পারছি, এটি ভুল হয়েছে।’
২০২৪-২৫ সালের অভিযুক্ত শিক্ষার্থী সানি নেহাল জানান, ক্যাম্পাসের বাইরে কুষ্টিয়া শহরে অবস্থানরত নবীন শিক্ষার্থীদেরও ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে ডাকা হতো। সেখানে হাসিব, সানাউল, রোহান, সাদিদ, মুহি, ফাহিম ও সাদমানসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকতেন। ক্লাসরুমে ‘ফরমাল পরিচয়পর্ব’ নেয়ার সময় তাদের ব্যাচের প্রায় সবাই ছিলেন, এমনকি ছাত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন। বেশির ভাগ কনিষ্ঠ শিক্ষার্থী আমাকে চিনত। তাই অন্যরা আমাকে দিয়েই কনিষ্ঠদের ডাকা হতো।
এদিকে, ক্যাম্পাসের বাইরে আনন্দনগরের ভাইভাই ছাত্রাবাসেও র্যাগিংয়ের অভিযোগ ওঠেছে। এক ভুক্তভোগী প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে জানান, প্রায় ১৫ দিন আগে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের তিনজন সিনিয়র ও তাদের বাইরের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি তাদের ছাদে নিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখেন।
পরে সিগারেটের ধোঁয়ায় ভরা একটি কক্ষে নিয়ে একজন একজন করে পরিচয় জিজ্ঞাসা করা হয়। ভুল উত্তর দিলে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। একপর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী কান্না শুরু করলে মেসের সিনিয়ররা এসে তাদের উদ্ধার করেন। অভিযুক্তদের নাম জানতে চাইলে ওই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি এখানে নতুন, তাই সবাইকে চিনি না।’
এর আগে, আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের এক নবীন ছাত্রীকে র্যাগিংয়ের অভিযোগ ওঠে। ওই ছাত্রীর কাছ থেকে বারবার ফরমাল পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। ভুল হলে অপমানকর মন্তব্য করা হয় এবং পরে তাকে ক্যাম্পাসে দেখা করতে বলা হয়। বিষয়টি অন্যান্য সিনিয়রদের জানালে পরে আপসের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয় বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া একই বর্ষের আরো তিন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এক নবীনকে জোর করে ধূমপান করানোরও অভিযোগ রয়েছে। তাকে রাত ১টা পর্যন্ত আটকে রাখা হয়। পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের চা খেতে ডাকার জন্য ফোন করতেও বলা হয়। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে সেটিও আপসের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়।
গত ৩ আগস্ট ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগেও জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির ঘটনা ঘটে। এর জেরে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন সিনিয়র নবীনদের ক্লাসরুমে গিয়ে কয়েকজনকে দাঁড় করিয়ে গালাগাল ও অপমান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থী কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে বিষয়টিও সমঝোতার মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়।
এ ছাড়া, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের পুরো ব্যাচের শিক্ষার্থীদের দিয়ে নবীনদের ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে একাধিকবার বসানো এবং একজন নারী শিক্ষার্থীকে আলাদা কক্ষে ডেকে মানসিকভাবে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের এক ক্লাস প্রতিনিধি বলেন, বিষয়গুলো শিক্ষকরা সমাধান করে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে এখন আর কোনো ক্ষোভ নেই। পরে তিনি এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
অন্য বিভাগগুলোর নবীন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওরিয়েন্টেশনের পর থেকেই ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে জ্যেষ্ঠরা ক্লাসরুমে এসে পরিচয় নেয়ার নামে হয়রানি করতেন। ভুল হলে গালাগাল করা হতো। রাতেও বিভিন্ন স্থানে ডেকে নেয়া হতো। অনেকের মোবাইল ফোন চেক করা হতো। বিষয়টি বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে জানাতে চাইলে তাকে বাধা দেয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন ওই শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় ২০২২-২৩ ও ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের একাধিক শিক্ষার্থী জড়িত বলে জানা যায়।
ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জ্যেষ্ঠরা আমাদের ফরমাল পরিচয় শিখিয়েছেন। তবে তাদের শেখানোর পদ্ধতি এবং কয়েকজনের আচরণ ও কথাবার্তায় অনেকেই কষ্ট পেয়েছে। এ নিয়ে কয়েকজন সিনিয়রের বিরুদ্ধে বিভাগে অভিযোগও দেয়া হয়েছে।’
পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের ক্লাসের বাইরে ফরমাল পরিচয়পর্ব হয়েছিল। এ ছাড়া আমাদের এক ব্যাচমেটকে নির্দোষ থাকা সত্ত্বেও সামান্য একটি বিষয় নিয়ে অপমান করা হয়। পরে বিষয়টি অবশ্য মিটমাট হয়ে যায়।’
আইন বিভাগের এক নবীন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের ক্লাসে এসে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা পরিচয়পর্ব নিয়েছিলেন। এ সময় আমাদের এক নারী সহপাঠীকে বার বার পরিচয় জিজ্ঞেস করায় সে বিব্রত হয়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়।’
ফার্মেসি বিভাগের এক নবীন শিক্ষার্থী বলেন, ‘২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা আমাদের ক্লাসে পরিচয়পর্ব নেন এবং ফরমাল পরিচয় শেখান। যারা পারেনি, তাদের দুই, তিন, চার ও পাঁচবার পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি করানো হয়। এতে অনেকেই বিব্রত হয়। আমরা নতুন ক্যাম্পাসে এসেছি, এখনো কিছুই ভালোভাবে জানি না। এর মধ্যে এসব অনেকের কাছেই খারাপ লাগে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, র্যাগিংয়ের বিষয়ে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। কেউ ফৌজদারি অপরাধ করলে তার ছাত্রত্বও চলে যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে সরাসরি কোনো অভিযোগ প্রশাসনের কাছে আসেনি। অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু বিষয় আমরা জেনেছি। এ নিয়ে বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের সাথে বসে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
নবীন শিক্ষার্থীদের ‘পরিচয়পর্ব শেখানোর’ কোনো নিয়ম আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো নিয়ম নেই। পরিচয়পর্বের নামে যা হচ্ছে, সে বিষয়ে বিভাগীয় সভাপতিদের কাছে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে।
ছাত্র উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, এমন কোনো অভিযোগ এলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। লিখিত অভিযোগ ছাড়াও যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ম্যানার’ বা ফরমাল পরিচয়পর্ব শেখানোর কোনো নিয়ম নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এ কে এম মতিনুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। এ নিয়ে বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও ডিনদের কাছে নোটিশ পাঠানোর বিষয়ে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।