স্থানীয়রা বলেন খান সাহেবের বাড়ি। এটি ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্য বহন করে। সংস্কারের অভাবে আজ সে বাড়ি প্রায় ধ্বংসের পথে। বগুড়া শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এবং দুপচাঁচিয়া উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার উত্তরে গুনাহার ইউনিয়নে অবস্থিত জমিদারবাড়িটি। এখানে ব্রিটিশ আমলের টেলিফোন সংযোগ, কেরোসিন তেলের ফ্যানসহ নানা শৌখিন আসবাবপত্র ছিল। এ বাড়ির কাঠামোগত সৌন্দর্য এবং লোকগাথা সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ার কারণে স্থানীয় পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গুনাহারের এই জমিদার বা সাহেব বাড়িটি তৈরি করেন খান বাহাদুর মোতাহার হোসেন খান। তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে বাংলার বিহার, উড়িষ্যার এক্সাইজ কমিশনার হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৩৯ সালে তিনি গুনাহারের মতো নিভৃত পল্লিতে নির্মাণ করেন রাজপ্রসাদতুল্য দ্বিতল বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন এবং বিলাসবহুল ভবন। ভবনের চারপাশ ঘিরে খনন করা হয়েছিল বিশাল নিরাপত্তা দিঘি। এই দিঘিতে জমিদার পরিবারের সদস্যরা বিকালে নৌ-ভ্রমণ করতেন। পাশাপাশি জমিদারবাড়ির পশ্চিম পাশে বিশাল ঘাট বাঁধানো দর্শনীয় পুকুর ছিল। পুকুরের পশ্চিম-দক্ষিণে রয়েছে বিশাল উঁচু সীমানা প্রাচীর। ১৯৫২ সালের ২ জুলাই তিনি নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। তিনি জীবদ্দশায় নিজের পরিবার-পরিজনের চেয়ে প্রজাসাধারণের সুখের কথা বেশি ভাবতেন। বর্তমানে বগুড়া শহরে অবস্থানরত চিরকুমারী রওনক মহল বাড়িটি নিজ দায়িত্বে দেখাশোনা করেন। এদিকে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে সংস্কার না হওয়ায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়িটি আজ ধ্বংস হতে চলেছে। ঘুরতে আসা পর্যটকরা চান মোতাহার হোসেন খানের কর্মযজ্ঞ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর এ বাড়ির অবকাঠামো ঠিক রেখে পরিকল্পিতভাবে সংস্কার করা হোক। এতে পর্যটকের সংখ্যা যেমন বাড়বে তেমনি এলাকার ঐতিহ্যবাহী বাড়িটিও সুরক্ষা করা সম্ভব হবে। স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটি পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তবে এর ভগ্নাবশেষও তৎকালীন স্থাপত্যশিল্পের ও জমিদারদের বিলাসবহুল জীবনের নিদর্শন বহন করে চলেছে। স্থানীয় বাসিন্দা লিপটন খান বলেন, ‘আমরা শুনেছি আগে বিভিন্ন দিবস ও উৎসবে আত্মীয়স্বজন, প্রজা, কর্মচারী আর কর্মকর্তাদের পদচারণায় মুখর থাকত জমিদারবাড়ি।’ বাড়িটি দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন আক্কাস আলী। তিনি বলেন, ‘আমি বাড়িটির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করি। এ ছাড়াও ঘুরতে আসা পর্যটকদের বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাই। বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সংস্কার করা জরুরি।’ সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, ‘গুনাহারে দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো সাহেব বাড়ি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং জমির মালিকগণ পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এখানে পর্যটন এলাকা গড়ে তুলতে পারেন।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ্রুখ খান বলেন, ‘গুনাহারের জমিদার বাড়ি বা সাহেব বাড়িটি ঐতিহ্যসমৃদ্ধ। জেনেছি এই বাড়িটি ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি। একটি বড় প্রাচীন অবকাঠামো যা দেখতে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসেন। ঘুরে ফিরে দেখেন, ছবি তোলেন। জমিদারের বংশধর বা মালিকরা চাইলে বাড়িটি পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।’