ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজলে ফুটবল মাঠের ভাষা বদলে যায়। কিছুক্ষণ আগেও যে দুই মানুষ একে অপরকে থামাতে সর্বশক্তি দিয়ে দৌড়েছেন, ট্যাকল করেছেন, গোল বাঁচাতে কিংবা গোল করতে শরীরের শেষ শক্তিটুকু উজাড় করে দিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে তাঁরাই এগিয়ে আসেন হাসিমুখে। কেউ করমর্দন করেন, কেউ কাঁধে হাত রাখেন, কেউ আলিঙ্গন করেন। তারপর ধীরে ধীরে খুলে ফেলেন নিজের ঘামে ভেজা জার্সি। সেটি তুলে দেন প্রতিপক্ষের হাতে। যে মানুষটিকে হারানোর জন্য নব্বই মিনিট লড়াই, শেষ বাঁশির পর তাঁর হাতেই তুলে দেওয়া হয় একটি ম্যাচের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন: নিজের ব্যবহৃত জার্সি।
ফুটবলের এই দৃশ্যটি কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে কয়েক দশকের ইতিহাস। একটি জার্সি তখন আর শুধু কাপড়ের টুকরো থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে এক ম্যাচের সাক্ষী, এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্মারক, এক সময়ের দলিল। স্টেডিয়ামের আলো নিভে যায়, দর্শক ঘরে ফেরে, স্কোরলাইন ইতিহাসের পাতায় জায়গা নেয়। কিন্তু সেই জার্সি থেকে যায়। কখনো কোনো ফুটবলারের ঘরের দেয়ালে, কখনো ক্লাবের সংগ্রহশালায়, কখনো জাদুঘরে, কখনো আবার কোটি টাকার নিলামে।
বিশ্বকাপের জার্সি বিনিময় ফিফার বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়। এটি ফুটবলের অলিখিত এক সংস্কৃতি। মাঠে প্রতিপক্ষকে হারানোর চেষ্টা থাকবে, কিন্তু খেলা শেষ হলে তাকে সম্মান জানানোও থাকবে। এই জায়গাটিই ফুটবলকে শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এক মানবিক ভাষায় পরিণত করেছে।
সময়ের সঙ্গে জার্সির কাজও বদলে গেছে। দল চেনানোর পোশাক থেকে এটি হয়ে উঠেছে জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। রং, প্রতীক, ব্যাজ, এমনকি বুকের ছোট্ট একটি চিহ্নও বহন করে একটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কোটি মানুষের আবেগ।
আর্জেন্টিনার নীল-সাদা, ব্রাজিলের হলুদ কিংবা জার্মানির সাদা, প্রতিটি জার্সি শুধু একটি দেশের পোশাক নয়, কোটি মানুষের আবেগ। বিশ্বকাপে একজন ফুটবলার যখন সেই জার্সি গায়ে তোলেন, তিনি শুধু একটি দলের প্রতিনিধি নন; তিনি হয়ে ওঠেন একটি জাতির স্বপ্নবাহক।
জার্সি বিনিময়ের ইতিহাস নিয়েও ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের শেষ নেই। ফুটবল ইতিহাসে ১৯৩১ সালে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের ম্যাচের পর জার্সি বদলের কথা উল্লেখযোগ্যভাবে পাওয়া যায়। তবে বিশ্বকাপের স্মৃতিতে এই ঐতিহ্য সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ১৯৭০ সালে, মেক্সিকো বিশ্বকাপে। ব্রাজিলের পেলে ও ইংল্যান্ডের ববি মুর ম্যাচ শেষে জার্সি বদলেছিলেন। সেই ছবিটি আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত আলোকচিত্রগুলোর একটি। অনেকের মতে, জার্সি বিনিময়ের সংস্কৃতিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলতে এই ছবির ভূমিকা ছিল অসাধারণ। মাঠে তাঁরা ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী, শেষ বাঁশির পর তাঁরা হয়ে ওঠেন পারস্পরিক শ্রদ্ধার দুই মুখ। ব্রাজিল সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়েছিল, কিন্তু পেলে ও ববি মুরের জার্সি বিনিময়ের ছবিটি জয়-পরাজয়ের হিসাব ছাড়িয়ে ফুটবলের মানবিক স্মারক হয়ে আছে।
আরেকটি জার্সি ফুটবল ইতিহাসে কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচেই ডিয়েগো ম্যারাডোনা করেছিলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুটি গোল। একটি “হ্যান্ড অব গড”, অন্যটি পরে “গোল অব দ্য সেঞ্চুরি” নামে অমর হয়ে যায়। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের স্টিভ হজ ম্যারাডোনার সঙ্গে জার্সি বদল করেন। বহু বছর পর সেই জার্সি নিলামে বিক্রি হয় ৭.১ মিলিয়ন পাউন্ডে, প্রায় ৮.৯ মিলিয়ন ডলারে। একটি জার্সির দাম কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু সংগ্রাহকদের কাছে তার প্রকৃত মূল্য কাপড়ে নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসে।
বিশ্বকাপের জার্সি তৈরির পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি। জার্সির রং থেকে শুরু করে নাম, নম্বর, ব্যাজ, সবকিছুর জন্য ফিফার নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। দুই দলের জার্সি যেন একে অন্যের সঙ্গে মিশে না যায়, গোলকিপারের পোশাক যেন আলাদা হয়, টেলিভিশনে নম্বর স্পষ্ট দেখা যায়, এসবই আগে থেকেই পরীক্ষা করা হয়।
একজন খেলোয়াড়ের জন্য ঠিক কতটি জার্সি তৈরি হয়, তার নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। দল, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান, ম্যাচসংখ্যা এবং টুর্নামেন্টে কত দূর এগোয়, তার ওপর তা নির্ভর করে। তবে প্রতিটি ম্যাচের জন্য একাধিক জার্সি প্রস্তুত রাখা হয়। একটি ম্যাচে জার্সি ছিঁড়ে গেলে, দাগ লাগলে, অতিরিক্ত ঘামে বদলাতে হলে কিংবা ম্যাচ শেষে বিনিময় করতে হলে যেন কোনো সমস্যা না হয়, সে ব্যবস্থাও আগে থেকেই রাখা থাকে।
আজকের বিশ্বকাপে অধিকাংশ দলের জার্সি তৈরি করে Adidas, Nike ও Puma। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রযুক্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত সব জার্সিকেই ফিফার অনুমোদন পেতে হয়।
জার্সি বিনিময় কখনো পরিকল্পিত, কখনো তাৎক্ষণিক। কিন্তু সবসময় জার্সি বদল সুখের দৃশ্য নয়। কখনো ম্যাচে উত্তেজনা থাকে, বিতর্ক থাকে, রাগ থাকে। তখন জার্সি বিনিময় হয় না।
সবচেয়ে মূল্যবান জার্সিগুলো সাধারণত তিন কারণে বড় হয়ে ওঠে। প্রথমত, খেলোয়াড়ের মর্যাদা। দ্বিতীয়ত, ম্যাচের গুরুত্ব। তৃতীয়ত, সেই জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্প। ম্যারাডোনার ১৯৮৬ সালের জার্সি এত মূল্যবান শুধু ম্যারাডোনা বলেই নয়; সেটি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচের, ফকল্যান্ড যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক আবহের, “হ্যান্ড অব গড” ও “গোল অব দ্য সেঞ্চুরি”র জার্সি।
একটি বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়। ট্রফি নতুন ঠিকানা পায়। দর্শক নতুন মৌসুমের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু কোথাও কোনো দেয়ালে, কোনো জাদুঘরের কাচের বাক্সে, কিংবা কোনো ফুটবলারের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ঝুলে থাকে একটি জার্সি। সেখানে শুধু একটি নাম কিংবা একটি নম্বর লেখা থাকে না। লেগে থাকে একটি সময়ের স্মৃতি এবং প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মানের এক অনন্ত গল্প।
তথ্যসূত্র: FIFA Equipment Regulations; Sotheby’s; Reuters; AP; The Guardian