আসন্ন বাজেট নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। কোথায় কত বরাদ্দ হবে, কর বাড়বে না কমবে, ঘাটতি কত দাঁড়াবে- এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাধারণ নাগরিকের কাছে বাজেটের অর্থ আরো সরাসরি। এটি বাজারের খরচ, সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা, চাকরির সুযোগ, কৃষকের ফসলের দাম, শ্রমিকের মজুরি এবং ছোট ব্যবসার টিকে থাকা প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রে বাজেট নাগরিকের জীবনমান, নিরাপত্তা, এমনকি জীবন-মরণের প্রশ্নের সাথেও জড়িত।

তাই বাজেটের আলোচনায় শুধু বড় বড় সংখ্যার দিকে তাকালেই হবে না। দেখতে হবে, রাষ্ট্রের হিসাবের ভেতরে মানুষের জীবনের মূল্য কতটা স্বীকৃতি পাচ্ছে। জিনিসের দাম কমলো কি? চাকরির সুযোগ বাড়ল কি? রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে কি? কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবন কি একটু নিরাপদ হলো?

প্রবৃদ্ধি হচ্ছে; কিন্তু কার জন্য : বাংলাদেশ এখন আর ছোট অর্থনীতির দেশ নয়। জিডিপি বড় হয়েছে, রফতানি, প্রবাসী আয় বেড়েছে, অবকাঠামো দৃশ্যমান। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়, আয় বৈষম্য এবং মধ্যবিত্তের অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। প্রবৃদ্ধি অবশ্যই দরকার; অর্থনীতি বড় না হলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এগোবে না। কিন্তু আয়-বৈষম্য কতটুকু কমছে, সেটিও জরুরি। কারণ জিডিপি বলে, অর্থনীতি কত বড় হচ্ছে; আয় বৈষম্য বলে, সেই বড় হওয়া কতটা ন্যায্য।

প্রবৃদ্ধি বড় হলেই মানুষের জীবন ভালো হয় না। প্রবৃদ্ধি যদি অল্প কিছু মানুষের হাতে জমা হয়, আর সাধারণ মানুষ বাজারদর, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ সামলাতে হিমশিম খায়, তাহলে সেই উন্নয়ন অর্থহীন। অমর্ত্য সেনের ভাষায়, উন্নয়ন মানে শুধু রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধি নয়; মানুষের সুযোগ, স্বাধীনতা ও বেছে নেয়ার ক্ষমতা বাড়ানো। সত্যিকারের উন্নয়ন তখনই হয়, যখন তা জনজীবনে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ইনসাফ তৈরি করে।

আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান : প্রতিবেশী অর্থনীতিগুলোর সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা দুটোই বোঝা যায়। ২০২৪ সালের বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার; যেখানে পাকিস্তান প্রায় ৩৭২ বিলিয়ন, শ্রীলঙ্কা প্রায় ৯৯ বিলিয়ন, নেপাল ৪৩ বিলিয়ন, মালদ্বীপ সাত বিলিয়ন এবং ভুটান প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। মাথাপিছু আয়ে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও ভুটান এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের বড় শক্তি অর্থনীতির আকার, শ্রমশক্তি, উৎপাদনভিত্তি, রফতানি ও রেমিট্যান্স। পাকিস্তানের তুলনায়ও বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় এবং মাথাপিছু আয় বেশি; এটি আত্মতুষ্টির নয়; বরং আত্মবিশ্বাসের জায়গা। সম্ভাবনা আছে; এখন দরকার ন্যায্যতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি।

শ্রমজীবীর জীবন কতটা গুরুত্ব পায় : বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের বড় ভরকেন্দ্র তৈরী পোশাক ও প্রবাসী আয়। অর্থনীতির বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে গার্মেন্ট ও প্রবাসী শ্রমিকের শ্রমের ওপর। কিন্তু বাজেটে তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পরিবারের ভবিষ্যৎ কতটা গুরুত্ব পায়?

বাজেট শুধু খরচ নয়, বিনিয়োগও : আমরা বাজেটকে প্রায়শ বড় প্রকল্প ও বড় বরাদ্দের ভাষায় দেখি। কিন্তু প্রশ্ন হওয়া উচিত, খরচের ফলে কার জীবন বদলাচ্ছে? একটি রাস্তা যদি কৃষকের বাজারে যাওয়া সহজ করে, ছোট ব্যবসার পরিবহন খরচ কমায়, শিক্ষার্থীর স্কুলে যাওয়া নিরাপদ করে, তাহলে সেটি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ। কিন্তু কোনো প্রকল্প যদি শুধু ব্যয় ও ঋণের বোঝা বাড়ায়, অথচ মানুষের আয়-রোজগারে প্রভাব না ফেলে, তাহলে সেটি উন্নয়ন নয়।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, দক্ষতা ও গবেষণা : মানসম্মত শিক্ষা, চাকরির বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সংযোগ এবং মেধাপাচার কমাতে দেশে যোগ্য তরুণদের জন্য কাজ, গবেষণা ও মর্যাদাপূর্ণ সুযোগ তৈরি। এসব সামাজিক খরচ নয়; এগুলো অর্থনীতির ভিত্তি। একজন শিক্ষিত, দক্ষ মানুষ শুধু নিজের আয় বাড়ায় না, পুরো অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।

স্বাস্থ্য খাত : বিনিয়োগ, নাকি মুনাফার বাজার : অসুস্থতায় পরিবারের প্রথম চিন্তা হওয়ার কথা, ‘কোথায় ভালো চিকিৎসা পাব?’ কিন্তু বাস্তবে অনেক পরিবারের প্রথম চিন্তা হয়, ‘টাকা জোগাড় করব কিভাবে?’ ধনী মানুষ দ্রুত ভালো চিকিৎসা পায়। মধ্যবিত্ত সঞ্চয় ভেঙে বা ঋণ করে চিকিৎসা চালায়। আর গরিব মানুষ অনেক সময় চিকিৎসা পায় দেরিতে, অপর্যাপ্তভাবে কিংবা পায়ই না। অনেক ক্ষেত্রে তার জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

এটি শুধু স্বাস্থ্যবৈষম্য নয়; অর্থনৈতিক বৈষম্যও। কারণ অসুস্থতা তখন শুধু শরীরের সমস্যা থাকে না, পুরো পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা ভেঙে দেয়।

করনীতি ও ন্যায্যতার প্রশ্ন : সাধারণ মানুষ সরাসরি আয়কর না দিলেও ভ্যাট, শুল্ক ও পণ্যমূল্যের মাধ্যমে কর দেয়। দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের বড় অংশ খরচ করে খাদ্য, বাসা, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষায়। ফলে পরোক্ষ করের চাপ শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই বেশি পড়ে। অন্যদিকে বড় সম্পদ, বিলাসী ভোগ, কর ফাঁকি ও অস্বচ্ছ সুবিধা থেকে রাষ্ট্র কতটা ন্যায্য কর তুলতে পারে, সেটি অর্থনৈতিক যেমন- তেমনি রাজনৈতিক প্রশ্নও। করনীতি আসলে ক্ষমতার মানচিত্র দেখায়।

কোন খাতগুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে : বাজেটে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত সেই খাতের, যেখানে বিনিয়োগ করলে মানুষের আয় বাড়ে, ব্যয় কমে, ঝুঁকি কমে এবং ভবিষ্যৎ নিরাপদ হয়। বাংলাদেশের জন্য জরুরি খাতগুলো হলো : স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা ও গবেষণা-উদ্ভাবন (জ্উ), কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও বাজার ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়, সামাজিক সুরক্ষা, রফতানি বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ শিল্প, করনীতি, প্রশাসনিক সংস্কার ও জবাবদিহি, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহনশীলতা।

নিত্যপণ্যের উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত ডিজিটাল ইনভেন্টরি ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে মজুদদারি ও কৃত্রিম সঙ্কট ঠেকানো যায় এবং সরকার তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য পায়। পাশাপাশি চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও দালালি বন্ধ না হলে ব্যবসার খরচ বাড়বে, বিনিয়োগ কমবে। বাজেটের সুফল সাধারণের কাছে পৌঁছাবে না।

ভালো বাজেট বাস্তবায়ন করবে কোন ব্যবস্থা : বাজেট যতই কল্যাণমুখী হোক, দুর্নীতি, অপচয়, দালালি, অদক্ষতা এবং জবাবদিহির অভাব থাকলে তা মানুষের জীবনে পৌঁছায় না। ভালো নীতির জন্য দরকার সৎ প্রশাসন, স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক ব্যয়ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। জনগণ শুধু নতুন বাজেট দেখতে চায় না; তারা দেখতে চায় নতুন আচরণ, নতুন অগ্রাধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায্যতার বাস্তব প্রমাণ।

শেষ কথা : বাংলাদেশে এমন বাজেট দরকার, যা শুধু আকারে বড় নয়, চিন্তায়ও বড়- অর্থাৎ দূরদর্শী ও জনমুখী বাজেট। যেখানে উন্নয়নের স্লোগানের পাশাপাশি থাকবে উন্নয়নের ন্যায্য বণ্টন। শেষ পর্যন্ত বাজেটের পরীক্ষা সংসদে নয়, মানুষের জীবনে। ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়ন হবে বাংলাদেশের সুশাসনের পথে মাইলফলক। সেই রক্তের ঋণ শোধ হবে তখনই, যখন এই বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হবে সনদের প্রতিশ্রুত রাষ্ট্রীয় সিস্টেম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। জনগণের ম্যান্ডেটে গঠিত নেতৃত্বের প্রথম বাজেট তাই একটি পরীক্ষা। রাষ্ট্রের হিসাব তখনই অর্থবহ, যখন প্রতিটি মানুষ বলতে পারে : ‘এই রাষ্ট্রের হিসাবের ভেতরে আমিও আছি।’

লেখক : কানাডা প্রবাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews