বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। এটি এখন আর শুধু পরিসংখ্যানের ভাষা নয়, আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। উপকূলের লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অকাল বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের ঘনঘটা, এসব আমাদের জীবনযাত্রা, কৃষি ও অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জন্য কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়, এটি একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও। তবে এই সংকটের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত। বিশ্ব যখন কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য বিকল্প পথ খুঁজছে, তখন ‘কার্বন ক্রেডিট’ ধারণাটি ধীরে ধীরে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো হিসেবে উঠে এসেছে। সহজভাবে বলতে গেলে, যে দেশ বা প্রতিষ্ঠান পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারে, সেদেশ সেই সাফল্যকে একটি অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি একটি বিশেষ সুযোগ। কারণ, আমাদের দেশে এখনো বনায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলাভূমি সংরক্ষণ কিংবা টেকসই কৃষির মতো বহু খাতে কাজ করার বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে। এই খাতগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব, অন্যদিকে বৈশ্বিক কার্বন বাজারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি নতুন ও টেকসই উৎস তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তনের যে ঝুঁকি আজ আমাদের জন্য এক ধরনের চাপ তৈরি করেছে, সেটিকেই কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়ে আমরা একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক পথ তৈরি করতে পারি, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কার্বন ক্রেডিট।
কার্বন ক্রেডিট বিষয়টি প্রথমে একটু জটিল মনে হলেও, আসলে ধারণাটি বেশ সহজ এবং বাস্তবমুখী। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণগুলোর একটি হলো অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন। এই নির্গমন কমানোর জন্যই আন্তর্জাতিকভাবে একটি বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যাকে আমরা বলি কার্বন ক্রেডিট। সহজভাবে বলতে গেলে, একটি কার্বন ক্রেডিট মানে হলো এক টন CO₂ বা সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো বা শোষণ করা হয়েছে এমন একটি স্বীকৃতি বা ‘সার্টিফিকেট’। যে দেশ, প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্প এই নির্গমন কমাতে সক্ষম হয়, তারা সেই অর্জনকে একটি ক্রেডিট হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব দেশ বা প্রতিষ্ঠান সমানভাবে নির্গমন কমাতে পারে না। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর অনেক শিল্পকারখানা দ্রুত নির্গমন কমাতে প্রযুক্তিগত বা আর্থিক সীমাবদ্ধতায় পড়ে। ফলে যেসব দেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে, যেখানে তুলনামূলক কম খরচে বেশি কার্বন কমানো সম্ভব। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় কার্বন মার্কেট মেকানিজম। কার্বন ক্রেডিট সাধারণত দুই ধরনের বাজারে লেনদেন হয়, প্রথমটি হলো Compliance Market, যেখানে সরকার নির্ধারিত আইন বা আন্তর্জাতিক চুক্তি (যেমন: প্যারিস চুক্তি) অনুযায়ী নির্গমন কমানোর বাধ্যবাধকতা থাকে। দ্বিতীয়টি হলো Voluntary Carbon Market, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বেচ্ছায় তাদের ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ কমানোর জন্য ক্রেডিট কিনে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ধরুন, বাংলাদেশের কোনো এলাকায় বড় পরিসরে বনায়ন করা হলো বা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করা হলো। এতে করে যে পরিমাণ কার্বন শোষণ বা নির্গমন হ্রাস হবে, সেটি আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই করে নির্দিষ্ট সংখ্যক কার্বন ক্রেডিট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এরপর সেই ক্রেডিট ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো কোম্পানি কিনে নিতে পারে, যে তার নিজস্ব নির্গমন ‘অফসেট’ করতে চায়।
বর্তমানে বৈশ্বিক কার্বন বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, কার্বন প্রাইসিং ব্যবস্থার আওতায় থাকা বাজারের মোট মূল্য ২০২৩ সালে প্রায় ৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবী কার্বন বাজারও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, কার্বন ক্রেডিট শুধু একটি পরিবেশগত উদ্যোগ নয়, এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে ‘দূষণ কমানো’ নিজেই একটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি তাই একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি কার্যকর সুযোগ।
কীভাবে কার্বন ক্রেডিট পাওয়া যায়? কার্বন ক্রেডিট অর্জনের প্রক্রিয়াটি শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে এটি একটি সুসংগঠিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতির মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করতে হয়। তবে ধাপে ধাপে বুঝলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। মূলত, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে আপনি প্রমাণ করতে পারবেন আপনার কোনো উদ্যোগ বাস্তবেই কার্বন নিঃসরণ কমিয়েছে বা শোষণ করেছে। প্রথম ধাপ হলো প্রকল্প গ্রহণ, যা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস কমায়। বাংলাদেশে এই ধরনের প্রকল্পের সম্ভাবনা অনেক যেমন বৃহৎ আকারের বনায়ন কর্মসূচি, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন, ইটভাটা আধুনিকায়ন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন কিংবা কৃষিতে টেকসই পদ্ধতির ব্যবহার। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকল্পটি additional হতে হবে - অর্থাৎ এটি এমন কিছু হতে হবে, যা কার্বন ক্রেডিটের প্রণোদনা ছাড়া স্বাভাবিকভাবে বাস্তবায়িত হতো না।
দ্বিতীয় ধাপটি হলো পরিমাপ, প্রতিবেদন ও যাচাই। এই ধাপটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রযুক্তিগতভাবে চ্যালেঞ্জিং। এখানে নির্ধারণ করা হয় প্রকল্প বাস্তবে কতটুকু কার্বন নিঃসরণ কমিয়েছে বা শোষণ করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি ব্যবহার করে এই হিসাব করা হয় এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তা যাচাই করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প কতটুকু জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়েছে, বা একটি বনায়ন প্রকল্প বছরে কত টন CO₂ শোষণ করছে, এসব তথ্য নির্ভুলভাবে প্রমাণ করতে হয়। তৃতীয় ধাপ হলো নিবন্ধন ও ক্রেডিট ইস্যু। প্রকল্পটি সফলভাবে যাচাই হওয়ার পর সেটিকে আন্তর্জাতিক কোনো কার্বন স্ট্যান্ডার্ড বা প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন করতে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো UNFCCC (United Nations Framework Convention on Climate Change) বা জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন এর Clean Development Mechanism (CDM), Verra (VCS- Verified Carbon Standard), এবং Gold Standard| Verra হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বেচ্ছাসেবী কার্বন বাজারের একটি প্ল্যাটফর্ম, যার অধীনে পরিচালিত হয় Verified Carbon Standard (VCS)। এই স্ট্যান্ডার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প যেমন বনায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে অর্জিত কার্বন হ্রাস যাচাই করে Verified Carbon Units (VCUs) নামে ক্রেডিট ইস্যু করা হয়। Gold Standard মূলত ২০০৩ সালে WWF (World Wide Fund for Nature) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপরই জোর দেয় না, বরং একটি প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত সহ-উপকারিতা কেও গুরুত্ব দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো বায়োগ্যাস প্রকল্প যদি শুধু কার্বন কমায় তা নয়, একই সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের রান্নার জ্বালানি খরচ কমায় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস করে, তাহলে সেটি Gold Standard-এর জন্য বেশি উপযুক্ত। নিবন্ধনের পর নির্ধারিত পরিমাণ কার্বন হ্রাসের ভিত্তিতে প্রকল্পটিকে কার্বন ক্রেডিট দেওয়া হয়।
সবশেষ ধাপ হলো, অর্জিত কার্বন ক্রেডিট আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা। যেখানে উন্নত দেশের কোম্পানি বা সংস্থাগুলো তাদের নির্গমন ‘অফসেট’ করার জন্য এগুলো কিনে থাকে। বর্তমানে অনেক বড় বহুজাতিক কোম্পানি যেমন প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্বন নিরপেক্ষ (carbon neutral) হওয়ার লক্ষ্য পূরণে এই বাজারে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে । বাস্তবতার দিক থেকে এই পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ এবং প্রাথমিক বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। একটি প্রকল্প থেকে কার্বন ক্রেডিট পেতে সাধারণত ২ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কারণ, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, যাচাই এবং নিবন্ধন সবকিছুই ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে হয়।
বাংলাদেশের জন্য কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাব্য উপকারিতা কেবল অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পরিবেশ, সমাজ এবং উন্নয়নে একসঙ্গে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিষয়টি একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এটি আসলে একটি ‘উইন-উইন’ মডেল, যেখানে উন্নয়ন এবং পরিবেশ দুটিই একসঙ্গে এগিয়ে যায়।
প্রথমত, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস হিসেবে কার্বন ক্রেডিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী স্বেচ্ছাসেবী কার্বন বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২২ সালে যার আকার প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং আগামী দশকে এটি ৫০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি পরিকল্পিতভাবে বনায়ন, সৌর বিদ্যুৎ বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পগুলোকে কার্বন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। এটি রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপও কিছুটা কমাতে পারে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশগত উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে কার্বন ক্রেডিট একটি কার্যকর প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। সাধারণত পরিবেশবান্ধব প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ তুলনামূলক কম হয়, কারণ তাৎক্ষণিক লাভ কম থাকে। কিন্তু কার্বন ক্রেডিট যুক্ত হলে এই প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে ওঠে। যেমন বনায়ন কর্মসূচি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি (বিশেষ করে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ), জৈব সার ব্যবহার বা জলাভূমি সংরক্ষণ) এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। FAO (2020) অনুযায়ী, বনায়ন প্রকল্প শুধু কার্বন শোষণই করে না, বরং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ভূমিক্ষয় রোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তৃতীয়ত, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পই গ্রামীণ এলাকায় বাস্তবায়নযোগ্যÑ যেমন সামাজিক বনায়ন, কৃষিভিত্তিক কার্বন প্রকল্প, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বা সৌর হোম সিস্টেম। এসব প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ থাকে। ফলে তারা সরাসরি আর্থিকভাবে উপকৃত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বায়োগ্যাস প্রকল্পগুলো শুধু কার্বন নিঃসরণ কমায় না, একই সঙ্গে জ্বালানি খরচ কমায় এবং গ্রামীণ জীবনের মান উন্নত করে। চতুর্থত, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতেও এটি সহায়ক। উপকূলীয় বনায়ন বা ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার প্রকল্প একদিকে যেমন কার্বন শোষণ করে, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমায়। অর্থাৎ, একই প্রকল্প থেকে দ্বৈত সুবিধা পাওয়া যায়-কার্বন ক্রেডিট এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস। সব মিলিয়ে বলা যায়, কার্বন ক্রেডিট বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি নতুন আয়ের পথ নয়; এটি একটি সমন্বিত উন্নয়ন কৌশল, যা অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সমাজ, এই তিনটি স্তম্ভকে একসঙ্গে শক্তিশালী করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা থাকলে, এটি দেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ এ বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে এই প্রেক্ষাপটে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের দুটি বড় কর্মসূচি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে: (ক) ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি এবং (খ) আগামী ৫ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। প্রথম নজরে এগুলো হয়তো প্রচলিত উন্নয়ন প্রকল্প বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই উদ্যোগগুলো কেবল অবকাঠামোগত বা পরিবেশগত নয় বরং আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে প্রবেশের একটি কৌশলগত সুযোগও তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এগুলো নিছক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি না হয়ে একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ‘মাস্টার স্ট্রোক’ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
শুধু পানি নয়, কার্বনের সঞ্চয়ও। বাংলাদেশের বহু খাল ও জলাশয় সময়ের সাথে ভরাট হয়ে গেছে বা কার্যকারিতা হারিয়েছে। এগুলো পুনঃখননের মাধ্যমে শুধু পানি প্রবাহ বাড়ানো বা কৃষিতে সহায়তা করা নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ভূমিকা রাখা সম্ভব। জলাভূমি বিশ্বে সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক কার্বন সিঙ্কগুলোর একটি। গবেষণা অনুযায়ী, জলাভূমি প্রতি হেক্টরে বছরে প্রায় ১.৫ থেকে ৩ টন CO₂ শোষণ করতে পারে । যদি ২০,০০০ কিলোমিটার খাল পুনরুদ্ধার করা হয় এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত জলাভূমি ও প্লাবনভূমি পুনরুজ্জীবিত হয়, তাহলে এটি একটি বৃহৎ blue carbon ecosystem হিসেবে কাজ করতে পারে। ধরা যাক, এই খালগুলোর পাশে ও আশপাশে গড়ে ওঠা জলাধার ও প্লাবনভূমি মিলিয়ে কয়েক লক্ষ হেক্টর এলাকা পুনরুদ্ধার হলো, তাহলে বছরে কয়েক মিলিয়ন টন CO₂ শোষণের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি এটি কৃষি উৎপাদন বাড়াবে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উন্নত করবে এবং বন্যা ব্যবস্থাপনাকেও শক্তিশালী করবে। অর্থাৎ, এক প্রকল্পে একাধিক সুবিধা।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি কার্বন ক্রেডিটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সরাসরি ও পরীক্ষিত একটি উপায়। FAO (2020) অনুযায়ী, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বছরে গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি CO₂ শোষণ করতে পারে। এখন যদি ধরা হয়, জাতীয় পর্যায়ে ১০ থেকে ২০ কোটি গাছ লাগানো হলো এবং এর একটি বড় অংশ টিকে গেল, তাহলে বছরে প্রায় ২ থেকে ৫ মিলিয়ন টন CO₂ শোষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংখ্যা আরও বাড়বে, কারণ গাছ যত বড় হবে, তার কার্বন শোষণ ক্ষমতাও বাড়বে। এখানে শুধু গাছ লাগানো নয়, বরং সঠিক প্রজাতি নির্বাচন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করা। এতে করে প্রকল্পটি শুধু কার্বন ক্রেডিটই দেবে না, বরং কর্মসংস্থান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ভূমি সুরক্ষার ক্ষেত্রেও অবদান রাখবে।
বাংলাদেশ কার্বন ক্রেডিটের ক্ষেত্রে একেবারে নতুন নয় বরং গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সীমিত পরিসরে হলেও এই খাতে কাজ করে আসছে। বিশেষ করে UNFCCC-এর Clean Development Mechanism (CDM) এর আওতায় বাংলাদেশ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, যা আমাদের জন্য অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। সবচেয়ে বেশি পরিচিত উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে বায়োগ্যাস প্রকল্প, যেখানে গ্রামীণ পর্যায়ে জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে জ্বালানি উৎপাদন করা হয়েছে। এসব প্রকল্প শুধু কার্বন নিঃসরণ কমায়নি, বরং রান্নার জ্বালানির খরচ কমিয়েছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও হ্রাস করেছে। UNFCCC-এর তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের ছোট ছোট প্রকল্প মিলিয়েই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নির্গমন হ্রাস অর্জন করা সম্ভব হয়েছে ।এছাড়া ইটভাটা আধুনিকায়ন (Improved Brick Kiln প্রযুক্তি) বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রচলিত ইটভাটার পরিবর্তে জিগজ্যাগ বা হাইব্রিড হফম্যান কিলন (HHK) প্রযুক্তি ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটাগুলো প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৫০% পর্যন্ত কার্বন নিঃসরণ কমাতে সক্ষম। একইভাবে, ক্ষুদ্র নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বিশেষ করে সৌর হোম সিস্টেম বাংলাদেশে কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। IDCOL (Infrastructure Development Company Limited) এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত সৌর হোম সিস্টেম কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অফ-গ্রিড সৌর উদ্যোগ, যার মাধ্যমে লক্ষাধিক পরিবারের জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমেছে। এর ফলে পরোক্ষভাবে বিপুল পরিমাণ CO₂ নির্গমন হ্রাস পেয়েছে । সব মিলিয়ে, এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুমানিকভাবে কয়েক মিলিয়ন টন CO₂ সমপরিমাণ নির্গমন হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছে এবং সীমিত আকারে কার্বন ক্রেডিট অর্জন করেছে । যদিও এই সংখ্যা বৈশ্বিক পরিসরে বড় নয়, তবে এটি আমাদের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
তবে একটি বাস্তব চিত্রও এখানে তুলে ধরা জরুরি, বাংলাদেশ এখনো কার্বন বাজারে তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি। এর পেছনে রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা, যেমন কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি, জটিল নিবন্ধন প্রক্রিয়া, এবং দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ যাচাই ব্যবস্থা। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় প্রকল্পও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারেনি। তারপরও ইতিবাচক দিক হলো, এই প্রাথমিক অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে আন্তর্জাতিক মানদ-ে কাজ করতে হয়। এখন যদি বৃহৎ পরিসরে বনায়ন, জলাভূমি পুনরুদ্ধার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলোকে কার্বন ক্রেডিট কাঠামোর মধ্যে আনা যায়, তাহলে অতীতের এই ছোট ছোট উদ্যোগই ভবিষ্যতের বড় সাফল্যের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যাত্রা শুরু করেছে এখন প্রয়োজন সেই পথকে আরও বিস্তৃত ও গতিশীল করা।
কার্বন ক্রেডিটকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে শুধু কিছু প্রকল্প হাতে নিলেই হবে না, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং বাস্তবমুখী জাতীয় কৌশল। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কিছু প্রাথমিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকে বড় পরিসরে কাজে লাগাতে হলে এখন সময় এসেছে আরও পরিকল্পিতভাবে এগোনোর।
প্রথমত, জাতীয় কার্বন মার্কেট ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করাঅ। দ্বিতীয়ত, MRV (Measurement, Reporting, Verification) সক্ষমতা উন্নয়ন। তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতকে সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা। চতুর্থত, কার্বন ফান্ড বা গ্রিন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। পঞ্চমত, উপকূলীয় ব্লু-কার্বন (Blue Carbon) প্রকল্প সম্প্রসারণ।
লেখক: অধ্যাপক, ডীন, ব্যাবসায় প্রশাসন অনুষদ এবং চেয়ারম্যান, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী
[email protected]