ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, প্রচারে ততই সরগরম হয়ে উঠছে কুড়িগ্রামের চারটি সংসদীয় আসন। একেক আসনে একেক একেক প্রার্থী এগিয়ে আছেন বলে মনে করা হলেও ফল নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকাশ্যে মত জানাচ্ছেন মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ভোটার। বাকি ৬০ শতাংশই নিশ্চুপ। বিশেষ করে, নতুন ভোটার আর আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভোট হয়ে উঠতে পারে এসব আসনে জয়ের নিয়ামক। ফলে নীরব ভোটারদের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন প্রার্থীরা। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, জাতীয় পার্টি-সবাই তাদের মন জয়ে নিচ্ছেন নানা উদ্যোগ, দিচ্ছেন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

সূত্র মতে, কুড়িগ্রাম-১ আসনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটার প্রায় ৫০ হাজার, ২-এ প্রায় ৬০ হাজার, ৩-এ প্রায় ৩৭ হাজার, ৪-এ প্রায় ৩০ হাজার। জেলা হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের সভাপতি ছানালাল বকসী বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারের সংখ্যা সামান্য কমবেশি হতে পারে। তবে ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতারা ও বেশকিছু কর্মী-সমর্থক পলাতক থাকায় আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কত শতাংশ ভোটার রয়েছে তা বলা কঠিন।

কুড়িগ্রাম-১ (নাগেশ্বরী-ভূরুঙ্গামারী) : এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী সাবেক সংসদ-সদস্য সাইফুর রহমান রানা, ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের পাঁচবারের সাবেক সংসদ-সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের হারিসুল বারী রনি ও গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের বিন ইয়ামিন মোল্লা।

এ আসনটি ছিল জাতীয় পার্টির দুর্গ। শুধু ২০১৮ সালের নির্বাচনে উন্মুক্ত নির্বাচনে নৌকা বিজয়ী হয়। ২০২৪-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে আবারও লাঙ্গল জয় পায়। এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৯৭৮ জন। হিন্দু ভোটার ৫০ হাজার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূল লড়াই ত্রিমুখী। লাঙ্গলের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের ভরসা আওয়ামী লীগ সমর্থক ও হিন্দু ভোটার। বিএনপির প্রার্থী সাইফুর রহমান রানার প্রধান বাধা দলীয় গ্রুপিং। অবশ্য নিকট অতীতের কয়েকটি নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে হেরেছেন। সে কারণে এবার স্বপ্ন দেখছেন বিজয়ের। তবে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম জোয়ার দেখছেন দাঁড়িপাল্লায়।

কুড়িগ্রাম-২ (কুড়িগ্রাম সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ী) : এ আসনে প্রার্থীরা হলেন-বিএনপির ধানের শীষের সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, ১১ দলীয় জোটের এনসিপির শাপলা কলি মার্কার ড. আতিকুর রহমান, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল মার্কার পনির উদ্দিন আহমেদ, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখার অধ্যক্ষ নুর বখত, নাগরিক ঐক্যের কেটলি মার্কার মেজর (অব.) মুহাম্মদ আবদুল সালাম, সিপিবির কাস্তে মার্কার নূর মোহাম্মদ, এবি পার্টির ঈগল মার্কায় নজরুল ইসলাম খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী হাঁস মার্কা নিয়ে ড. অ্যাডভোকেট সাফিউর রহমান। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ৪ হাজার ৭৩৮ জন। হিন্দু ভোটার প্রায় ৬০ হাজার।

এ আসনটি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহম্মদ এরশাদের সময় থেকে ছিল জাতীয় পার্টির দখলে। ২০০৯ সালে তিনি এ আসনটি ছেড়ে দিলে আওয়ামী লীগের জাফর আলী উন্মুক্ত নির্বাচনে জয় পান। পরে আসনটি আবারও জাতীয় পার্টির দখলে চলে যায়। ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন জাতীয় পার্টির শিল্পপতি পনির উদ্দিন আহমেদ। এবারও আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভেড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, জেলা শহরে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতারা পলাতক। রাজারহাট উপজেলায় হিন্দু ভোটার তুলনামূলক বেশি। তাদের ভোট পেতে এখানে কোমর বেঁধে মাঠে আছেন বিএনপির সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ। নিজের ইমেজকে কাজে লাগিয়ে হিন্দু কমিউনিটিতে জায়গা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কুড়িগ্রাম পৌরসভার ৮ জন কাউন্সিলর এবং কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যানকে দলে ভিড়িয়েছেন। তার আশা-এসব ভোট ধানের শীষে পড়বে।

এনসিপির প্রার্থী আতিকুর রহমান শাপলা কলি নিয়ে পথে প্রান্তরে ছুটছেন। তরুণ এ প্রার্থী দিন বদলের আওয়াজ তুলে যুব সমাজের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছেন। ফলে এ আসনে ধানের শীষ, শাপলা কলি আর লাঙ্গলের মধ্যে হবে ত্রিমুখী লড়াই।

কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর উপজেলা) : এ আসনে প্রার্থীরা হলেন-বিএনপির ধানের শীষের শিল্পপতি তাসভীর উল ইসলাম, ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লার ড. মাহবুবুল আলম সালেহী, জাতীয় পার্টির লাঙ্গলের আব্দুস সোবহান সরকার, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখার সাবেক সংসদ-সদস্য ডা. আক্কাছ আলী সরকার, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক মার্কার নুরে এরশাদ সিদ্দিকী ও স্বতন্ত্র হাঁস মার্কার ড. অ্যাডভোকোট সাফিউর রহমান। ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭০ জন। হিন্দু ভোটার প্রায় ৩৭ হাজার। দীর্ঘদিন এ আসনটি জাতীয় পার্টির দখলে থাকলেও ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ধানের শীষের শিল্পপতি তাসভীর উল ইসলাম হিন্দু কমিউনিটিতে জনপ্রিয়। এ কারণে তিনি কিছুটা নির্ভার। তবে আওয়ামী ও হিন্দু ভোটারদের দলে টানতে লাঙ্গলের আব্দুস সোবহান সরকারও কম চেষ্টা করছেন না। ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লার ড. মাহবুবুল আলম সালেহীও আছেন লড়াইয়ে।

কুড়িগ্রাম-৪ (চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর) : এ আসনে প্রার্থীরা হলেন-বিএনপির ধানের শীষে আজিজুর রহমান, ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লায় মোস্তাফিজুর রহমান, জাতীয় পার্টির লাঙ্গলে কেএম ফজলুল হক মণ্ডল, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখায় হাফিজুর রহমান, বাসদের (মার্কসবাদী) মইয়ে রাজু আহমেদ, স্বতন্ত্র বালতিতে মো. রুকুনুজ্জামান। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭৫৩ জন।

এ আসনে হিন্দু ভোটার প্রায় ৩০ হাজার। এ আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার দুই প্রার্থী আপন ভাই (সহোদর)। ব্রহ্মপুত্র নদ বিচ্ছিন্ন করেছে এলাকাগুলোকে, পাশাপাশি ভাটিয়া ও উজানি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে সামাজিক বিভাজন। ফলে ভোটের সমীকরণ জটিল। কুড়িগ্রাম জেলা দুপ্রকের সভাপতি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, বিগত নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় মানুষ ভোটের প্রতি আস্থা হারিয়েছে।

প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ ভোটার এখনো অনাগ্রহী। উন্নয়নবঞ্চিত এ অঞ্চলের মানুষ আশায় বুক বেঁধে বারবার হতাশই হয়েছে। ঘটেনি ভাগ্যের পরিবর্তন। এবার এমন প্রার্থী বা দলকে নির্বাচিত করতে চান যারা কথার ফুলঝুরি নয়-বাস্তব উন্নয়ন ঘটাবে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদে সেতু, রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জেলার ছোট-বড় ১৬ নদীর নাব্যতা ফেরানোর পাশাপাশি নদীভাঙন প্রতিরোধ। চারশ চরের কয়েক লাখ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি ও কাজের নিশ্চয়তা গুরুত্ব পাচ্ছে।

কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম দেবু বলেন, জেলায় ৪৬৯টি চর রয়েছে। এর মধ্যে ২৬৯টিতে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বসবাস করছে। এসব চরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ বলতে কার্যত কিছুই নেই। এর আগে রাজনৈতিক নেতারা যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় চরবাসী নেতাদের ওপর আস্থা হারিয়েছে। ফলে এবার মানুষের আগ্রহ খুবই কম।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সভাপতি খাইরুল আনম বলেন, ভোটারের পছন্দ ত্যাগী জনবান্ধব-যারা দীর্ঘদিন মানুষের অধিকার নিয়ে লড়াই করেছেন। কুড়িগ্রাম জেলা প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সভাপতি এ কে এম সামিউল হক নান্টু বলেন, ঘুস-দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে এবং এলাকার উন্নয়নে যারা কাজ করতে চান এমন প্রতিশ্রুতিশীল প্রার্থীকে ভোটাররা ভোট দেবে। এ জেলায় প্রায় ২ লাখ হিন্দু ভোটার আছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তারা ধানের শীষ ও লাঙ্গলমুখী।

চার আসনে পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন করেছেন ১৩ হাজার ৫০৯ জন। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম-১ আসেন ৩ হাজার ৭০৩ জন, ২-এ ৩ হাজার ৯২৩ জন, ৩-এ ২ হাজার ১০১ জন এবং ৪-এ ৩ হাজার ৭৮২ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ৭০৬টি।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews