এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
মীর আব্দুল আলীম: সুখের নাম রেমিট্যান্স, কষ্টের নাম প্রবাস জীবন। আমাদের সচল অর্থনীতির এই বাক্যের গভীরে লুকিয়ে আছে একেকজন রক্তমাংসের মানুষের আত্মত্যাগ, হাড়ভাঙা খাটুনি আর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস। যে ডলারের ঝনঝনানিতে আমরা উৎসব করি, তার প্রতিটি সেন্ট আসলে আমাদের ‘সোনার ছেলেদের’ অদেখা চোখের জলে ভেজা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখনই একটু মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, আমাদের নীতিনির্ধারকদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে তখন স্বস্তির সুবাতাস বয়। এই সুবাসটা রেমিট্যান্সের সুবাস। রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রে আর সংবাদপত্রের পাতায় ঢাকঢোল পিটিয়ে উৎসবের আমেজ ছড়ানো হয় তখন ‘রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা!’ কিন্তু এই উৎসবের আলোতে যে মানুষগুলোর বুকের ভেতর নিকষ কালো আঁধার জমে থাকে, তাদের খবর আমরা কজন রাখি? রাষ্ট্রও কি তাদের খবর রাখে? দূতাবাসগুলোর সহযোগিতা কতটা পায় প্রবাসীরা? এ প্রশ্নগুলো আমাদের সেই নির্মম ও রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় সবসময়।
চলতি মাসে লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পথে সম্প্রতি হিথ্রু বিমানবন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বিমানবন্দরে (শারজাহ) ট্রানজিটে নামি। এরপর যখন ঢাকাগামী বিমানে উঠলাম, তখন মনে হলো যেন এক টুকরো বাংলাদেশ আমার চারপাশে বসে আছে। অধিকাংশই ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক। কারও মুখে দীর্ঘদিন সন্তানকে না দেখার কষ্ট, কারও চোখে চাকরি হারানোর শঙ্কা, কারও কণ্ঠে বেতন আটকে থাকার অভিযোগ। কেউ বলছিলেন, ছয় বছর ধরে ছুটি পাননি; কেউ জানালেন, অসুস্থ হয়েও কাজ বন্ধ করার সুযোগ নেই। তাদের হাতে ছিল সস্তা ব্যাগ, মুখে ক্লান্তির রেখা, কিন্তু বুকভরা ছিল পরিবারের জন্য অদম্য ভালোবাসা। বিমানের কেবিনে বসে তাদের কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, এ যেন চলন্ত একটি বাংলাদেশ, যেখানে প্রত্যেকটি মুখই একটি অসমাপ্ত সংগ্রামের গল্প। তখন আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম, আমরা দেশে বসে যে রেমিট্যান্সের পরিসংখ্যান দেখি, তার প্রতিটি ডলারের পেছনে লুকিয়ে আছে একজন বাবার নিঃসঙ্গতা, একজন মায়ের অশ্রু, একজন সন্তানের অপূর্ণ শৈশব এবং একজন প্রবাসীর নিরবচ্ছিন্ন আত্মত্যাগ। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, রেমিট্যান্স শুধু অর্থনীতির ভাষা নয়; এটি হাজারো বাংলাদেশির নীরব কান্নায় লেখা এক অনন্ত মহাকাব্য।
দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের মহাসড়কের যত চটকদার গল্প, তার সিংহভাগের জোগানদাতা যে মানুষগুলো, আমরা কি কখনো তাদের চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করেছি? প্রবাসীদের হৃদয়স্পর্শী ঘটনাগুলো আসলে আমাদের সমাজের এক চরম সুবিধাবাদী ও অমানবিক রূপকে উন্মোচিত করে। সত্যিই তো ‘সুখের নাম রেমিট্যান্স: কষ্টের নাম প্রবাস জীবন’। যে ডলার আমাদের অর্থনীতিকে সচল রাখছে, তার প্রতিটি সেন্ট আসলে একেকটি দীর্ঘশ্বাস, হাড়ভাঙা খাটুনি আর বুকফাটা কান্নার বিনিময়ে অর্জিত।
রেমিট্যান্সের আড়ালে লুকিয়ে থাকে হাজারও কান্না। প্রবাসীদের অদেখা জীবন একটি পাসপোর্ট আর ধারদেনা করা কিছু টাকার ওপর ভর করে যখন একজন মানুষ দেশ ছাড়েন, তখন থেকেই শুরু হয় এক ট্র্যাজিক মহাকাব্য। আমরা দূর থেকে শুধু তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের হিসাব কষি, কিন্তু প্রবাসের সেই অদেখা জীবনের গভীর ক্ষতগুলো দেখার ফুরসত আমাদের নেই। রাষ্ট্রেরও কি তাতে দায় নেই? রেমিট্যান্সের প্রতিটি ডলারের পেছনে একটি কান্নার গল্প লুকিয়ে থাকে, যা ব্যাংকের লেজারে কিংবা জিডিপির খতিয়ানে কখনোই নথিভুক্ত হয় না। সোনার হরিণ ধরার আশায় প্রবাসে গিয়ে অনেককেই মুখোমুখি হতে হয় নির্মম বাস্তবতার। রেমিট্যান্স এবং প্রবাসের স্বপ্ন যেন প্রতিনিয়ত নির্যাতনের বাস্তবতায় পিষ্ট হয়। মরুর তপ্ত বালুঝড়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কিংবা কনকনে শীতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রমের পর যখন তারা ঘরে ফেরেন, তখন তাদের বিশ্রামের জায়গাটি হয় অত্যন্ত সংকীর্ণ, অস্বাস্থ্যকর। এক রুমে গাদাগাদি করে থাকা একদল ক্লান্ত মানুষের সেই দীর্ঘশ্বাস শোনার মতো কেউ থাকে না।
কী অবাক করা কথা- বৈদেশিক মুদ্রার মহানায়ক, অথচ নিজ ভূমিতেই অধিকারহীন! কাগজে-কলমে আমরা তাদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলি, রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে ‘সোনার ছেলে’ বলে স্তুতি গাই। কিন্তু দেশের বিমানবন্দরগুলোতে পা রাখা মাত্রই তাদের কপালে জোটে চূড়ান্ত অপমান। বিমানবন্দরে প্রবাসী শ্রমিকদের সাথে যে ধরনের অশোভন ও নিগ্রহমূলক আচরণ করা হয়, তা কেবল অমানবিকই নয়, চরম লজ্জাজনক। যে মানুষটি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, তাকেই পোহাতে হয় সবচেয়ে বেশি হয়রানি। অবশ্য সম্প্রতি এই দুর্ভোগ কিছুটা কমেছে। তবে লাগেজ খোয়া যাওয়া এবং লাগেজ থেকে মাল চুরি হওয়ার ঘটনা এখনো অহরহ ঘটছে। এখানেই বড় প্রশ্নটি চলে আসে প্রবাসীদের চোখের জল কি শুধু রেমিট্যান্স? তারা কি কেবলই আমাদের জন্য টাকা বানানোর যন্ত্র? বিমানবন্দরে তাদের সাথে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতো আচরণ করা হয়। রংচটা পোশাকে নাক ছিটকানো হয় বিমানের ভেতরে বিমানবালাদেরও কটাক্ষ চোখে পড়ে।
বিদেশে কোনো বিপদে পড়লে দূতাবাসগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পান না প্রবাসীরা। আইনি সুরক্ষার অভাব রয়েছে। দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষের বিচার পাওয়ার পথ এ দেশে অত্যন্ত সংকীর্ণ।
পবিত্র ভূমিতে অপবিত্র আচরণ প্রবাসীদের বেদনাময় কারণ হয় প্রায়ই। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আমাদের প্রবাসীদের, বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীদের যে করুণ অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দিতে বাধ্য। আমরা যে ভূমিগুলোকে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখি, সেখানে আমাদের বোনেদের ওপর চলা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন যেন এক নিত্যদিনের চিত্র। স্বপ্নের সন্ধানে গিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে কিংবা সম্ভ্রম হারিয়ে যখন কোনো নারী দেশে ফেরেন, তখন সমাজ তাকে বুক বাড়িয়ে আগলে নেওয়ার বদলে উল্টো আঙুল তোলে। এই নির্মমতার শেষ কোথায়?
প্রবাসীরা শুধু নির্যাতনের শিকার হয় না, দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করে কখনো লাশ হয়ে দেশে ফিরে। একটি কফিন যখন উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড থেকে নেমে ঢাকার রানওয়ে স্পর্শ করে, তখন কেবল একটি মরদেহ নামে না; ঝরে পড়ে একটি পুরো পরিবারের বাঁচার স্বপ্ন। বিমানযাত্রার সময় প্রবাসীদের চোখে যে ভয়, সংশয়, আর ফেলে আসা স্বজনদের প্রতি আকুলতা দেখা যায়, তা কোনো গল্প-উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। প্রবাসের অশ্রু আসলে আমাদের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির নেপথ্যের কারিগরদের এক অলিখিত, উপেক্ষিত উপাখ্যান। আমরা তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দিয়ে দেশের বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করি, আমলা-কামলাদের বেতন বাড়াই, বিলাসী প্রকল্প সাজাই। কিন্তু যখনই তাদের সামাজিক নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা কিংবা বিমানবন্দরে একটু সম্মানের কথা ওঠে, তখনই আমাদের নীতিনির্ধারকেরা বোবা-কালা হয়ে যান।
প্রশ্ন হলো আমাদের নীরবতা ভাঙবে কবে? প্রতিটি ঘটনা আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে চাবুক মারে। রেমিট্যান্সের আড়ালে কান্না: প্রবাসীদের অদেখা জীবন, আমাদের নীরবতা- এই নীরবতা আসলে এক প্রকার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অপরাধ। আমরা প্রবাসীদের ডলার-রিয়ালকে ভালোবেসেছি, কিন্তু মানুষগুলোকে ভালোবাসতে পারিনি। আর কতকাল আমরা এই নির্মমতা দেখেও না দেখার ভান করব? প্রবাসীদের বুকের ভেতরের হাহাকারকে স্রেফ ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটের সংখ্যা বানিয়ে দেখার এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া দরকার। তারা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, তাদের কেবল করুণা নয়, পাওনা মর্যাদা ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের রাষ্ট্রীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের এই আত্মঘাতী নীরবতা এবার ভাঙুক। প্রবাসীদের চোখের জল কেবল রেমিট্যান্সের অঙ্কে মাপা বন্ধ হোক; তাদের মর্যাদা ও সুরক্ষাই হোক আমাদের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)