২৬ মার্চ ১৯৭১—এই দিনটি কোনো আকস্মিক ঘটনার ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ এবং সাংস্কৃতিক দমন-পীড়নের এক নির্মম পরিণতি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৪৭ সালে হলেও পূর্ববাংলা (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান) তার কাঙ্ক্ষিত অধিকার কখনোই পায়নি। রাষ্ট্রের দুই অংশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব যেমন ছিল, তার চেয়েও বড় ছিল বৈষম্যের ব্যবধান। জাতীয় বাজেট বণ্টন, শিল্পায়ন, চাকরির সুযোগ, এমনকি সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো—সবখানেই পূর্ববাংলার মানুষ ছিল অবহেলিত।
এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিরোধ গড়ে ওঠে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ কেবল ভাষার অধিকারই নিশ্চিত করেনি, বরং বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার ভিতও মজবুত করেছে। এরপর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একচেটিয়া নীতির বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে থাকে বাঙালির প্রতিরোধ। রাজনৈতিকভাবে এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনমানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল এই দীর্ঘ আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। সেই ভাষণ ছিল একদিকে অসহযোগ আন্দোলনের দিকনির্দেশনা, অন্যদিকে আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা।
অবশেষে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে যে গণহত্যা শুরু করে, তার মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। নিরস্ত্র বাঙালির ওপর এই নৃশংস আক্রমণ বিশ্ববিবেককে নাড়া দিলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। এখানেই এসে উপস্থিত হন মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার এবং প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন।
কিসিঞ্জার তখন নিক্সনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা, কার্যত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রধান স্থপতি। ঢাকায় গণহত্যার খবর তাঁর অজানা ছিল না। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড একটি টেলিগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর ‘ভীতির রাজত্ব’-এর কথা উল্লেখ করে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেন। এই বার্তাটি ইতিহাসে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত। একই সময় দিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিংও ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ বলে পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। কিন্তু এসব সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে কিসিঞ্জার পাকিস্তানের পক্ষেই অবস্থান নেন।
নিক্সনের কাছে পাঠানো এক মেমোতে কিসিঞ্জার স্পষ্টভাবে পরামর্শ দেন—পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষার স্বার্থে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পাশে থাকা উচিত। বাস্তবে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান আগেই নির্ধারিত ছিল। ১৯৭০ সালের অক্টোবরে হোয়াইট হাউসে ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠকে নিক্সন তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পাশে থাকবে। এই প্রতিশ্রুতি শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য ছিল না; এর পেছনে ছিল বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাব।
সে সময় যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য মরিয়া ছিল, এবং পাকিস্তান ছিল সেই যোগাযোগের মধ্যস্থতাকারী। কিসিঞ্জার তাঁর স্মৃতিকথায় দাবি করেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের একমাত্র পথ ছিল পাকিস্তান। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়, রোমানিয়া, ইরান এবং পোল্যান্ডের মাধ্যমেও এই যোগাযোগ সম্ভব ছিল। তবুও কিসিঞ্জার পাকিস্তানকেই অগ্রাধিকার দেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যার প্রশ্নে নীরব থাকেন।
এমনকি তিনি ভারতের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগও তোলেন যে, ভারত পূর্ব পাকিস্তান দখল করতে চায় এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে উসকানি দিচ্ছে। অথচ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কোনো প্রতিবেদনেই এমন তথ্য ছিল না। এসব ছিল কিসিঞ্জারের কূটনৈতিক কৌশল—যার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে রক্ষা করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখা।
অন্যদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয়টি তুলে ধরতে তিনি বিশ্বভ্রমণ করেন। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে তিনি নিক্সনের অবহেলা ও অপমান সহ্য করেও স্পষ্ট ভাষায় জানান, নৃশংসতার বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান আপসহীন। তাঁর এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী যখন কোণঠাসা, তখন যুক্তরাষ্ট্র শেষ চেষ্টা হিসেবে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠায়। এর উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে চাপ দেওয়া এবং যুদ্ধের গতিপথ বদলানো। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টা উপস্থিতি এবং মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রার ফলে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে, এবং জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার পরও কিসিঞ্জার তাঁর অবস্থানকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, পাকিস্তানকে রক্ষা করা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রয়োজন। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেছে—একজন এমন কূটনীতিক হিসেবে, যিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের চেয়েও ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস, যে দেশটির বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, গণহত্যাকে সমর্থন যুগিয়েছিল, সেই দেশটিই এখন আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে তেল কিনবে, সেটা নির্ধারণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন চাইতে হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নতুন করে সেই পুরোনো প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে—আমাদের মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত? সাদা চোখে দেখলে এটি একটি বাণিজ্যিক চুক্তি, যার মাধ্যমে কিছু শুল্ক-সুবিধা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহুমাত্রিক কৌশলগত ও রাজনৈতিক শর্ত, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে।
চুক্তিটির সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকগুলোর একটি হলো এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ধরনের বাধ্যতামূলক আমদানি নির্ভর কাঠামোর মধ্যে ঠেলে দেওয়া। প্রতি বছর প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা—যার প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট নয়—দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে এবং স্থানীয় কৃষকদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে। একইভাবে বাস্তব চাহিদা ও রুট সক্ষমতার সঙ্গে অসামঞ্জস্য থাকা সত্ত্বেও ২৫টি বোয়িং বিমান কেনার সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক বিনিয়োগের ঝুঁকি তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা, যা প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহের বৈচিত্র্য সীমিত করবে। অন্যদিকে ৪,৪০০-এর বেশি মার্কিন পণ্যে শুল্ক কমানো বা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার ফলে দেশীয় শিল্প, বিশেষ করে নবীন ও সুরক্ষাপ্রাপ্ত খাতগুলো, অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, এই চুক্তির কৌশলগত ও নীতিগত শর্তগুলো বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। পারমাণবিক জ্বালানি, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে চীন বা রাশিয়া-এর মতো বিকল্প অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত হয়ে যেতে পারে। একইভাবে “নন-মার্কেট অর্থনীতি” দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে বাধা, ডিজিটাল ডেটা প্রবাহে নিয়ন্ত্রণহীনতা, এবং যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ড অনুসরণের বাধ্যবাধকতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত করতে পারে। এর পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকি কমানোর চাপ দেশীয় শিল্পের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে এই চুক্তি শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা ও শুল্ক হ্রাসের বিষয় নয়; এটি একটি বিস্তৃত কৌশলগত কাঠামো, যা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করতে পারে। স্বল্পমেয়াদে কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য অনেক বেশি হতে পারে—বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি তার উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে কৌশলগত স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করছে? ইতিহাসের আলোকে এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ, যে জাতি একসময় বৈষম্য ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেই জাতির জন্য যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রেই সর্বাগ্রে বিবেচ্য হওয়া উচিত—সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকছে কি না।
এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার উদাহরণ উল্লেখযোগ্য। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনুরূপ বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তাদের অবস্থান দেখায়, বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব—যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কৌশলগত দূরদৃষ্টি থাকে।
বাংলাদেশের জন্যও এই মুহূর্তে প্রয়োজন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া। ১৯৭১ সালে যে জাতি রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেই জাতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই স্বাধীনতার চেতনাকে অক্ষুণ্ণ রাখা। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে না হয়।
একাত্তরের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—স্বাধীনতা কেবল অর্জনের বিষয় নয়, এটি রক্ষারও বিষয়। আর সেই দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের ওপরই বর্তায়।
এইচআর/এমএস