বাংলাদেশী কূটনীতিকরা উল্লেখ করেছেন যে, ঢাকা অবৈধ অভিবাসন নিয়ে কম বাগাড়ম্বর এবং ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের মতো বিষয়গুলোতে আরো বেশি মনোযোগ আশা করেছিল। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের একটি প্রভাবশালী অংশ মনে করে যে, নতুন সরকারের প্রতি সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ভারতের নেয়া কিছু প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ প্রত্যাহার করা উচিত ছিল।
বাংলাদেশে তারেক রহমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর একশ দিনেরও বেশি সময় কেটে গেছে। তবে, তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রাথমিক প্রত্যাশার বিপরীতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অন্তর্বর্তী সরকারের কঠিন মাসগুলোর মতোই কমবেশি একই রকম রয়ে গেছে। কথার ফুলঝুরি নয়, কাজে প্রমাণ। জনাব রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ভারত দুইবার বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ করেছিল। প্রথমবার যোগাযোগ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, যিনি জনাব রহমানের মা, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে গত বছর ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা সফর করেন। দ্বিতীয়বার যোগাযোগ করেন পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিসরি, যিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণপত্র বহন করে নিয়ে যান এবং লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা, যিনি ১৭ ফেব্রুয়ারি জনাব রহমানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সূত্র মতে, এই ধরনের সৌজন্যমূলক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। বিএনপির একটি প্রভাবশালী অংশ মনে করে যে, নতুন সরকারের প্রতি সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে ভারতের উচিত ছিল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেয়া কিছু প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ প্রত্যাহার করা। এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল বাংলাদেশ থেকে পণ্য স্থানান্তর আবার চালু করা, ব্যবসায়িক ও চিকিৎসা ভিসাসহ ভিসা পরিষেবা সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করা এবং বাংলাদেশী পণ্যের জন্য বাজারে প্রবেশাধিকারের ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেয়া। ঢাকার ভাষ্যমতে, এ পর্যন্ত এই পদক্ষেপগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের যুক্তি হলো, এই সিদ্ধান্তগুলো প্রত্যাহার না করে ভারত জনাব রহমানকে কোনো অগ্রিম প্রণোদনা দেয়নি, যাকে ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে জামায়াতে ইসলামী এবং বেশ কয়েকটি ভারত-বিরোধী ছাত্রসংগঠনের সাথে আলোচনা করতে হবে।
অন্যদিকে, বিএনপির প্রবীণ নেতারা এই অবস্থানের জনসমর্থন বাড়িয়ে সম্পর্ক মসৃণ করার চেষ্টা করেছেন যে, ভারতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতি সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করবে না; যা অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া কঠোর অবস্থান থেকে একটি পরিবর্তন। এ ক্ষেত্রেও, ঢাকা মনে করে যে এই ধরনের প্রচেষ্টা ভারতীয় পক্ষের কাছ থেকে কোনো স্বীকৃতি পায়নি।
এর প্রমাণ হিসেবে তারা পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ভারতীয় জনতা পার্টির বিজয়ের পর দিল্লি থেকে আসা সরকারি যোগাযোগে ‘অবৈধ অভিবাসন’ শব্দটির আগ্রাসী ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। বাংলাদেশী কূটনীতিকরা উল্লেখ করেছেন যে, ঢাকা অবৈধ অভিবাসনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কম বাগাড়ম্বর এবং ভিসা পুনরুদ্ধার ও ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের মতো বিষয়গুলোতে আরো বেশি মনোযোগ আশা করেছিল।
পরিস্থিতি যাচাই করার জন্য ঢাকা গত ৭-৮ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে একটি সংক্ষিপ্ত সফরে দিল্লি পাঠিয়েছিল, যেখানে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং এস জয়শঙ্করের সাথে দেখা করেন। তবে, বাংলাদেশ-সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণা এবং নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একের পর এক সাক্ষাৎকার এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সত্ত্বেও তারেক রহমানের বিএনপি ভারতকে প্রভাবিত করতে পারেনি। যদিও ঢাকার একজন ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক বলেছেন যে, বাংলাদেশকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল যে রাজ্য নির্বাচনকে ঘিরে ব্যবহৃত ভাষা নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতিকে প্রতিফলিত করবে না, অবৈধ অভিবাসন বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কঠোর অবস্থান ঢাকার সচিবালয়ে ‘বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি’ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, জনাব রহমান বুঝতে পারছেন যে ভারতের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সুযোগ প্রত্যাশা অনুযায়ী তৈরি হচ্ছে না। তাই তিনি জুনের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে বিবেচনা করছেন।
বাংলাদেশের উভয়সঙ্কট
চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া অবশ্য এই সত্যকে আড়াল করতে পারে না যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মেরামতের দায়িত্ব ভারতের মতোই বাংলাদেশেরও। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের কারণে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে আছে, অথচ ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পক্ষের সাথে সম্পর্ক সমৃদ্ধ হয়েছে। অধিকন্তু, একটি বাস্তবসম্মত মূল্যায়নে দেখা যায় যে, প্রধান নদী পদ্মা (গঙ্গা) নিয়ে ভারতের কাছ থেকে স্থিতিশীল আশ্বাস ছাড়া ২০২৬ সালের পর বাংলাদেশের অন্যান্য পরিকল্পনা মসৃণভাবে এগোবে বলে আশা করা যায় না। নদীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেছেন যে, ৩০ বছরের পুরনো গঙ্গা চুক্তি নবায়নে বিলম্ব গঙ্গা-কোবাদাক সেচ প্রকল্পকে একটি কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলবে, যা পশ্চিম ও মধ্য বাংলাদেশের বিশাল অংশকে প্রভাবিত করবে। পানির এই অনিশ্চিত সরবরাহ আসন্ন বপন মৌসুমকে প্রভাবিত করবে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরো ক্ষতিগ্রস্ত করবে; এই অর্থনীতি ইতোমধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সঙ্কটের মারাত্মক প্রভাব মোকাবেলা করছে।
এসব বিঘœ সৃষ্টিকারী শক্তির সম্মিলিত প্রভাব তারেক রহমান সরকারের ওপর চাপ আরো বাড়াবে, এই সরকার দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় অদক্ষতার জন্য ইতোমধ্যেই সমালোচিত হচ্ছে, যে প্রাদুর্ভাবে অন্তত ৬০০ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। সমালোচকরা স্বাস্থ্যসঙ্কট মোকাবেলায় দুর্বলতার পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান যৌন সহিংসতার ঘটনার জন্যও সরকারকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যা দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতির একটি লক্ষণ; যে দেশটি আগস্ট ২০২৪-এর বিক্ষোভের পর থেকে এখনো পুনরুদ্ধারে ফিরতে পারেনি। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগসহ প্রতিদ্বন্দ্বীরা, যারা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মাঠে সংগঠিত হচ্ছে, তারা আরো শক্তিশালী হবে যদি জনাব রহমান ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৬-এর সময়সীমার আগে দিল্লির সাথে গঙ্গা নদী চুক্তি নবায়ন করতে ব্যর্থ হন। মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব পরিস্থিতি উভয় রাজধানীতেই বাস্তববাদী হওয়ার আহ্বান জানায়, কারণ এই চ্যালেঞ্জগুলো শিগগিরই বাংলাদেশকে মোকাবেলা করতে হবে এবং তা না হলে দেশটিকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা ভারতের তাৎক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো স্বার্থেরই পরিপন্থী।