বাংলাদেশে সংবাদপত্রের ইতিহাসে উত্থানপতনের ঘটনার মুখোমুখি হয়নি, এমন একটি দৈনিক সংবাদপত্রও নেই। পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালি মুসলমানদের জনমতকে শানিত করতে ভূমিকা পালন করা একমাত্র বাংলা দৈনিক, পাঠক একসময় উন্মুখ হয়ে থাকত যে সংবাদপত্রটির জন্য সেটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্ম নামও জানে না সে দৈনিকের। একইভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের সোপান গড়তে ভূমিকা রেখেছিল যে দৈনিকগুলো, সেগুলোর আগের জনপ্রিয়তা এখন আর নেই। দেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বহু সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে, বন্ধও হয়ে গেছে অনেকগুলো দৈনিক। নব্বই দশকে দেশে সম্ভবত সবচেয়ে অধিকসংখ্যক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে এবং সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি পাঠকের মাঝে স্থান করে নিতে সক্ষম হলেও বাকিগুলো নিভু নিভু প্রদীপের মতো কোনোমতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। একই সময়ে এসেছিল বেশ কিছু বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল। টেলিভিশন যখন বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায়, বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সংবাদপত্রের সার্কুলেশনে রীতিমতো ধস নামে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও বিরাট ঝুঁকি নিয়ে ১৬ বছর আগে ‘আমরা জনগণের পক্ষে’ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রায় ঝড়ের মতো বাজারে আসে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’। সূচনায় এর বিনিময়মূল্য ছিল নামমাত্র। মাত্র ২ টাকা। ওই সময়ের ঢাকার দৈনিকগুলোর গড় মূল্যের অর্ধেকেরও কম। কারও কাছে বিশ্বাসযোগ্য ছিল না যে সবকিছুর মূল্যের ঊর্ধ্বগতির মাঝে এত কম মূল্যে কোনো দৈনিক সংবাদপত্রের নিয়মিত প্রকাশ হওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ প্রতিদিন সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে তুলেছিল। দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল এর সার্কুলেশন। পাঠকপ্রিয়তা বেড়ে চলেছিল প্রতিদিন।

মগবাজার রেলক্রসিংয়ের প্রায় পাশ ঘেঁষে দৈনিকটির স্বল্পপরিসরের অফিস। কলেবর সংক্ষিপ্ত। কিন্তু কর্মযজ্ঞ ছিল বিশাল। প্রকাশিত হওয়ার দিন থেকে বাংলাদেশ প্রতিদিন দেশে সংবাদপত্রের বাজার দখল করে নিয়েছিল। পথচারী, বাস-ট্রেন-লঞ্চের যাত্রী, কাঁচাবাজারের দোকানির হাতে হাতে দেখা যেত পত্রিকাটি। সংবাদপত্রের টিকে থাকার সামগ্রিক সংগ্রাম ও দুর্দশার মধ্যে বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৬ বছর আগের জনপ্রিয়তা এখনো ধরে রেখে সংবাদপত্রজগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মালিক থেকে পাঠক পর্যন্ত সবাইকে বিস্মিত করেছে। সম্ভবত বাংলাদেশে আর কোনো দৈনিক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে পরিবেশনার মান ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেনি, যা পেরেছে বাংলাদেশ প্রতিদিন। গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে অনেক রাজনৈতিক উত্থানপতন ঘটেছে। যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেল ও দৈনিক সংবাদপত্র তাদের নীতিগত অবস্থানও সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে নতুন সরকার ও সরকারি দলের রোষ থেকে গা বাঁচানোর জন্য। এর ফলে সংবাদপত্রের ওপর থেকে পাঠকের আস্থা কমে যায়, সাংবাদিকদের ওপর বিশ্বাস হারায় অথবা তারা বিভ্রান্ত হয়। বাংলাদেশ প্রতিদিন আমরা জনগণের পক্ষে প্রতিপাদ্যের ওপর অবিচল থাকায় পাঠকরা দৈনিকটির ওপর আস্থা হারায়নি। এটাই বাংলাদেশ প্রতিদিনের ফেলে আসা ১৬ বছরের অর্জন।

আজ ১৫ মার্চ, ২০২৬। বাংলাদেশ প্রতিদিনের ১৭ বর্ষে পদার্পণের দিন। দৈনিকটির জন্য এদিনটি নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার এক উপলক্ষ। গত মাসেই দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রথমবারের মতো সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করে প্রথমবার সংসদ নির্বাচনে বিজয় অর্জনের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি তাঁর পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম দৃষ্টান্ত। ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে। সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদ স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন না করা পর্যন্ত পূর্ববর্তী জাতীয় সংসদের স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকারের সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা। কিন্তু জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী অজ্ঞাতবাস থেকে তাঁর পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু হত্যা মামলায় কারাগারে।

এ পরিস্থিতিতে সংসদ অধিবেশন শুরু হয় ৫৩ বছর আগে ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদে স্থাপিত এক দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে, যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাবে স্পিকারবিহীন প্রথম অধিবেশনে একজন প্রবীণ সংসদ সদস্য মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সভাপতিত্ব করেন এবং তাঁর সভাপতিত্বেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান, সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তাঁর সভাপতিত্বে সংসদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হলে প্রস্তাব ও সমর্থনের ভিত্তিতে সর্বসম্মতিক্রমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। ইতিহাসে সব সময় এমন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে না। এ ধরনের ঘটনা সংবাদপত্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, যখন প্রতিটি সংবাদকর্মীকে চোখ কান খোলা রেখে তাদের পেশাদারির পরিচয় দিতে হয়।

দেশ ও জাতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনাগুলোর বাইরে বিশ্বকাঁপানো ঘটনা শুরু হয়েছে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ভয়াবহ বিমান হামলা এবং পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও দূতাবাসের ওপর ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলাকে কেন্দ্র করে। যুদ্ধ এখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সামরিক অবস্থান ছাড়াও তেল শোধনাগার, পানি শোধনাগারসহ বেসামরিক স্থাপনা ও আবাসিক এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে জানমালের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের রূপ ধারণ করেছে। বিশ্ববাসী চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাচ্ছে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত।

চীন, ভারত, ইউরোপ, আমেরিকাসহ আরও অনেক দেশে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রধান সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ যদি প্রলম্বিত হয়, তাহলে সমগ্র বিশ্ব চরম অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে পড়বে এবং যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশে বিশ্ব পরিস্থিতির আঁচ লাগবে না, তা ধারণা করা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে উঠলে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং রেমিট্যান্স আয়ে ঘাটতি দেখা দেবে। সামগ্রিক পরিস্থিতির আলোকে বাংলাদেশ প্রতিদিনের ১৭ বছরে পদার্পণ বাংলাদেশ ও বিশ্ব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দৈনিকটির ওপর আরও বেশি দায়িত্ব বর্তাবে অধিকতর সতর্কতার সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ ও অনুপ্রেরণামূলক তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠকদের সঙ্গে যুক্ত থাকার। দেড় দশকের বেশি সময় যাবৎ বাংলাদেশ প্রতিদিন যে সত্যকে ধারণ করে এসেছে, তা জনগণের মাঝে তুলে ধরে এই ক্রান্তিকালে তাদের সাহস জোগানোর ভূমিকা পালন করবে।  প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের পাশাপাশি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে দৈনিকটির ‘আমরা জনগণের পক্ষে’ প্রতিপাদ্য, যাতে তাদের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা ও আস্থা অটুট থাকে এবং তারা যাতে এর মাঝে নিজেদের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়।

বাংলাদেশ প্রতিদিন সামনের পানে তাকিয়ে ১৬ বছর পাড়ি দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের পাশাপাশি টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য সংবাদপত্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হয়েছে। কিন্তু তারা তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি যে সততার সঙ্গে ও বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠকের হৃদয়ে থাকতে হবে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের ১৭ বছরে পদার্পণ কেবল পেছনে ফেলে আসা দিনের সাফল্যগাথা স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যতের জন্য প্রতিশ্রুতি উচ্চারণের মুহূর্ত হোক যে স্বাতন্ত্র্য, সৃজনশীলতার সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং সাংবাদিকতার মান বজায় রাখার জন্য নিবেদিত থাকবে, যা আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। শুভ হোক বাংলাদেশ প্রতিদিনের ১৭ বছরে পদার্পণ।





লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews