ফার্মেসিতে মোট অ্যান্টিবায়োটিকের অর্ধেকই বিক্রি হয় চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া। ফলে কমে আসছে জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর ওষুধ। এখনই অপারেশনের রোগীদের সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ করছে না, ব্যবহার করতে হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক, তাও পরিমাণে আগের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের নির্দেশনা ছিল কোনো অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি করা যাবে না। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট (ব্যাকটিরিয়ার বিরুদ্ধে অকার্যকর) হয়ে যাওয়ার জন্য অন্য কিছু কারণের সাথে প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রিকেও দায়ী করা হচ্ছে। নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক কিনলে ওষুধটির কোর্স শেষ করেন না বেশির ভাগ ব্যবহারকারী। এ ব্যাপারে বিখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ‘লেনসেট’-এ প্রেসক্রিপশনবিহীন অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিয়ে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘যেসব দেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বেশি বিক্রি হয়, সেসব দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও রেজিস্ট্যান্টের হার তুলনামূলক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি সম্বন্ধে বলেছে, ‘প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি ও নিজের ইচ্ছায় ব্যবহার কমাতে না পারলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট কমানো সম্ভব নয়।’
চিকিৎসকরা বলছেন, জীবাণু সংক্রমণ থেকে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে অ্যান্টিবায়োটিক। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ওষুধ কোম্পানি অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন করে। কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা বিক্রেতাকে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার শিখিয়ে ওষুধটির বেশি বিক্রি নিশ্চিত করে। এভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রি বেড়েছে ঠিকই; কিন্তু এই ওষুধের বিক্রেতাদের ৯৯ শতাংশই তৃতীয় ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট হওয়ায় তারা ওষুধটির সঠিক ব্যবহার জানেন না। তারা শুধু বেশি মুনাফার স্বার্থে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করছেন। এভাবে অ্যান্টিবায়োটিককে রেজিস্ট্যান্ট হতে সহায়তা করে মানুষের জীবনকে বিপদাপন্ন করে তুলছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, জীবনরক্ষাকারী এই ওষুধগুলোর বেশির ভাগেরই এখন ব্যাকটিরিয়ার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে গেছে। আগে যে অ্যান্টিবায়োটিক পাঁচ দিনের অথবা সাত দিনের ডোজ সম্পন্ন করলে রোগ ভালো হয়ে যেত, এখন সেটি আর পাঁচ অথবা সাত দিনে সুস্থ হচ্ছে না। এখন পরিমাণে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হচ্ছে এবং বেশিদিন সেবন করতে হচ্ছে। এ মতামত দিয়েছেন বিশিষ্ট জেনারেল সার্জন অধ্যাপক ডা: মো: আব্দুল ওহাব।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ইউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাওয়ায় ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন নানা রোগে অ্যান্টিবায়োটিক আগের মতো কাজ করছে না।
বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা: মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক আগের মতো কাজ করছে না। ফলে টাইফয়েডের মতো রোগ সারাতে অনেক বেশি পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হচ্ছে। যক্ষ্মা রোগ তো সুপার পাউয়ারফুল হয়ে গেছে। অন্য দিকে সাধারণ ডায়েরিয়া, আমাশয় রোগকে আগের মতো কম অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করে সুস্থ করে তোলা যাচ্ছে না।
প্রেসক্রিপশন ছাড়াই কিনতে পাওয়া যায় বলে শুধু বিক্রির জন্য ভাইরাল জ্বর হলেও হাতুড়ে ডাক্তাররা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দিচ্ছে রোগীদের। যেখানে শুধু সাধারণ প্যারাসিটামলে সুস্থ করে তোলা সম্ভব সেখানে কমপক্ষে একটি ওষুধ অ্যান্টিবায়োটিক থাকছে।
অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার মফস্বল শহর ও গ্রামাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। গ্রামের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল না হওয়ায় অসুখ হলে তারা স্থানীয় ওষুধ বিক্রেতার ওপরই বেশি নির্ভর করছে। ওষুধ বিক্রেতাই তাদের কাছে ‘ডাক্তার’। গ্রামের ওষুধ বিক্রেতারা তৃতীয় ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্টও না। ওষুধ সম্বন্ধে তাদের কোনো বেসিক ট্রেনিংও নেই। অন্য কোনো ওষুধের দোকানে কিছুদিন কাজ করার অভিজ্ঞতাই তাদের ভরসা। আর তাদের অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার শিখিয়ে ওষুধ বিক্রি করে থাকে কোম্পানির প্রতিনিধিরা। এ ব্যাপারে ডা: মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে বাংলাদেশে আইন থাকলেও তার কঠোর প্রয়োগ না থাকায় জীবনরক্ষাকারী এই ওষুধটি অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। একটা সময় আসবে, জীবাণু সংক্রমণে অথবা অপারেশন করার পর মানুষকে সুস্থ করার জন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই পাওয়া যাবে না। কারণ পুরনো ও বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে এমন অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট (প্রতিরোধী) অর্থাৎ অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারও হচ্ছে না।