ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের স্থবির কূটনৈতিক সম্পর্ক আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে উভয় দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে কিছু মন্তব্য এবং সীমিত পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বৈঠককে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সংলাপ পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ফিরে যাওয়া এখনও জটিল ও অনিশ্চিত।

চলতি মাসের শুরুতে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন ক্ষমতাসীন বিজেপির আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভারতের উচিত পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপের পথ খোলা রাখা।

তিনি বলেন, “দরজা বন্ধ করা উচিত নয়। আমাদের সবসময় সংলাপের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।”

তার এই মন্তব্য ভারতের রাজনৈতিক মহলে তাৎক্ষণিক বিতর্ক সৃষ্টি করে। বিরোধী দলগুলো এটিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করে।

ভারত সরকার এবং মোদি প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে বলছে, “সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না”- যার ভিত্তিতে পাকিস্তানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বিরতি দেওয়া হয়েছে। ভারত অভিযোগ করে আসছে, পাকিস্তান কাশ্মীর ও ভারতের বিভিন্ন শহরে হামলাকারী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করে।

অন্যদিকে পাকিস্তান হোসাবলের মন্তব্যকে স্বাগত জানায়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, ইসলামাবাদ দেখতে চায় ভারত থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসে কি না।

হোসাবলের পর ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ নারাভানে-ও সংলাপের পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, সাধারণ জনগণের রাজনীতির বাইরে সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক উন্নত করতে সহায়তা করে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কাঠামোতে আরএসএস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যদিও এটি সরাসরি সরকারে নেই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ অনেক শীর্ষ বিজেপি নেতা অতীতে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইরফান নুরউদ্দিন বলেন, রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকি এড়াতেই আরএসএস ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সংলাপের ইঙ্গিত আসছে।

তার মতে, সরাসরি সরকার উদ্যোগ নিলে তা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। তাই বিকল্প কণ্ঠের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে, যাতে সরকার পরবর্তীতে সেটিকে ‘সমাজের চাপের প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে দেখাতে পারে।

পর্দার আড়ালে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ

বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রকাশ্য বক্তব্যের পাশাপাশি পর্দার আড়ালেও সীমিত পর্যায়ে যোগাযোগ চলছে।

পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক জওহার সেলিম  কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, গত এক বছরে উভয় দেশের সাবেক কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল, গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং সংসদ সদস্যদের নিয়ে অন্তত চারটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে ওমানের মাস্কাট, কাতারের দোহা, থাইল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডনে।

তিনি জানান, এসব বৈঠক ট্র্যাক-২ এবং ট্র্যাক-১.৫ পর্যায়ের—যেখানে অবসরপ্রাপ্ত ও কিছু ক্ষেত্রে বর্তমান কর্মকর্তারাও অংশ নেন।

ট্র্যাক-২ আলোচনায় সাধারণত সাবেক সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিরা অংশ নেন, আর ট্র্যাক-১.৫ আলোচনায় বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মিশ্র অংশগ্রহণ থাকে। এসব উদ্যোগকে মূলত আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরে আস্থা তৈরির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হয়।

পাকিস্তানের সাবেক মেজর জেনারেল ও সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক রশিদ খান বলেন, এসব আলোচনা আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বিকল্প নয়, বরং একটি ‘নিরাপত্তা ভালভ’ হিসেবে কাজ করে। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব বৈঠক সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, “আমি যদি এ বিষয়ে মন্তব্য করি, তাহলে আর ব্যাকচ্যানেল থাকবে না।”

পরিবর্তিত আঞ্চলিক সমীকরণ

২০২৫ সালের মে মাসের যুদ্ধবিরতির পর আঞ্চলিক সমীকরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক অবস্থান কিছুটা পুনর্গঠিত হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন বলে দাবি করা হয়।

এছাড়া ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘদিন পর সরাসরি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ হয়, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পাকিস্তানের নেতৃত্বের ভূমিকার প্রশংসা করেন।

অন্যদিকে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক শুল্কনীতি ও অভিবাসন ইস্যুতে কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে, যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারতের প্রভাবকে কিছুটা সীমিত করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নুরউদ্দিন বলেন, “ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান আগের মতো শক্তিশালী নেই, অন্যদিকে পাকিস্তান আবার যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি ফিরে এসেছে।”

তবে সাবেক পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা তারিক রশিদ খান সতর্ক করে বলেন, এই সংকেতগুলোকে অতিরিক্তভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। তার মতে, এটি মূলত বাস্তববাদী কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন, আকস্মিক সমঝোতা নয়।

উত্তেজনা এখনও তীব্র

সম্ভাব্য সংলাপের ইঙ্গিতের মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

গত ১৬ মে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তান যদি ‘সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করে’, তবে তারা ‘ভূগোলের অংশ থাকবে নাকি ইতিহাসে পরিণত হবে’ তা নির্ধারণ করতে হবে।

এর একদিনের মধ্যেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর জনসংযোগ শাখা আইএসপিআর এই মন্তব্যকে ‘অহংকারী ও উসকানিমূলক’ বলে অভিহিত করে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা সতর্ক করে বলে, পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীকে এ ধরনের হুমকি ‘গুরুতর পরিণতি’ ডেকে আনতে পারে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দুই দেশের অবস্থান বিপরীতমুখী হয়েছে। হেগের একটি আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত সিন্ধু নদীর পানি বণ্টন সংক্রান্ত একটি রায় দিলেও ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে। পাকিস্তান রায়কে স্বাগত জানায়।

ভারত আবারও স্পষ্ট করে জানায়, ২০২৫ সালের পেহেলগাঁও হামলার পর স্থগিত করা সিন্ধু পানিচুক্তি এখন কার্যকর নেই।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

বিশ্লেষকদের মতে, উভয় দেশের মধ্যে আলোচনার ইঙ্গিত থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস এখনও বড় বাধা হয়ে আছে।

পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক জওহার সেলিম বলেন, “আলোচনার বিষয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক সংলাপ শুরু করার রাজনৈতিক ইচ্ছা এখনও স্পষ্ট নয়।” সূত্র: আল-জাজিরা

বিডি প্রতিদিন/একেএ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews