আরামদায়ক ও নিরাপদ ভ্রমণের জন্য মানুষ প্রথমেই রেলপথ বেছে নেয়। কিন্তু এ পথেও দুর্ভোগের শেষ নেই। সিলেট-আখাউড়া রেলপথে প্রায়ই ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রেন আটকে যায়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। দিনদিন দুর্ভোগের মাত্রা যেন বেড়েই চলছে। বলতে গেলে, এই দুর্ভোগ এখন এ অঞ্চলের ট্রেন যাত্রীদের নিত্যদিনের যন্ত্রণা। দিনে যেমন তেমন রাতে পরিবারপরিজন, শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় সময় কাটে পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া যাত্রীদের। কখন যে কী হয়!

প্রায়ই দেখা যায়, মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়ায় ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে ট্রেন আটকা পড়ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে ছেড়ে আসা আন্তনগর উপবন, পারাবত, কালনী, পাহাড়িকা, উদয়ন এক্সপ্রেস, এমনকি মালবাহী ট্রেনও বনের ভিতরে পাহাড়ি উঁচু এলাকা অতিক্রম করার সময় আটকে যায়। তখন ট্রেনগুলো পেছন দিকে শ্রীমঙ্গল বা কমলগঞ্জ রেলস্টেশনে নিয়ে যেতে হয়। কখনো হুইল স্লিপ বা চাকা ঘুরিয়ে উঁচু এলাকা পার করে দিতে হয়। হাত দিয়ে চাকা ঘুরিয়ে ট্রেন চালাতে হয়, এ কথা শুনে পাঠকরা হাসবেন না; এটাই সত্য। এই তো সেদিন লাউয়াছড়ায় আটকে পড়া কালনী ট্রেনের চাকা ঘুরিয়ে উঁচু এলাকা পার করে দিতে হয়েছে। এর সাক্ষী ওই ট্রেনের যাত্রীরাই।

জানা যায়, লাউয়াছড়া বনে ট্রেন আটকে পড়ার প্রধান কারণ দুর্বল ইঞ্জিন। সর্বশেষ গত ৭ ফেব্রুয়ারি লাউয়াছড়া বনে মাগুরছড়া এলাকায় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পাহাড়িকা ট্রেন আটকে যায়। পরে ত্রুটি মেরামত করে ৬ ঘণ্টা পর ট্রেনটি ছেড়ে যায়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা উপবন ট্রেন ইঞ্জিন বিকল হয়ে রাত প্রায় সাড়ে ৩টায় লাউয়াছড়ায় আটকে যায়। দুই ঘণ্টা পরে শ্রীমঙ্গল স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা চট্টগ্রাম থেকে আসা উদয়ন ট্রেনের ইঞ্জিন গিয়ে উপবন ট্রেনকে ধাক্কা দিয়ে পার করে দেয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী কালনী এক্সপ্রেস রাত সাড়ে ৮টায় লাউয়াছড়া অতিক্রম করার সময় ফ্যানের ফিউজ জ্বলে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। আখাউড়া থেকে ইঞ্জিন আসার পর রাত সাড়ে ১১টায় ট্রেনটি ছেড়ে যায়। ২৪ মার্চ ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কালনী এক্সপ্রেস, ২২ মার্চ রাত ৩টায় সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেস, ১৯ মার্চ পারাবত এক্সপ্রেস, ১৮ মার্চ ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেস, ২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস, ২৬ নভেম্বর সিলেট থেকে ছেড়ে আসা পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেন আটকে যায়। এই হলো সিলেট-আখাউড়া রেলপথের বাস্তব চিত্র।

স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকার সিলেট-আখাউড়া রেলপথের দিকে নজর দেয়নি। অথচ প্রবাসী অধ্যুষিত এই সিলেট বিভাগ দেশের রাজস্ব খাতে বড় ভূমিকা রাখছে। পর্যটনেও কমতি নেই সিলেটের। এগিয়ে রয়েছে ব্যবসাবাণিজ্যে। মূলত চা-শিল্প ও ব্যবসার প্রসারে ব্রিটিশ আমলে  সিলেটে রেললাইন স্থাপন হয়েছিল। এই রেলপথেই সিলেটের চা, পাথর, বালু ও অন্যান্য পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেলপথ হয়ে ওঠে এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের বাহন। বর্তমানে সিলেট রেলস্টেশন বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম স্টেশন। আর উন্নয়নের দিক দিয়ে দেশের অন্য স্টেশনগুলোর চেয়ে পেছনে। এ পথে এখনো রেল চলছে মিটারগেজ লাইনে। আর ট্রেনের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মান্ধাতা আমলের ইঞ্জিন। কিন্তু এভাবে আর কত? কবে শেষ হবে এই দুর্ভোগ। এই রেলপথে আন্তনগর উপবন, পারাবত, কালনী, পাহাড়িকা ও উদয়ন ট্রেন ২৯০০ সিরিজের ইঞ্জিন দিয়ে চালানো হচ্ছে। যেগুলো ২০০৬ সালে আমদানি করা। ১৯ বছরে অনেক ইঞ্জিন দুর্বল হয়ে শক্তি কমে গেছে। অথচ একই রেলপথে তেলবাহী ট্রেন চলছে ৩ হাজার সিরিজ ইঞ্জিন দিয়ে। যেগুলো ২০১৭ সালে আমদানি করা। রেলসংশ্লিষ্টদের মতে, সিলেট-আখাউড়া রেলপথে ৩ হাজার সিরিজের নতুন ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালালে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। এ ছাড়া ডুয়েল ডাবল লাইন করা হলে সিলেটের সঙ্গে দেশের উত্তরাঞ্চল রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ এবং দক্ষিণাঞ্চল খুলনা ও বরিশাল বিভাগের রেল যোগাযোগ স্থাপন হবে। এতে শুধু যাত্রীসেবার পরিধি বৃদ্ধি হবে না, স্থলপথের আমদানি-রপ্তানির অন্যতম কেন্দ্র বেনাপোল স্থলবন্দর, দর্শনা স্থলবন্দর ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে সিলেট অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আনবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এ ছাড়া কক্সবাজার ও কুয়াকাটার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন হয়ে সিলেটের পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে এলাকাবাসীর নিবেদন, আপনার প্ল্যানের মধ্যে সিলেট-আখাউড়া রেলপথ অন্তর্ভুক্ত করুন। দূর করুন এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখকষ্ট। সবার আগে বাংলাদেশ। দেশের অবহেলিত উত্তর-পূর্বাঞ্চল সিলেট-আখাউড়া রেলপথ উন্নয়নে সরকারপ্রধান ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নেবে এটাই প্রত্যাশা।

♦ লেখক : সাংবাদিক, বাংলাদেশ প্রতিদিন



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews