জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষ এবং বিপক্ষ নিয়ে সরকারিদল ও বিরোধীদলের মধ্যে বেশ তর্কবিতর্ক হয়েছে। অধিবেশনের উল্লেখযোগ্য সময় এই তর্কবিতর্ক হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে সংসদের প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে স্বাধীনতার বিপক্ষ দল হিসেবে সরকারিদলের বেশ কয়েকজন এমপি ঝাঁঝালো বক্তব্য দেন। স্বাধীনতার বিরোধিতা করা নিয়ে দলটির নৈতিক ভিত্তি এবং ভূমিকা ইতিহাসের আলোকে তুলে ধরেন। এ ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামী তার ভূমিকার স্বপক্ষে সংসদের ভেতরে ও বাইরে বক্তব্য দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে দলটির বক্তব্য দেশের মানুষের কাছে কতটা গ্রহণীয় বা বর্জনীয়, তা উপলব্ধির বিষয়। জামায়াত যে কথাটা বলতে চাচ্ছে, তা হচ্ছে, একাত্তরের জামায়াত আর একাত্তর পরবর্তী জামায়াত এক নয়। দলটির নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে এবং এখন যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, একাত্তরে তাদের কোনো বিতর্কিত ভূমিকা ছিল না। দলটির মধ্যে এখন মুক্তিযোদ্ধাও আছে এবং এমপিও নির্বাচিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, জামায়াত এখন একাত্তর পরবর্তী জেনারেশনের দলে পরিণত হলেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, তেঁতুল গাছে, তেঁতুলই ধরে, আম ধরে না। এটা একটা জেনেটিক বিষয়। যে পরিবার যে আদর্শের রাজনীতির সাথে জড়িত, সেই ঘরের সন্তানরাও সে আদর্শেই বেড়ে ওঠে। এর ব্যতিক্রম যে হয় না, তা নয়। একই পরিবারের সদস্য একেক আদর্শ ধারণ করে রাজনীতি করে। তবে এই সংখ্যা খুব কম। ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয় না। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশ যতদিন স্বাধীন থাকবে, ততদিন স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াতের কী ভূমিকা ছিল, তা উচ্চারিত হতে থাকবে। প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসেবে পরিচিত জামায়াত কীভাবে এ থেকে বের হতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াত যে ভূমিকা রেখেছে, তার দায় স্বীকার করে দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া। ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যুক্তরাজ্যের পূর্ব লন্ডনে ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, একাত্তরে জামায়াত কোনো ভুল করলে, সেটি যদি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়, তাহলে তিনি জাতির কাছে ক্ষমা চাইবেন। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালে আমাদের যে ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে আমাদের দলের পক্ষ থেকে যে ভুল ছিল, সেই ভুলের জন্য আমি এবং আমার দল নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থণা করছি।’ তার এই বক্তব্য সে সময় রাজনৈতিক মহলে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ এ বক্তব্য ইতিবাচক হিসেবে দেখেন, কেউ একে নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখেন। অনেকে বলেছেন, ‘ভুল’ আর ‘অপরাধ’ করা এক জিনিস নয়। তার উপর ‘যদি’ শব্দ ব্যবহার করে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকে ব্র্যাকেটবন্দি করা হয়েছে।
দুই.
এটা স্বাভাবিক বিষয়, একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে তাকে পদে পদে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং হতে হবে। এ নিয়ে সে নানা বক্তব্যও দিচ্ছে। সেগুলো দেশের মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বা পাচ্ছে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবে ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর একাত্তরে দলটির ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে, সে সময় দলটির হাবভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল যে, অনেকেরই ধারণা ছিল, সে ক্ষমতায় আসছে। ফলে তাকে একাত্তর বিষয়ে জবাব দিতে হয়েছে। জবাব দিতে গিয়ে দলটি একেক সময় একেক কথা বলেছে। এ নিয়ে ধোঁয়াশাও তৈরি হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানকে জামায়াত এমনভাবে ক্যাপিটালাইজ করে এবং এমনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে যে, সে এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছে। এর মাধ্যমেই দেশ প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেকদের মতে, একাত্তরে যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেটিকে জামায়াত গণঅভ্যুত্থানকে ইরেজার হিসেবে ব্যবহার করে মুছে দেয়ার প্রবণতা দেখিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানকে দলটি ‘দ্বিতীয় স্বাধীননতা’ হিসেবে বিবেচনা করেছে। প্রথম স্বাধীনতা হিসেবে ১৯৪৭-এ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হয়ে আলাদা হওয়াকে বেছে নিয়েছে। মাঝে যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেটিকে উহ্য রেখেছে। দেশের স্বাধীনতা বলতে ’৪৭ এবং ’২৪Ñএই দুইটি নিয়েই দলটির নেতাকর্মী এবং তার সমর্থক বিদেশি ইউটিউবাররা এন্তার প্রচারনা চালিয়েছে। এতে কতটা কাজ হয়েছে এবং জামায়াতের ক্ষমতায় আসা সময়ের ব্যাপার মাত্রÑএমন ন্যারেটিভ ও পারসেপশন তৈরি কতটা কাজে লেগেছে, তা ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনই তার প্রমাণ। তবে ক্ষমতায় যেতে না পারলেও জাতীয় সংসদে দলটি ৬৮টি আসন নিয়ে বিরোধীদলের আসনে বসেছে। বলা হয়ে থাকে, স্বাধীনতার পর জামায়াতের ইতিহাসে এটাই তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন। যেখানে দলটির ভোটের হার গড়ে সাত-আট পার্সেন্ট কিংবা তারও কম ছিল, সেখানে ’২৬ সালের নির্বাচনে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি দলটির জন্য অভাবনীয় সাফল্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্বাচনে জামায়াত নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসছে, এ দৃঢ় বিশ্বাস দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের উল্লাস ও আকাক্সক্ষা ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্বাচনে তাদের সে আকাক্সক্ষা ধূলিস্যাত হয়ে গেছে। কেন এমন হলো? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, একাত্তরে দলটির ভূমিকা মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। যে দল দেশের স্বাধীনতা চায়নি, সে দলকে দেশের মানুষ ক্ষমতায় দেখতে চায়নি। এমনকি, ’৪৭-এ দেশভাগও দলটি চায়নি। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন বা পাকিস্তান সৃষ্টির সময় জামায়াতে ইসলামী এবং এর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আ’লা মওদুদী পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, মুসলিম লীগের নেতারা ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করছে না, বরং তারা ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ বা কেবল মুসলমানদের জন্য একটি আবাসভূমির জন্য আন্দোলন করছেন। মওদুদী বিশ্বাস করতেন, একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রে মুসলমানরা সত্যিকারের ইসলামী আইন (শরিয়াহ) প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। তিনি সমগ্র ভারতে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন। ফলে জামায়াত পাকিস্তান সৃষ্টির পরিবর্তে অখ- ভারতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
তিন.
জাতীয় সংসদের সমাপনী অধিবেশনে সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমি ৪৭ মানি না। এজন্য মানি না, এই ৪৭ হয়েছিল ধর্মের নামে এবং বাঙালিকে শোষণ করার জন্য। সেজন্য ৪৭ আমার কাছে কোনো মূল্য নেই।’ তার এই বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, জামায়াত যেমন ’৪৭ মানেনি, তিনিও মানেন না। জামায়াত কেন মানেনি, তা উপরে উল্লেখ করেছি। আর তিনি কেন মানেনা তার ব্যাখ্যায় তিনি ধর্ম ও বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানীদের শোষণের কথা বলেছেন। যদি তিনি ’৪৭-এর প্রেক্ষাপট এবং কেন পাকিস্তান ও ভারত আলাদা রাষ্ট্র হলো, তা বিবেচনা করতেন, তাহলে এ কথা বলতে পারতেন না। এটা তো ঐতিহাসিক সত্য যে, উপমহাদেশে ইংরেজরা শাসন করেছিল, হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, হিংসা, বিদ্বেষ তৈরি করে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’-এর মাধমে। অখ- ভারতে হিন্দু-মুসলমানদের দ্বন্দ্ব এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল যে, তাদের পক্ষে একসাথে বসবাস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। হিন্দু-মুসলমানের ছোট-বড় দাঙা ছড়িয়ে পড়ছিল। ১৯৪৬ সালের ক্যালকাটা কিলিং এবং নোয়াখালীর দাঙ্গার পর হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস চরমে পৌঁছে, যা দেশভাগকে অনিবার্য করে তোলে। দ্বিজাতি তত্ত্ব বা মুসলমান ও হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতে পৃথক রাষ্ট্র বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করে। শুধু জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব নয়, বাংলার হিন্দু জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের একাংশ নিজেদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় দেশ ভাগের দাবি জানায়। ফলে, র্যাডক্লিফ লাইন অনুযায়ী, বাংলা দুই ভাগ হয়ে হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ ভারতে এবং মুসলমান অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়। এই দেশভাগ হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে। হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানদের নিপীড়ন-নির্যাতনের কারণে। এখন ভারতে মুসলমানদের কী অবস্থা, তা সকলেরই জানা। হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি সরকার তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের বিল পাস করেছে। ভারত থেকে বিতাড়নের ব্যবস্থা করেছে। পুশইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে মুসলমানদের। উগ্রবাদী হিন্দুরা প্রায় প্রতিদিন, মুসলমানদের হত্যা-নির্যাতন করছে। এখন ৪৭ মানি না বললে তো অখ- ভারতের কথা বোঝায়, যেটা বিজেপি সরকারের স্বপ্ন। ইতোমধ্যে সে অখ- ভারতের ম্যাপ প্রকাশ করেছে। কাজেই, ‘৪৭ মানি না’ এ কথা বললে কী বোঝায়, তা ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ নেই। এ কথা সত্য, পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হওয়ার শুরু থেকেই বাংলাভাষীরা ভাষাগত ও রাজনৈতিক শোষণের শিকার হয়, যা পরবর্তীতে ’৭১ সালে স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং শোষণের কারণেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। ফলে সরকারি দলের এমপি যে ’৪৭ মানেন না বলেছেন, তা কেন বলেছেন? ’৪৭ না হলে তো বাংলাদেশেরই জন্ম হতো না এবং তিনি এমপিও হতেন না, সংসদে দাঁড়িয়েও বক্তৃতা দিতে পারতেন না। ’৪৭ অস্বীকার করা মানে ইতিহাসকে অস্বীকার করা, প্রকারন্তরে বাংলাদেশকে অস্বীকার করা।
চার.
সরকারি দলের দায়িত্বশীল নেতা এবং এমপির কাছ থেকে এ ধরনের বল্গাহীন বক্তব্য কাক্সিক্ষত নয়। এটা দেশের মানুষের কাছে ভুল বার্তা যায়। সরকারেরও ভাবমর্যাদা বিনষ্ট হয়।তার শ্লেষাত্মক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আরেকটি বিষয় উঠে এসেছে। তা হচ্ছে, ’৪৭-এ যে মুসলমান এবং ইসলামের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছে, তা অস্বীকার করা। ধর্মের নামেই যে দেশভাগ হয়েছিল এবং হিন্দু-মুসলমান উভয়েই এ ভাগ চেয়েছিল, তা অস্বীকার করার অর্থ ইতিহাসকে অস্বীকার করা। তিনি মানেন কিংবা না মানেন, এই ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না। অন্যদিকে, ’৪৭-এর দেশ ভাগের বিরোধিতা এবং ’৭১-এ স্বাধীনতার বিরোধিতার ইতিহাসও জামায়াতে ইসলামী মুছে ফেলতে পারবে না। এই ইতিহাস থেকে তারা বের হতে পারবে না, যতদিন না, দলটি স্বাধীনতাযুদ্ধে তার অন্যায়, অপরাধ কোনো ‘যদি’, ‘কিন্তু’, ‘ভুল হয়ে থাকলে’ ইত্যাদির মধ্যে ব্র্যাকেটবন্দি করা ছাড়া দ্বিধাহীন চিত্তে জাতির কাছে ক্ষমা না চায়। তা না করলে, যতই ঘুরিয়ে-প্যাঁচিয়ে ’৭১-এ নিজের অবস্থানকে জাস্টিফাই করতে চাক না কেন, তাতে কোনো লাভ হবে না। যদি তা করে, তাহলে দেশে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল হয়ে উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে।
[email protected]