২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে নেমেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সামগ্রিক পাসের হার কমার পেছনে একাধিক কারণ সামনে এসেছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, মানবিক শাখার শিক্ষার্থীদের প্রতি স্কুলের কম নজরদারির কারণেই এই শাখায় বিপর্যয় ঘটেছে। বাধ্যতামূলক দু’টি বিষয় ইংরেজি ও সাধারণ গণিতে ফেলের সংখ্যাও সার্বিক পাসের হারে প্রভাব ফেলেছে। অপর দিকে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসঙ্কট, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক না থাকা, কোচিংনির্ভর প্রস্তুতি এবং বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের প্রতি বেশি ঝোঁক থাকার গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের ফল বিপর্যয়ের দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। এর পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, নিয়মিত মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি চিহ্নিত করার ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও রয়েছে।
ফলাফলের এই চিত্রকে মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সঙ্কটের প্রতিফলন হিসেবেও দেখছেন শিক্ষাবিদরা। শুধু পাসের হার কমেনি; ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল ফল, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস না করার ঘটনাও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রকৃত ঘটনার আড়ালেও অনেক ঘটনাই এবারের ফল বিপর্যয়ের জন্য দায়ী বলে অভিমত জানিয়েছন শিক্ষাবিদরা। বিশেষ করে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল যেন দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের জমে থাকা সঙ্কটকে একসাথে সামনে নিয়ে এসেছে। এ ছাড়া শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস না করার ঘটনা শিক্ষার মান নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সবার মনেই বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইংরেজি ও গণিতে বড় ধাক্কা
এবারের ফলাফলের অন্যতম বড় দুর্বলতা দেখা গেছে ইংরেজি ও গণিতে। বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ দু’টি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কাক্সিক্ষত ফল করতে পারেনি। বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় ইংরেজি ও গণিতে অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সরাসরি সামগ্রিক পাসের হারে পড়েছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামানও ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল ফলকে সামগ্রিক পাসের হার কমার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তিনি বর্তমানে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন।
তবে তাৎক্ষণিক কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ, বছরের পর বছর ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দুর্বলতা কাটছে না কেন? শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ঘাটতি, নিয়মিত অনুশীলনের অভাব, শিক্ষকসঙ্কট এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতির প্রবণতা এ ক্ষেত্রে কতটা দায়ী তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের দুর্বল ভিত কাটছে না কেন?
আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক চিত্র। এ বছর ৩০ হাজার ৪০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়। ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করলেও ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। ২০২৫ সালে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩৪টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোনো শিক্ষার্থী পাস না করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এটি শুধু পরীক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বিদ্যালয় পর্যায়ের শিখনমান, শিক্ষকতা, নজরদারি, উপস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একই জাতীয় পাঠ্যক্রম ও প্রায় অভিন্ন পরীক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করছে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করছে না এই বৈপরীত্যের কারণ প্রতিষ্ঠানভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
মানবিক বিভাগের নজরদারি নেই
এবার দেখা গেছে বিভাগভিত্তিক ফলও উদ্বেগজনক। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাসের হার সবচেয়ে কম। ছেলেদের মধ্যে এ হার প্রায় ৪১ শতাংশ এবং মেয়েদের প্রায় ৫৪ শতাংশ। বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রদের পাসের হার ৭৭ শতাংশের বেশি এবং ছাত্রীদের প্রায় ৮৪ শতাংশ। মানবিক বিভাগের পরীক্ষার্থী সংখ্যা বেশি হওয়ায় এ বিভাগের দুর্বল ফল সামগ্রিক পাসের হারেও বড় প্রভাব ফেলেছে। মানবিক বিভাগের প্রতি কার্যত নজরদারি নেই।
শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পরিবর্তনের ধাক্কা
ফল বিপর্যয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির ধারাবাহিক পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষাক্রম, পাঠদান ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তনের ফলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে শিক্ষাবিদদের একটি অংশ মনে করেন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা ঠিক নয়। নতুন ব্যবস্থা সারা দেশে একযোগে বাস্তবায়নের আগে পাইলটিং করে কার্যকারিতা যাচাই প্রয়োজন। ধাপে ধাপে পরির্তন করা উচিত এবং শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে সমন্বয় করা দরকার। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ গত কয়েক বছরে শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা করেছে। ফলে তাদের শেখার ধারাবাহিকতা কতটা বজায় ছিল, সেটিও নতুন করে বিশ্লেষণ করা দরকার।
শিক্ষক প্রস্তুতি ও শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা
যোগ্যতাভিত্তিক বা নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত হলো দক্ষ শিক্ষক, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতার সাথে পরিকল্পনার যথেষ্ট ব্যবধান থাকলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন।
বড় শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষকের পক্ষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর দুর্বলতা আলাদাভাবে শনাক্ত করা কঠিন। ফলে কোনো শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে পিছিয়ে পড়লে বছরের পর বছর সেই ঘাটতি থেকে যেতে পারে। এসএসসি পরীক্ষার আগে এসে তখন ওই ঘাটতি পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এ কারণে শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান বাড়ানো এবং বিদ্যালয়ে নিয়মিত একাডেমিক তদারকি জোরদার করা জরুরি।
করোনাকালের শিখনঘাটতির প্রভাব
২০২০ ও ২০২১ সালের করোনাকালীন শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয়ের প্রভাবও পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায় না। দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকা, অনলাইন শিক্ষায় বৈষম্য, নিয়মিত পরীক্ষা ও অনুশীলনের ঘাটতি এবং পরবর্তী সময়ে দ্রুত শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন- সব মিলিয়ে একটি প্রজন্মের মৌলিক শিক্ষায় যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকতে পারে। এই শিখনঘাটতি কতটা পূরণ হয়েছে তা নির্ধারণে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। শুধু এসএসসি পরীক্ষার ফলের মাধ্যমে এ ঘাটতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
মূল্যায়ন পদ্ধতিই কি একমাত্র কারণ?
ফল খারাপ হওয়ার পর সাধারণত প্রশ্ন ওঠে উত্তরপত্র মূল্যায়ন কি অতিরিক্ত কঠোর হয়েছে? তবে ইংরেজি, গণিত, মানবিক বিভাগ ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোতে একসাথে খারাপ ফল দেখা যাওয়ায় শুধু মূল্যায়ন কঠোর হওয়ার বিষয়টিকে একক কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
আবার ফলাফলে ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। অর্থাৎ ফল বিপর্যয় সব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে সমান নয়। লিঙ্গ, বিভাগ, অঞ্চল, প্রতিষ্ঠান ও বিষয়ভেদে ফলাফলের পার্থক্য রয়েছে। তাই জাতীয় গড়ের ভিত্তিতে পুরো সমস্যার ব্যাখ্যা না করে আরো গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
আঞ্চলিক বৈষম্যও স্পষ্ট
শিক্ষা বোর্ডভেদে ফলাফলের ব্যবধানও বড়। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ হলেও ময়মনসিংহে তা ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং সিলেটে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। চট্টগ্রামে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এই ব্যবধানের পেছনে শিক্ষকসঙ্কট, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, শহর-গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য ও কোচিংনির্ভরতার মতো কারণগুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সর্বোপরি এবারের ফলাফলে ইংরেজি ও গণিতে দীর্ঘদিনের মৌলিক দুর্বলতা ধরা পড়েছে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয় পর্যায়ে শিখনঘাটতি যথাসময়ে শনাক্ত ও পূরণ করা হচ্ছে না। তৃতীয়ত, শিক্ষকসঙ্কট ও বড় শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা বাধাগ্রস্ত করছে। চতুর্থত, শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট করেছে। পঞ্চমত, অঞ্চল ও প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার মানের ভয়াবহ বৈষম্য রয়েছে। ষষ্ঠত, কোভিড-পরবর্তী শিখনঘাটতির পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার হয়নি। শিক্ষাবিদদের বক্তব্যও মূলত এ দিকেই ইঙ্গিত করে পরীক্ষার ফল ভালো করার জন্য সাময়িক ব্যবস্থা নয় বরং শিক্ষার ভিত শক্ত করতে হবে। নতুন কোনো পদ্ধতি চালুর আগে গবেষণা ও পাইলটিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা বিবেচনা এবং শিক্ষার্থীর শিখনঘাটতি নিয়মিত পরিমাপ করা জরুরি।