বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায় প্রতি বছর রমজানের জন্য অপেক্ষা করি। সাহরি ও ইফতারের পাশাপাশি পবিত্র রমজান আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আমরা বলি, ‘গত রমজানে অমুক ছিলেন, এই রমজানে নেই।’ আগামী রমজানে আমরা থাকব কিনা সে নিয়েও সংশয় প্রকাশ করি। রমজান আমাদের জীবনে সংযমের বার্তা নিয়ে আসে। এটি আত্মশুদ্ধির, বিবেক জাগরণ এবং দায়িত্ববোধের এক গভীর অনুশীলন।

রমজান এলেই দিন শেষে আমরা খাবারের টেবিলে বসি ভিন্ন এক অনুভূতি নিয়ে। সারা দিন না খেয়ে থাকার পর এক ফোঁটা পানির মূল্য নতুন করে উপলব্ধি করি। অথচ এই পানিই, এই খাদ্যই আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনের ভিত্তি। প্রশ্ন হলো, আমরা কি কখনো ভেবেছি এই খাদ্য কোথা থেকে আসে? কার ঘাম ঝরে এই খাবার আমাদের প্লেটে ওঠে? আর সেই খাদ্য বণ্টনে ন্যায্যতা কতটুকু আছে?

যেহেতু কৃষি নিয়েই কাজ করি। খুব ইচ্ছা ছিল কোরআন ও সুন্নাহয় কৃষি সম্পর্কে কী আছে তা জানা ও বোঝার। বিভিন্ন সময় কোরআন ও হাদিস সম্পর্কে যারা জানেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেছি- কোরআনের আলোকে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে। রাজধানীর খিলগাঁও জামে মসজিদের খতিব মোহাম্মদ সালমান বেশ পড়াশোনা করে আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাছ থেকে জেনেছি অনেক কিছু।

কোরআন আমাদের শেখায়, খাদ্য হতে হবে হালাল ও তাইয়িব। অর্থাৎ বৈধ, পবিত্র এবং ন্যায্য উপায়ে অর্জিত। কৃষির ক্ষেত্রেও এই নীতিই প্রযোজ্য। জমি দখল করে, অন্যের অধিকার হরণ করে, ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে ফসল উৎপাদন করলে তা কেবল শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়, আত্মার জন্যও ক্ষতিকর। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা ইসলামের নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত।

কৃষি অর্থনীতির সঙ্গেও ইসলামের নির্দেশনা গভীরভাবে যুক্ত। হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ ছিল। কারণ খাদ্য নিয়ে মুনাফাখোরি মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে। আজকের বাজার ব্যবস্থাপনায় এই নীতির প্রতিফলন কতটা আছে, তা আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। কৃষক ন্যায্যমূল্য পায় না, ভোক্তা পায় না ন্যায্য দামে খাদ্য। এই ব্যবধান ইসলামের ন্যায়বিচারের চেতনার পরিপন্থি।

পবিত্র কোরআন আমাদের বারবার খাদ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সুরা আবাসায় আল্লাহতায়ালা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন নিজের খাদ্যের দিকে গভীরভাবে তাকাতে। ভাবতে বলেছেন, এই খাদ্য কীভাবে উৎপন্ন হয়। আকাশ থেকে বৃষ্টি নেমে আসে, জমিন সিক্ত হয়, বীজ ফেটে চারা গজায়, চারা থেকে গাছ, গাছ থেকে ফল ও শস্য। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মানুষের ভূমিকা সীমিত, কিন্তু আল্লাহর কুদরত অসীম। কৃষক বীজ বপন করেন, জমি প্রস্তুত করেন, সেচ দেন, আগাছা পরিষ্কার করেন। কিন্তু বীজের ভিতর প্রাণ সঞ্চার করেন আল্লাহই। এই উপলব্ধি যদি আমাদের জীবনে গভীরভাবে বসে যেত, তাহলে হয়তো খাদ্য অপচয় করতাম না, কৃষককে বঞ্চনা-অবহেলা করতাম না।

সারা দিন রোজা রেখে বুঝতে পারি, খাদ্য ছাড়া মানুষ কতটা অসহায়। অথচ এই খাদ্য উৎপাদনের পেছনে যে কৃষক জীবনবাজি রেখে কাজ করেন, তার মর্যাদা সমাজে আজও খুব কম। শহরের আলো ঝলমলে বাজারে আমরা দামি পোশাক, মোবাইল ফোন, গাড়ি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু যে কৃষক ধান ফলান, সবজি ফলান, দুধ উৎপাদন করে, তার ন্যায্যমূল্য নিয়ে আমাদের আলোচনা খুব কম। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি নৈতিকও।

ইসলাম কৃষিকাজকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। নবী করিম (সা.) নিজে কৃষিকাজ করেছেন, পশুপালন করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম মাঠে কাজ করেছেন। হাদিসে এসেছে, কেউ যদি একটি গাছ লাগায় এবং তা থেকে মানুষ বা পশু উপকৃত হয়, তাহলে তা তার জন্য সদকায়ে জারিয়া। অর্থাৎ কৃষি শুধু পেশা নয়, এটি ধারাবাহিক সওয়াবের উৎস। এই দৃষ্টিভঙ্গি যদি আমাদের রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত হতো, তাহলে কৃষক আজ অবহেলিত থাকত না। হাদিসে এসেছে, যে হাত দিয়ে মানুষ হালাল খাদ্য উৎপাদন করে, সেই হাত জাহান্নামের আগুনে পুড়বে না। এই বক্তব্য কৃষকের মর্যাদা কতটা উঁচু, তা স্পষ্ট করে দেয়।

আজকের বাস্তবতায় আমরা দেখি ভিন্ন চিত্র। কৃষক মাঠে ফসল ফলান, কিন্তু বাজারে সেই ফসলের দাম ঠিক করে অন্য কেউ। মাঝখানে একের পর এক স্তর, আড়তদার, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা। কৃষক যখন তার ধান দশ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখন ভোক্তাকে সেই ধান থেকে তৈরি চাল কিনতে হয় আশি বা নব্বই টাকায়। এই ব্যবধান কোথায় যায়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই বোঝা যায়, খাদ্যের বণ্টন ব্যবস্থায় বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে।

রমজান শেখায় সংযম। শুধু খাওয়াদাওয়ায় নয়, মজুতেও সংযম। ইসলাম খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে খাদ্য মজুতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। কারণ খাদ্য নিয়ে ব্যবসা করে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানো ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায়। আজকের বাজার ব্যবস্থাপনায় এই নীতির কতটুকু প্রতিফলন আছে? এ প্রশ্নের সঠিক জবাব ইতিবাচক হওয়ার সামান্য সুযোগও আছে কি? না, নেই।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় খাদ্যের অভাব নেই। আমাদের মাটি উর্বর, পানি আছে, কৃষক আছে। তবু কৃষক ন্যায্যমূল্য পায় না, ভোক্তা পায় না সাশ্রয়ী দামে খাদ্য। এর মূল কারণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নৈতিকতার অভাব। খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন কেবল বাজারের বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের দায়িত্বও। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, কৃষককে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ মূল্য দেওয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, এসব কিছু মিলিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

দেশের মাটি উর্বর, পানি আছে, পরিশ্রমী কৃষক আছে। তবু কৃষক আজও নিরাপত্তাহীন। কখনো ন্যায্য দাম পায় না, কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্ব হারায়। কোরআন সুন্নাহর আলোকে যদি কৃষিকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, তাহলে কৃষকের এই দুর্দশা অনেকটাই লাঘব হতো।

রমজান মাসে আমরা ইবাদতে মনোযোগী হই। কিন্তু ইবাদত শুধু নামাজ, রোজা বা দোয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও ইবাদতের অংশ। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করাও ইবাদতের অংশ। অপচয় কমানো, পানি সংরক্ষণ করা, জমির উর্বরতা রক্ষা করা, এসবই ইমানের দাবি। কারণ এগুলো মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত।

একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে কৃষিকে সম্মান দিতে হবে। রমজান শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু রমজানের শিক্ষা যেন জীবনে থেকে যায়। ক্ষুধার অনুভূতি যেন মনে করিয়ে দেয় ক্ষুধার্ত মানুষের কথা। ইফতারের তৃপ্তি যেন শেখায় ভাগ করে খেতে। আর কোরআনের নির্দেশনা যেন পথ দেখায় একটি ন্যায়ভিত্তিক খাদ্য ব্যবস্থার। রমজান, কৃষি ও খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন একে অন্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই উপলব্ধি যদি ব্যক্তিজীবন, সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জায়গা পায়, তাহলে আমরা শুধু ধর্মীয়ভাবেই নয়, মানবিকভাবেও সমৃদ্ধ হব। এই রমজানে সেই প্রত্যাশাই থাকুক।

লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews