মাঠপর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবেলা ও ত্রাণ কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-২০১২’ সহ সংশ্লিষ্ট নীতিমালাগুলো পরিমার্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জেলা প্রশাসক সম্মেলনে উত্থাপিত প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে উপজেলাপর্যায়ে প্রশাসনিক নেতৃত্বে এই পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও আইন সংশোধন বর্তমানে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব উপজেলা চেয়ারম্যান পালন করলেও ঝুঁকিহ্রাস, প্রস্তুতি ও পুনর্বাসনের মতো সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাই (ইউএনও) প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এ বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২’, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৫’ এবং ‘দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি ২০১৯’ পুনঃনিরীক্ষণ ও পরিমার্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এতে সম্মতি জানায়।
প্রস্তাবনার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ও ত্রাণ বিতরণ সমন্বয়ে ইউএনওরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাকে কমিটির সভাপতি করা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও এনজিওগুলোর সাথে সমন্বয় করে দ্রুত জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিপদাপন্ন মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া আরো সহজ ও কার্যকর হবে।
সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাত একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে ওঠায় একে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া ত্রাণ কার্যক্রমের আওতায় জিআর কর্মসূচির খাদ্য সহায়তা ১০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ১৫ কেজিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনে সামাজিক সুরক্ষা বলয় প্রসারের লক্ষ্যে চরাঞ্চলে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাইকেল বিতরণ, এতিম মেয়েদের বিয়েতে আর্থিক সহায়তা এবং গৃহনির্মাণে ঢেউটিন ও নগদ অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যক্তিগত আঘাতের ক্ষেত্রেও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
দুর্যোগ মোকাবেলায় কৌশলগত প্রস্তুতি ভূমিকম্পের মতো বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি সামাল দিতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪৪৫টি নিরাপদ স্থান বা ‘সেফ জোন’ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। এ লক্ষ্যে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোকে আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে। ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি স্কুল-কলেজে নিয়মিত ফায়ার ড্রিল আয়োজন এবং সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনার পাশাপাশি আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
বাস্তবায়নযোগ্য সাতটি আঞ্চলিক প্রকল্প সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকার নদী ও জলাশয়ের নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য ড্রেজিং। বরগুনার পায়রা ও বিষখালী নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্লক স্থাপন। বাগেরহাটের বলেশ্বর নদীর ভরাট অংশ এবং কুষ্টিয়ার হিসনা ও সাগরখালী নদী পুনঃখনন। ডুমুরিয়া উপজেলার জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নড়াইলের মধুমতি ও নবগঙ্গা নদীর ভাঙন থেকে জনবসতি রক্ষায় তীর প্রতিরক্ষা কাজ। রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের সংযুক্ত নদীগুলোর পলি অপসারণ।
সরকার আশা করছে, এই আইনগত ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা আরো বৃদ্ধি পাবে।