বাঙালির সমাজ-সংসার মানেই পরিবারকেন্দ্রিক। তাই বাঙালির সত্তাজুড়ে চিরকাল ছিল এবং এখনো আছে পারিবারিক আবহ। আর এই কারণেই চলচ্চিত্র, নাটক, যাত্রা বা গানে তারা দেখতে চায় পারিবারিক গল্প। কমপক্ষে সত্তর থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত টিভি নাটক নির্মিত হতো পারিবারিক গল্পে। কিন্তু ২০০০ সালের শুরু থেকেই দুঃখজনকভাবে নাটকে পারিবারিক গল্প উধাও হয়ে যায়। শুরু হয় সস্তা কৌতুকনির্ভর আর পুতুপুতু প্রেমের বিরক্তিকর নাটক। এতে নাটকের ক্যারেক্টারও কমে যায়। একজোড়া তরুণ তরুণী আর দুটি মোবাইল ফোনেই হয়ে পড়ে টিভি নাটকের অনুষঙ্গ। ২০১৪ সাল থেকে ইউটিউব ভিউর কথা মাথায় রেখে পরিবারকেন্দ্রিক নাটক নির্মাণে উৎসাহ আরও কমে যায় বলে মনে করেন পরিচালক মোস্তফা কামাল রাজ। পরে তিনি নিজেই উপলব্ধি করেন, শৈশব-কৈশোরে পরিবারের সঙ্গে দেখা পারিবারিক গল্পের নাটক নির্মাণ জরুরি। এটাই আসলে আমাদের গল্প। তখন তিনি শুরু করেন ধারাবাহিক ‘ফ্যামিলি ক্রাইসিস’। তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালে যখন পারিবারিক গল্প নিয়ে ধারাবাহিকটি শুরু করি, তখন পরিবার নিয়ে বলার মতো সেভাবে কোনো নাটকই ছিল না। এখন আবার দর্শক পরিবারকেন্দ্রিক নাটক দেখতে চাইছে। দিন শেষে পরিবারই আমাদের মূল। সেই জায়গায় বিশাল একটা ঘাটতি ছিল। বাজেট কমার কারণেই পারিবারিক নাটক কমে গিয়েছিল।
নগরে জীবনযাপনের কারণে আমরা পরিবারের সম্পর্কগুলোই ভুলতে বসেছিলাম।’ এ নিয়ে দর্শকদের মতো আক্ষেপ ছিল অভিনয়শিল্পীদেরও। তারা মনে করেন, বাঙালি ‘পরিবার অন্তপ্রাণ’ জাতি। অথচ নাটক থেকে পরিবার হারিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই দর্শক হারাচ্ছিল নাটক। আশার কথা হচ্ছে, নাটকে আবার ফিরতে শুরু করেছে পরিবারের হারিয়ে যাওয়া সদস্যরা। এসব নাটকে উঠে আসছে বর্তমান সময়ের পারিবারিক নানা গল্প। তাতে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন নাটকের মানুষ। ‘ফ্যামিলি’ নিয়ে নাটকের যেন জোয়ার শুরু হয়ে গেছে। শুধু পারিবারিক গল্পই নয়, একই সঙ্গে বেশ কিছু নাটকের নামের সঙ্গে ‘ফ্যামিলি’ বা ‘পরিবার’ শব্দজুড়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি ক্রাইসিস’, ‘জয়েন্ট ফ্যামিলি’, ‘ফ্যামিলি ফ্যান্টাসি’, ‘ফ্যামিলি প্রবলেম’, ‘ফ্রেন্ডস ফ্যামিলি’, ‘পরিবার দ্য ফ্যামিলি’, ‘হইচই পরিবার’সহ বেশ কিছু নাটক।

পরিবারকেন্দ্রিক নাটক কমে যাওয়া প্রসঙ্গে অভিনেতা আবুল হায়াত বলেছিলেন, ‘রাস্তাঘাটে বের হলেই শুনতে হয়, ভাই, আমাদের ছেলেমেয়েদের কি মা-বাপ নেই? আমাদের ছেলেমেয়েরা কি এতিম? পরিবারে বৃদ্ধদের চরিত্র না থাকায় তখন অভিনয়েও ব্যস্ততা কমে যাচ্ছিল। পরিবারকেন্দ্রিক নাটকের গুরুত্ব নিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ পারিবারিক নাটক পছন্দ করেন। করোনার শুরুর দিকে দেখা গেছে, দুই-তিন যুগ আগের নাটকগুলো পুনঃপ্রচার হচ্ছে। তখনো দর্শক নাটকগুলো দেখেছেন। বর্তমানে আমরা পরিবার থেকে সরে যাচ্ছি। পারিবারিক জীবনের প্রতি মানুষের যে আকর্ষণ ছিল, সেটা আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ‘পুতুপুতু’ প্রেমের গল্প থেকে নাটক বেরিয়ে আসছে। একে সুখবর বলে অভিহিত করেছেন অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম। তিনি বলেন, ‘নাটক দেশের সংস্কৃতির অংশ। দর্শক নাটকে পরিবার দেখতে চায়।

নাটকের সামাজিক চরিত্রগুলো হারিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে ২০২১ সালকে আমি বলব নাটকের টার্নিং পয়েন্ট। ওয়েব সিরিজ, ফিল্ম, ওটিটির বাইরে ধারাবাহিক নাটক নিয়ে টেলিভিশনের পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই।’ প্রবীণ অভিনেত্রী দিলারা জামান বলেন, ‘শেষ কবে একসঙ্গে ১৫-২০ জন অভিনয় করেছি, মনে পড়ে না। গল্পে পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, মায়া, ত্যাগ, অন্যের পাশে দাঁড়ানো, কেউ একাই সবকিছু নয়; সেই বিষয়গুলো দর্শক দেখতে চায়। যান্ত্রিক জীবন থেকে যে আবেগগুলো হারিয়ে যাচ্ছিল, সেগুলোই এখনকার গল্পে আবার ফিরে আসছে। এটি অবশ্যই সবার জন্য সুখের বার্তা।’ নাট্যজন আতাউর রহমান বলেছিলেন, ‘পরিবার, সমাজ নিয়েই তো মানুষের জীবন। এজন্য দর্শক বরাবরই পারিবারিক ও সামাজিক গল্পের নাটক দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। একটা সময় তাই ছিল। পারিবারিক ও সামাজিক গল্পের চমৎকার নাটক তৈরি হতো। এখন এসব অতীত।’ সেই সোনালি সময় আজ অনেকটা অতীতের পাতা হয়ে গেছে। এখনকার নাটকে প্রযুক্তি আর গ্ল্যামারের ঝলক বাড়লেও, পরিবার ও সম্পর্কের গল্পে যে মানবিক উষ্ণতা ছিল, তা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। এদিকে গত কয়েকবছর ধরে কয়েকটি পারিবারিক গল্পের নাটক নির্মিত হয়েছে এবং তা দর্শক গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। ‘তোমাদের গল্প’ ও ‘একান্নবর্তী’ নামের নাটক দুটি বেশ দর্শক সমাদৃত হয়। মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘তোমাদের গল্প’ নাটকের গল্পে যৌথ পরিবারের মাঝে বন্ধন অটুট থাকার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ‘একান্নবর্তী’ নাটকটি পরিচালনা করেছেন মহিন খান। এতেও উঠে এসেছে একান্নবর্তী পরিবারের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গল্প। আলোচনার পাশাপাশি নাটকগুলো ছিল ইউটিউব ট্রেন্ডিংয়ে। এরপর মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ নিয়ে আসেন পারিবারিক গল্পে লেখা ধারাবাহিক নাটক ‘এটা আমাদেরই গল্প’। এ ছাড়া গোলাম মুক্তাদিরের ধারাবাহিক ‘কাজিনস’ নাটকে মাসতুতো ভাই-বোনদের প্রসঙ্গ ধরে একান্নবর্তী পরিবারের গল্প বলছেন তিনি। তা ছাড়া কেএম সোহাগ রানার ‘দেনা পাওনা’ ধারাবাহিকটি ইউটিউবে প্রচার হওয়ার পর বেশ সাড়া জাগায়। এদিকে গত এক বছরে পারিবারিক গল্পে জনপ্রিয়তা পাওয়া নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- আমাদের সংসার, এটা আমাদেরই গল্প, মামার বাড়ি, আত্মীয়, একান্নবর্তী, উত্তরাধিকার, ধূসর প্রজাপতি, শাদী মোবারক, রূপনগর, ৭ কিলো ১ গ্রাম প্রভৃতি। নির্মাতাদের মতে, বর্তমান সময়ের ব্যস্ত জীবনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত কমে গেছে। তাই নাটকের গল্পে পরিবারকে গুরুত্ব দিয়ে দর্শকদের আবেগের জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন তারা। এ ধরনের গল্প দর্শকদের সহজেই স্পর্শ করে এবং দীর্ঘদিন মনে থাকে। এদিকে, দর্শক আগ্রহের তালিকায় ছিল খালাতো ভাই-বোনের প্রেমের গল্প নিয়ে নির্মিত নাটক ‘তোমাকে চাই’। এতে প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করেন জিয়াউল ফারুক অপূর্ব ও তানজিম সাইয়ারা তটিনী। ইমদাদ বাবুর গল্পে নাটকটি পরিচালনা করেছেন মাশরিকুন্ডল আলম। এরপর ‘ডিয়ার ফ্যামিলি’ নামের নাটকটিও লক্ষাধিক দর্শক দেখেছেন ও নিজেদের ভালো লাগা প্রকাশ করেছেন। গল্পে বাবা-ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শহীদুজ্জামান সেলিম ও খায়রুল বাসার। এটি পরিচালনা করেছেন সাজ্জাদ হোসেন। অন্যদিকে মোশাররফ করিম অভিনীত ‘জামাই টক্কর’ নাটকটিও ৮০ লাখের বেশি দর্শক এখন পর্যন্ত দেখেছেন। এক পরিবারের দুই জামাইকে ঘিরে এর গল্প। এতে অন্য দুই জামাই চরিত্রে অভিনয় করেন মোশাররফ করিম ও শামীম হাসান সরকার। এটি পরিচালনা করেছেন সোহেল হাসান। দর্শক পছন্দের তালিকায় রয়েছে ক্যাপিটাল ড্রামায় গত ঈদে প্রচারিত ‘আপনজন’ নাটকটি। এ নাটকে অভিনয় করেছেন আবুল হায়াত, দিলারা জামান, নাদের চৌধুরী, শাহেদ শরীফ খান, দীপা খন্দকার, জোভান, নাজনীন নীহা, সায়েম সামাদ, ফাতেমা হীরা, সাব্বির আহমেদসহ একঝাঁক অভিনয়শিল্পী। এটি পরিচালনা করেছেন জাকারিয়া সৌখিন। এ ছাড়া আরও অনেক নাটক এবার দর্শক আগ্রহে ছিল, এসব নাটকে প্রাধান্য পেয়েছে পরিবারের গল্প। দর্শক বলছে, নাটকে আবার পরিবার ফিরছে, এটি স্বস্তির কথা। কারণ দিনশেষে পরিবার নিয়েই দর্শক ছোটপর্দার সামনে বসে তাদের পারিপার্শ্বিকতার চিত্র খুঁজে পেত। আর তা পেলে তারা স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত হয়।