কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে পানিতে ভিজেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শত শত টন আমদানি পণ্য। যা বাজারমূল্য শতকোটি টাকা ছাড়াবে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। পণ্য রাখার জন্য পর্যাপ্ত গুদাম না থাকা ও গত বছরের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত স্থায়ী কার্গো টার্মিনাল এখনো পুরোপুরি চালু না হওয়াতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ে অব্যবস্থাপনা, পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রিতাও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্বে থাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের ঠেলাঠেলির কারণে শত শত টন পণ্য কার্গো ভিলেজে পড়ে বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। বিমান দায় চাপায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের ওপর আর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট দায় চাপায় বিমানের ওপর।
বিদেশ থেকে কোনো কার্গো বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সেটি বিমান থেকে নামানো, কার্গো টার্মিনালে নেয়া এবং পরবর্তী হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এরপর কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পণ্য খালাস করে। অর্থাৎ পুরো কার্গো ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় বিমান, কাস্টমস ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ভূমিকা রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, কয়েক মাস আগে কার্গো টার্মিনালের একটি শেড আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দীর্ঘ ৯ মাসেও সেটি পুরোপুরি সংস্কার করে চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে গুদাম সংকট দেখা দেয়ায় অনেক আমদানিকৃত পণ্য বাধ্য হয়ে খোলা জায়গায় রাখা হচ্ছে। বৃষ্টিতে এসব পণ্য পানিতে ভিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ে দীর্ঘসূত্রিতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে শুধু পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিই নয়, শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহ, উৎপাদন কার্যক্রম এবং দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিমানপথে সাধারণত উচ্চমূল্যের, জরুরি ও সংবেদনশীল পণ্য আমদানি করা হয়। এসব পণ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা হলে শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের অভিযোগ, বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো এলাকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পণ্য রাখায় তীব্র অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে। গাদাগাদি করে রাখার ফলে সব কাগজপত্র প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট প্লেট বা কার্গোর অবস্থান খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক সময় খোলা আকাশের নিচে খোলা অবস্থায় পণ্য ফেলে রাখায় বৃষ্টিতে ভিজে মূল্যবান মালামাল নষ্ট হচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস এসোসিয়েশনের তথ্য মতে, প্রতিদিন গড়ে ৪৫ থেকে ৫০টি ফ্লাইট ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এর মধ্যে ৫ থেকে ৮টি চার্টার কার্গো ফ্লাইট ও প্রায় ৪৫টি নিয়মিত ফ্লাইট। নিয়মিত ফ্লাইটের পণ্য সাধারণত বিমান অবতরণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যাচাই-বাছাই শেষে নোটিশ অব অ্যারাইভাল দেয়া হয়। আর চার্টার্ড কার্গোর ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়ায় ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে। কিন্তু প্রতিদিন নিয়মিত ফ্লাইটে ৩৫০ থেকে ৪০০ টন কার্গো আসতে থাকায় কয়েকদিনের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টন পণ্য শুধু নোটিশ অব অ্যারাইভালের অপেক্ষায় বিমানবন্দরে জমা হয়ে থাকে। এদিকে, কার্গো বিমান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গ্রহণ করার পর সংশ্লিষ্ট কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্য বাছাই (সর্টিং) এবং প্রকৃত আমদানিকারকের কাছে পৌঁছে দিতে আরও ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে। ফলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব দেখা দেয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ৮০ শতাংশ চালান দ্রুত ছাড় হলেও ২০ শতাংশ আটকে যায়। আমদানিকারকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার পর কাস্টমসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হলে প্রায় ৮০ শতাংশ চালান ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর পরিশোধের কারণে এক থেকে দুইদিন অতিরিক্ত সময় লাগে। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দেয় বাকি ২০ শতাংশ চালানের ক্ষেত্রে, যেগুলো বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদন ছাড়া কাস্টমস থেকে ছাড় করা যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানের একটি আধুনিক এয়ার কার্গো কমপ্লেক্স পরিচালনার জন্য তিন শিফটে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল প্রয়োজন। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে কার্গো জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে এবং আমদানিকারকরা দ্রুত পণ্য ছাড় পেতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্গো ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ওয়্যারহাউজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ডব্লিউএমএস) চালু করা গেলে পণ্য খুঁজে বের করা, সংরক্ষণ ও ডেলিভারি অনেক দ্রুত হবে। এতে প্রতিটি কার্গোর অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে জানা যাবে এবং বারকোড বা আরএফআইডি প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজেই পণ্য ট্র্যাক করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া অনলাইন ডেলিভারি ব্যবস্থাপনা চালু হলে ব্যবসায়ীদের বারবার কার্গো এলাকায় যেতে হবে না। কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি হবে এবং মোবাইল হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইস ব্যবহার করে মাঠপর্যায়েই দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা যাবে।
বিমান বলছে, আমদানি কার্গো দ্রুত ডেলিভারির জন্য বিমান ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত থাকে। তবে পণ্য হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় এজেন্ট উপস্থিত না থাকলে বিমান একতরফাভাবে পণ্য ডেলিভারি দিতে পারে না। সব সময় ২৪ ঘণ্টা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের পাওয়া যায় না, ফলে কিছু ক্ষেত্রে ডেলিভারিতে বিলম্ব হয়। ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি পণ্য একসঙ্গে সংরক্ষণ করতে হলে সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে সময় লাগতে পারে।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৪০টি যাত্রীবাহী ফ্লাইটে ১০০ টন পণ্য আসে। এ ছাড়া ছোট বড় মিলিয়ে ৫টি চার্টার কার্গো ফ্লাইটে ৩০০ টন পণ্য আসে। নিয়মিত ফ্লাইটের পণ্য বিমান অবতরণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যাচাই বাছাই শেষে নোটিশ অব অ্যারাইভাল দেয়া হয়। আর চার্টার্ড কার্গোর ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়ায় ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে। কিন্তু প্রতিদিন নিয়মিত ফ্লাইটে গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টন কার্গো আসতে থাকায় কয়েকদিনের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ টন পণ্য শুধু নোটিশ অব অ্যারাইভালের অপেক্ষায় বিমানবন্দরে জমা হয়ে থাকে। এদিকে কার্গো বিমান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গ্রহণ করার পর সংশ্লিষ্ট কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্য বাছাই (সর্টিং) এবং প্রকৃত আমদানিকারকের কাছে পৌঁছে দিতে আরও ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে। ফলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব দেখা দেয়। তিনি বলেন, অধিকাংশ সমস্যা কাস্টমসের মূল প্রক্রিয়ায় নয় বরং নোটিশ অব অ্যারাইভাল, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং আধুনিক ওয়্যারহাউজ ব্যবস্থার অভাবে সৃষ্টি হচ্ছে।