মানুষ যখন তার সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই কেনে, তখন সে কেবল ইট পাথরের দেয়াল কেনে না, কেনে এক টুকরো নিরাপত্তা। কিন্তু উত্তর আমেরিকার আবাসন খাতের অন্ধকার অলিগলিতে এমন কিছু অপরাধী চক্র বিচরণ করে, যারা সাধারণ মানুষের আজীবনের স্বপ্নকে পুঁজি করে গড়ে তোলে চুরির সাম্রাজ্য। এই হোয়াইট কলার অপরাধীরা কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করে না। তারা কলমের খোঁচায় নথিপত্র জাল করে এবং মার্জিত ব্যবহারের আড়ালে মানুষের পকেট কাটে। প্রথমে তারা সমাজের প্রভাবশালী স্তরে নিজেদের বিশ্বস্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তারপর আইনি জটিলতা আর সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে তিলে তিলে শুষে নেয় কোটি কোটি ডলার। টরন্টোর বুকে তেমনই এক কেলেঙ্কারির কেন্দ্রীয় নাম হয়ে ওঠেন মনজুর মোরশেদ খান, Channel Property Management নামের একটি কনডোমিনিয়াম ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালক।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কানাডার একাধিক সংবাদমাধ্যমে এই নাম ঘুরে ফিরে আসে। অভিযোগের সারাংশ ছিল কনডো বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। বহু ভবনের মালিক ও বোর্ড সদস্যদের অজান্তে কনডো কর্পোরেশনগুলোর নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে, নথি জাল করা হয়েছে, এবং একই সঙ্গে টেন্ডার ও মেরামত কাজের নামে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

টরন্টোর বাংলাদেশ কমিউনিটিতে মনজুর মোরশেদ খান পরিচিত ছিলেন একজন বিনয়ী, পরোপকারী এবং অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে। মাথায় টুপি, হাতে তসবিহ, এই ছিল তার পরিচিত অবয়ব। এমনকি তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইমরানুল হক, যিনি পেশায় একজন এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি কর্মী, তাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে এক লক্ষ ডলার ধার দিয়েছিলেন। ইমরানুল হক বলেন, “তিনি আমার জন্য মক্কা থেকে জমজমের পানি আর তসবিহ নিয়ে আসতেন। আমি বুঝতেই পারিনি এই ধার্মিক লোকটা আমার টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবে।” এই ‘ধর্মীয়’ আবরণের আড়ালেই ঢাকা পড়ে গিয়েছিল এক ধুরন্ধর অপরাধী মস্তিষ্ক।

মনজুর খানের জালিয়াতির কৌশল ছিল অত্যন্ত জটিল ও সুপরিকল্পিত। তদন্ত ও নথিপত্র পর্যালোচনায়, এবং বিভিন্ন অভিযোগে উঠে আসে তার অপরাধের প্রধান তিনটি স্তম্ভ।

১. নথি জালিয়াতি ও বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই ঋণ গ্রহণের অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, মনজুর খান বিভিন্ন কনডো ভবনের বোর্ড সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করতেন। ভুয়া মিটিং রেজুলেশন তৈরি করে তিনি ব্যাংকের কাছে দেখাতেন যে কনডো বোর্ড ভবন মেরামতের জন্য ঋণ নিতে সম্মত। এভাবে অন্তত ৯টি ভবনের নামে, বোর্ডকে অন্ধকারে রেখে, কোটি কোটি ডলারের ঋণ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

২. টেন্ডার ও মেরামত কাজের নামে ভুয়া কোম্পানি এবং ভুয়া বিলের অভিযোগ। এই ধারাটি শুধু অভিযোগ পর্যায়ে থেমে থাকেনি। ২০১২ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেওয়ানি মামলার আলোচনায় বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কনডো কর্পোরেশনকে এমন কাজের জন্য ইনভয়েস করা হয়েছিল, যা বাস্তবে করা হয়নি অথবা বোর্ড অনুমোদন দেয়নি। ওই মামলায় মনজুর খান এবং তার কয়েকটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণাজনিত ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের আদেশের কথা আইনজীবীদের একটি কনডো আইন বিষয়ক বুলেটিনে উল্লেখ রয়েছে। একই নথিতে আরও বলা হয়েছে, তিনি দেউলিয়া হয়ে পরে কানাডা ছেড়ে যান। ফলে অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা কার্যত ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

৩. আর্থিক নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করার অভিযোগ। কনডোর মেইনটেন্যান্স ফি, রিজার্ভ ফান্ড বা ঋণের অর্থ কোন অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে, তার ওপর বোর্ডের নজর শিথিল হলেই প্রতারকের জন্য বড় সুযোগ তৈরি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মনজুর খান বোর্ড সদস্যদের অজান্তে বিকল্প ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতেন, যার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে।

এই ঘটনার শিকার শুধু ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান নয়। শিকার হাজার হাজার সাধারণ কনডো মালিক। ২৫ গ্রেনভিল স্ট্রিট থেকে শুরু করে ২৩৬ অ্যালবিয়ন রোডসহ টরন্টো ও মিসিসাগার একাধিক ভবনের নাম আলোচনায় এসেছে। অনেক ভবনের মেইনটেন্যান্স ফি বেড়েছে। কোথাও ঋণের বোঝা মালিকদের ওপর গিয়ে পড়েছে। কোথাও আবার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে আস্থায়। কনডোর বাজারদর সময়ের সঙ্গে বদলায়, কিন্তু কোনো ভবনের নামের সঙ্গে জালিয়াতির ছায়া লেগে গেলে পুনর্বিক্রয়, মর্টগেজ, এমনকি মানসিক স্বস্তিতেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি হয়। দামের অঙ্ক পাল্টালেও ক্ষতির বাস্তবতা বদলায়নি, কারণ ধাক্কাটা পড়েছে আস্থায় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই জালিয়াতি ২০১১ সালে প্রকাশ্যে ধরা পড়লেও এর সতর্ক সংকেত দেখা গিয়েছিল আরও আগে। ২০০৭ সালেই একটি কনডো কর্পোরেশন তাকে জালিয়াতির অভিযোগে সরিয়ে দেয়। ওই সময় PCC 143–এর একজন পরিচালক প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার প্রমাণপত্র হাতে নিয়ে পুলিশের কাছে যান, স্থানীয় রাজনীতিবিদদের দ্বারস্থ হন, এমনকি ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ACMO–কেও লিখিতভাবে অবহিত করেন। কিন্তু পুলিশের ভাষ্য ছিল, তাদের কাছে মামলার চাপ এত বেশি যে তারা এই অভিযোগকে অগ্রাধিকার দিতে পারছে না। আর খাতের নিয়ন্ত্রক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলাফল হলো ভয়াবহ। পরবর্তী চার বছর মনজুর খান আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন, আরও বড় পরিসরে একই কৌশল প্রয়োগ করেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “বোর্ডে থাকলে বুঝবেন যে মাঝে মাঝে কনডো অ্যাক্টের বাইরে গিয়ে কাজ করতে হয় এবং ঘুষ (Graft) নেওয়া এই ব্যবসার সাধারণ নিয়ম।”

শেষ পর্যন্ত পুলিশ যখন আনুষ্ঠানিক তদন্তে নামে, তখন দেখা যায় মনজুর খান উধাও। পরে জানা যায়, টরন্টোর বিলাসবহুল বাসা ছেড়ে তিনি বাংলাদেশে চলে গেছেন। ২০১১ সালের শেষ দিকে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ছবিসহ বলা হয়, তিনি মাগুরায় নিজের পৈতৃক এলাকায় অবস্থান করছিলেন। একই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সেখানে তিনি ‘আশীর্বাদ’ নামে একটি বড় বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সেই প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়, মার্বেল পাথরে খচিত একটি বিশাল মসজিদ নির্মাণের কাজও তিনি শুরু করেছেন।

এদিকে Channel Property Management ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে এবং এক পর্যায়ে দেউলিয়া হয়ে যায়। প্রতারকের পাল্লায় পড়ে সে সময় বহু পরিবারের স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যায়। যথাযথ লাইসেন্সিং ও কঠোর তদারকি না থাকলে সাধারণ মানুষের জীবন যে কতটা অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে, এই ঘটনাই তার বড় প্রমাণ। মনজুর খান হয়তো আজ বাংলাদেশে অথবা অন্য কোথাও নিরাপদে আছেন, কিন্তু টরন্টোর বহু মালিকের ক্ষোভ, আর্থিক চাপ ও ভাঙা আস্থা তাকে ইতিহাসের পাতায় এক নিকৃষ্ট প্রতারক হিসেবেই চিহ্নিত করে রাখবে।

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর অন্টারিওতে কনডোমিনিয়াম খাতে নজরদারি কাঠামো শক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৫ সালে সরকার কনডোমিনিয়াম ম্যানেজমেন্ট সেবাকে লাইসেন্সিং ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় আনে। এরপর ২০১৭ সালে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়, যাতে ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে জবাবদিহি বাড়ে এবং এমন প্রতারণার ঝুঁকি কমে।

প্রিয় পাঠক, কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন জালিয়াতির শিকার হয়ে থাকলে আমাদের জানান। আপনার একটি বার্তাই নতুন কোনো প্রতারকের মুখোশ সময়মতো খুলে দিতে পারে। আমরা চাই সত্যকে সামনে আনতে এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে, যাতে আর কোনো পরিবার নিজের ঘরের স্বপ্ন হাতে নিয়ে আদালতের বারান্দায় অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে না থাকে।

তথ্যসূত্র:

CBC News (১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১)
The Toronto Star (১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১১)
Gardiner Miller Arnold LLP, Condo Alert Winter (2013)
Ontario e Laws, Condominium Management Services Act (2015)



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews