কিছু কিছু মানুষ আপ্যায়ন নামক কাজকে বিষবৎ ত্যাজ্য মনে করে। উল্টো ব্যাপারও হয়। সেটা খুবই কম। এই কমদের তালিকায় আছেন আমার প্রাক্তন সহকর্মী মোস্তফা চৌধুরী। ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার ভূমিপুত্র তিনি। নিজে খান আশ মিটিয়ে, অন্যদেরও স্বাদু খাবার খাইয়ে তৃপ্তি পান। বছর দশেক আগে মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় তাঁর সঙ্গে দেখা। করমর্দন করছি, অমনি শুরু টুপুরটাপুর বৃষ্টি। মোস্তফা প্রথমে জ্ঞান দেন, অকালবর্ষণের পানিতে ভিজলে নির্ঘাত হবে নিউমোনিয়া। এরপর দিলেন প্রস্তাব, চলেন ওই রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ি।

রেস্তোরাঁয় বিস্তর খাদক। লাঞ্চ টাইম তাই খাদকেরা গিজগিজ করছে। বসার জায়গা খুঁজছি। দাড়িমুখো এক যুবক এসে সহাস্যে বলে, দুই মিনিট স্যার। টেবিল খালি হতেই আপনাদের বসিয়ে দেব। মোস্তফা বলেন, ওই কোনার টেবিলটার ব্যবস্থা কর রমিজ। মুরগির ঝাল ফ্রাই, চিতলের কোপ্তা আর পাঁচমিশালি সবজি দিও আমাদের।

মাথা খারাপ! ঢুকেছি চা খাওয়ার আশায়। ইনি তো পেটে ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন খাদ্যগুদাম। স্নান বিনা মধ্যাহ্ন আহার গ্রহণে অনভ্যস্ত আমি আপত্তি জানাই। মোস্তফা বলেন, বিনা গোসলে এক দুপুুরে খানা খেলে কারও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়ে যায় না। তা ছাড়া নিজের খাদ্যবিধির পদতলে অন্যের গভীর আগ্রহকে পিষ্ট করাটা কখনোই মানবিক কর্ম নয়। ‘খাবো না/খেতেই হবে’ সংলাপ চলতেই থাকল। একপর্যায়ে তাঁর নাকে কষিয়ে ঘুষি মারার ইচ্ছে হয়েছিল। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ মিনিট পর মন চেয়েছে, তাকে লক্ষ টাকার তোড়া উপহার দিই।

জোর করে তিনি খাইয়েছিলেন বলেই আমাদের পিছনের টেবিলে বসা চার নাগরিকের চিন্তা-উদ্রেককারী বেশ কিছু কথা শুনতে পেয়েছি। চারজনের মধ্যে তিনজন ত্রিশোত্তীর্ণ; একজন পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন। তিনজনেরই ‘সোলেমান কাকা’ তিনি। নানরুটি আর সবজি খাচ্ছেন কাকা; মোরগ পোলাউ খাচ্ছেন ভাইপোত্রত্রয়। তাদের বলাবলির ধরন থেকে মনে হচ্ছে, প্রায়শ তারা দেশদুনিয়ার সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং তার প্রতিকারার্থে বাগ্যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে থাকেন। যাকে বলা হয়, ‘বয়সকালের বেহুদা আস্ফালন। উচ্চ ডালে বানর নাচন।’ বাঙালিমাত্রই এই প্রকার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ।

তোর প্রবলেমটা কী কামরান ক’ দেখি। বলেন সোলেমান, সুযোগ পেলেই খালি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে গালাগাল করে যাচ্ছিস। কেমন করে ভুলে থাকিস তুই নিজেও মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির প্রোডাক্ট। কামরানের জবাব, না কাকা। ভুলি না। মধ্যবিত্তরা ভয়ানক আত্মকেন্দ্রিক। নিজেরটা সে আঠারো আনা বুঝবে; অন্যেরটা দুই আনাও নয়। এদের সত্তা স্ববিরোধিতায় ভরপুর। এরা পাপকে ঘৃণা করে প্রকাশ্যে, পাপীকে প্রশ্রয় দেয় নীরবে। অনাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেয়, আবার মশার কামড় থেকে বাঁচতে ঘুমায় অনাচারের সুতোয় বোনা মশারির ভিতর। হাওয়াই আওয়াজ দিচ্ছি না সোলেমানকা। আপন পরিবারের ফাউল গেম দেখতে দেখতে যে এক্সপেরিয়ান্স গ্যাদার করেছি সেখান থেকে মাঝেমধ্যে দুই একটা বুদবুদ ছাড়ি, তাতেই আপনারা চিৎপাত হয়ে যান। হবেনই তো! ইউ আর অলসো আ ডাইরেক্ট প্রোডাক্ট অব দ্য গার্বেজ নেম্ড মিডল ক্লাস।

দেখলি রাজন! তর্কে না পেরে যারা মাথায় মুগুর মারে সেরকম করছে। বলেন সোলেমান কাকা, এক কাজ কর সাঈদ। ওরে তোদের বাড়ি নিয়ে যা। যমুনার তাজা বাঘাইড় মাছ খাওয়া। দেখবি ওর মাথা ঠান্ডা হয়ে গেছে।

২.

তিন ভাইপোর নাম যে কামরান, রাজন ও সাঈদ সেটা বোঝা গেল। মোস্তফা চৌধুরী আর আমি বসেছি তাদের দিকে পিঠ রেখে। কার নাম কী জানা গেল না। তবে তারা যে একেকজন নিবিড় পর্যবেক্ষক, তাতে সন্দেহ নেই। রাজন বলেন, কী যে কন না সোলেমান কা। ওরে নিব আমাদের বাড়ি! দেড় বছর আগে আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল। গিয়ে আমার তেরোটা বাজানোর বাকি রেখেছে।

অন্তরে যুদ্ধ বাইরে শুদ্ধরাজনের কাকা হরেন চক্রবর্তী নতুন ঘর তুলেছেন উঠোনের পূর্ব প্রান্তে। চারদিকে পাকা দেয়াল আর টিনের ছাউনির সুদৃশ্য সেই ঘরে বন্ধুকে থাকতে দেন রাজন। তাঁর কাকিমা ভাশুরপোর বন্ধুকে খুব আদর-যত্ন করেছেন। কথায় কথায় মহিলা জানান, নতুন ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। এক সন্ধ্যায় গল্প করার পর্যায়ে রাজনের কাকাকে কামরান বলেন, ম্যাজিকটা যদি আমায় শিখিয়ে দিতেন কাকা! হরেন বলেন, কোন ম্যাজিক বাবা? কামরান বলেন, ভূমি অফিসের কেরানির পোস্টের চাকুরে হয়ে দুই ছেলেকে ছাত্রাবাসে রেখে ভার্সিটিতে পড়ানোর খরচ জুগিয়ে, এক মেয়ের বিয়েতে ধুমধামের পিছনে ৩ লাখ খরচ করার পরও চমৎকার দালানবাড়ি তুলে ফেললেন। জাদুবিদ্যা বিনা তো এটা অসম্ভব।

গুরুজনদের সঙ্গে সদ্বংশীয়রা এভাবে কথা বলে! বিস্ময় প্রকাশ করেন হরেন চক্রবর্তী, ভয় হয় তোমার সঙ্গদোষে আমার ভাইপোও হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে। কামরান বলেন, সৎ বংশের সন্তানরা অসত্যের সাধক, এটাই বুঝি আপনার ধারণা! তাহলে কাকা ভুল ধারণাকে বুকে আগলে রাখছেন। রাজনকে নিয়ে আপনার গর্ব করা উচিত। কেননা কোদালকে কোদাল বলার সৎ সাহস ওর সঞ্চয়ে রয়েছে। এলাকায় আপনি বুক ফুলিয়ে বলতে পারেন, চক্রবর্তী বংশের মুখোজ্জ্বল করেছে রাজন। দ্য গ্রেট রাজন চকরবরতি মাই বিলাভেড নেফিউ!

রাজন কই গেলি? গর্জে ওঠেন হরেন চক্রবর্তী। হরেনপত্নী রান্নাঘর থেকে ছুটে আসেন কী হলো? ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছ কেন? রাজন বাড়ি নেই। ওর বন্ধুর জন্য দই কিনতে বাজারে গেছে। কামরানকে দেখিয়ে হরেন বলেন, এই ছেলে মনে করে আমার বাড়ি চোরের বাড়ি। তার মানে কী? তার মানে সে সাধুসজ্জন। রাজনকে বোলো কাল সকালে ওর আর ওর বন্ধুর ছায়াও যেন ঠাকুরবাড়ির আশপাশে না থাকে।

সকাল পর্যন্ত অপেক্ষার দরকার নেই কাকা। কামরান বলেন, রাতেই চলে যাব। অনাকাক্সিক্ষত অতিথি হওয়ার রুচি আমার নেই। আরেকটা কথা। এ বাড়িকে আমি চোরের বাড়ি বলিনি। বলেছেন আপনি। মধ্যবিত্তরা এরকমই করে। তারা কোনো কোনো সময় নিজের অজান্তেই নিজের দোষ কবুল করে ফেলে।

ব্যাগ গোছাতে শুরু করেন কামরান। হরেনপত্নী বলেন, না খেয়ে যেও না বাবা। অতিথি না খেয়ে গেলে গৃহস্থের অকল্যাণ হয়। কামরান বলেন, স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণে নরকবাস হয় না? এ পর্যায়ে এগিয়ে এলেন হরেন। বলেন, তোমার পছন্দের তপসে মাছ রান্না করা হয়েছে। এ তোমার খেতেই হবে।

৩.

আমার জেলা শহরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছেলেমেয়েদের অঙ্ক আর ইংরেজি শেখাতেন ‘সাদা স্যার’ মানে খলিল মাস্টার। তাঁর রোজগার বিস্তর। তাঁর মাথার চুল সাদা, পরনে ট্রাউজার আর শার্ট সাদা, পায়ের জুতো সাদা, এমনকি তাঁর হাতঘড়ির ব্যান্ডও সাদা। খলিলুর রহমান কখনোই স্কুলে পড়াননি। তাঁর কাছে অঙ্ক আর ইংরেজি শিখে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা মুগ্ধকর ফল করত। এসএসসি পরীক্ষার আগে পিতৃ আগ্রহে আমাকে তিনি মাস তিনেক অঙ্ক শেখানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। প্রথম মাসেই বুঝে গেছেন, এরে শেখানোর চাইতে কাঁঠালগাছে পেয়ারা ফলানো সোজা।

খলিলুর রহমান একদিন বলেন, মধ্যবিত্ত পরিবারে রক্তে অঙ্ক। চলনে অঙ্ক। বলনে অঙ্ক। স্বভাবে অঙ্ক। মধ্যবিত্তের সন্তান অঙ্কে কাঁচা হওয়া দুঃখজনক। শুধু কাঁচা হলে ক্ষতি নেই। সে অঙ্কের ভয়ে দৌড় দিয়ে গিয়ে তালগাছের ডগায় বসতে রাজি। মধ্যবিত্তের আরেকটা গুণ, আসলে বলা উচিত ‘মহাগুণ’ হচ্ছে নিজেকে দুনিয়ার সেরা ভাবা এবং প্রচার করা যে প্রতিভায় সেরা হওয়া সত্ত্বেও বঞ্চনার শিকার হয়েছে সে। ষড়যন্ত্রীরা প্যাঁচ কষে তাকে তার প্রাপ্য থেকে শতহস্ত দূরে রেখেছে।

‘শোনো মিয়া। অঙ্কে লেটার মার্কস পাওয়া মানে অঙ্কে সেরা হওয়া নয়। ইস্ট পাকিস্তানের যেসব বাসিন্দা টাকাভর্তি বালিশে মাথা রেখে দিনরাত পার করছেন খোঁজ নিলে দেখবে স্কুল জীবনে তাঁদের অনেকেরই গণিত পরীক্ষায় টেনেটুনে পাস মার্ক হাসিল করতে গিয়ে আলজিভ খসে পড়ার দশা হয়েছে। সো ডোন্ট গেট নার্ভাস অ্যান্ড মুভ দ্য বল উইথ স্ট্রং কিক টু স্কোর অ্যান একসিলেন্ট গোল।’-পরামর্শ দিলেন খলিল স্যার। তাঁর নাতি (মেয়ের ছেলে) সুলতান আহমেদ ছিলেন মধ্যবিত্তদের কুকীর্তির সরস বর্ণনা দানের সনিষ্ঠ শিল্পী।

জামালপুর শহরে সুলতান আহমেদ সরকারি চাকরি করতেন। সেখানে ১৯৭৮ সালে তাঁর সঙ্গে দেখা। আমার সঙ্গে আরও দুই সংবাদজীবী ছিলেন। দুপুরে তাঁর বাসায় দাওয়াত করে খাওয়ালেন। ওই সময় সুলতান বলেন : নানাজান বলতেন ভণ্ডামিতে মধ্যবিত্তদের যে প্রতিভা ত্রিভুবনে নাইকো তাহার তুলনা। দৃষ্টান্তস্বরূপ তিনি পৈতৃক সম্পত্তির ভাগাভাগি  নিয়ে বারো বছর ধরে ভাই-ভাই কলহের একটি ঘটনা শোনান। সুপাত্রে ছোট ভাইয়ের মেয়ের বিবাহ-উদ্যোগ তিনবার পণ্ড করে দেয় বড় ভাই। চতুর্থ উদ্যোগ সফল হয়। কন্যা বিদায়কালে ভাইজিকে জড়িয়ে ধরে বড় চাচার কান্নায় বিয়েবাড়ির বাতাস ভারী হয়ে গেল।

মেহমানদের একজন বলেন, ভদ্রলোকের বিশুদ্ধ স্নেহ-মমতা দেখে চোখের পানি ধরে রাখা মুশকিল। আরেক মেহমান বলেন, আপনি জানেন কাঁচকলা। কনের বড় চাচার উপরটা দেখতে ভালা/ভিতরটা আগাগোড়া কয়লার ছালা।

৪.

সুলতান সেদিন মধ্যবিত্ত বিষয়ে মজাদার অনেক কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে খাসা ছিল নিজের কর্মবিমুখতার স্বপক্ষে মধ্যবিত্তের ক্ষুরধার যুক্তি উপস্থাপন। এ ক্ষেত্রে সুলতানের এক ফুফা তাবরিজ হাশিমকে ‘নায়ক’ বলা যায়।

অবিরাম মেহনত ছাড়া উন্নতি হয় না-এটা জঘন্য মিছা। বলতেন তাবরিজ, রিকশাচালক প্যাডেল ঘোরানোর কাজে যেরকম মেহনত করে, বিনিময়ে কী উন্নতি হচ্ছে তার? দ্রুত গতি হওয়ার জন্য ‘নিরামিষ খাও’ বুদ্ধি যারা দিচ্ছে তারা কী খরগোশ দেখে না। নিরামিষভোজী খরগোশের গতিবেগ দারুণ বটে। কিন্তু তার আয়ু? মাত্র পাঁচ বছর।

আর দেখ কচ্ছপের জীবনাচার। বলেন তাবরিজ, ব্যাটা একটুও মেহনত করে না। ঘুমায় আর খায়। তার ধীরগতি তো প্রবাদব্যাংকের অক্ষয় স্বর্ণমুদ্রা। অথচ সে বেঁচে থাকে ১৫০ থেকে ৪০০ বছর পর্যন্ত।

তাবরিজের মতো যুক্তি দেখাতেন বিখ্যাত নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। তাঁর বাবা বলেছিলেন সূর্যোদয়ের আগে ভোরে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করলে সৌভাগ্য হয়। সেদিন ভোরে রাস্তায় মোহরভর্তি পুঁটলি পেয়েছেন আমার এক বন্ধু। হোজ্জা বলেন, হ্যাঁ, তোমার বন্ধুর জন্য ওটা সৌভাগ্য। ভোরে হাঁটতে গিয়ে রাস্তায় পুঁটলিটা যার হারিয়েছে তার জন্য তো ওটা বিরাট দুর্ভাগ্য।

♦ লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews