দশ দিন আগে ধান কেটে আঁটি বেঁধে স্তুপ করে রাখা হয়েছিল। বৃষ্টির কারণে এগুলো মাড়াই করা সম্ভব হয়নি। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার খয়রত গ্রামের কৃষক মো: ইসরাইল মিয়া (৭৮) পচে যাওয়া আঁটি থেকে চারা গজানো ধান ঝেড়ে আলাদা করার চেষ্টা করছিলেন। যদি শুকিয়ে কিছু চাল পাওয়া যায়, এই আশায়।
তার ছেলে এবার সাত কানি (৩৫ শতাংশে কানি) জমিতে বোরো আবাদ করেন। এর মধ্যে চার কানি জমির ধান পানির নিচে পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। তিন কানি জমির ধান কোনোরকমে কাটতে পারলেও এগুলোই বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে।
ইসরাইল মিয়া বলেন, ‘দু’দিন ধইরা একটু রইদ দেহা যাইতাছে, শেষ চেষ্টা কইরা দেহি, যদি কিছু ধান শুকায়া ভালা করন যায়। কয়েকদিনের খোরাক তো অইবো।’
১০ থেকে ১২ দিন টানা বৃষ্টির পর গত মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জের হাওরে রোদ ওঠে। বুধবার দুপুর পর্যন্ত রোদ থাকে, পরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত রোদ ছিল।
সকালে ইসরাইল মিয়া এ প্রতিবেদকের গ্রামের বাড়ির সামনে পচে যাওয়া ধান ঝাড়ছিলেন।
পাশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ। দু’দিনের রোদে সেখানেও কৃষকদের ধান শুকানোর কর্মব্যস্ততা। কোন সময় বৃষ্টি নেমে যায় দুশ্চিন্তায় কৃষক। এর মধ্যেই এসে ঋণের চাপ দিচ্ছে এনজিওর কর্মীরা।
কথা হয় কৃষক শিবির আহমেদের সাথে। তিনি চার কানি জমি বর্গা নিয়ে বোরো চাষ করেন।
দুই কানি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বাকি দুই কানি জমির পচা ধান বিদ্যালয় মাঠে শুকানোর চেষ্টা করছিলেন।
শিব্বির আহমেদ বলেন, ‘এনজিও থেকে কিস্তিতে ঋণ আইন্না খেতগুলো করছিলাম। দুই কানি ক্ষেত কাটাইতে এ মাসে আমার ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়া গেছে। হাতে এখন টাকা-পয়সা নাই। কাজ করার মধ্যেই এনজিওর লোক আয়া ঋণের কিস্তির চাপ দিতাছে।’
পাশে থাকা তার স্ত্রী হেনা আক্তার বলেন, ‘পপি এনজিও থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ আনছিলাম। প্রতিমাসে ১১ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। প্রতিমাসের ২০ তারিখের মধ্যে ঋণের কিস্তি দিতে হয়। কিন্তু এ মাসে আগেই তাগদা দেয়া শুরু করছে। বুধবারে আয়া কইয়া গেছে আগামী রোববারের মধ্যে যেভাবেই হোক কিস্তি দিয়া দিতে হইবো। এখন কেমনে আমরা কিস্তি দিয়াম। পোলাপানরে খাওনই দিতাম পারতাছি না। হেরার তো এইটা বুঝার দরকার আছিন।’
বিদ্যালয়ের মাঠে ধান নাড়ছিলেন চায়না বেগম। তাদেরও চার কানি জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কিছু জমির ধান আনতে পেরেছেন। স্বামী হাবিবুর রহমান ও ছেলের বউ পূর্ণিমাকে নিয়ে সেগুলোই শুকাচ্ছিলেন মাঠে।
চায়না বেগম বলেন, ‘পপি থেকে ৯৫ হাজার টাকা ঋণ আনছিলাম। আর ডিএসকে থেকেও ৯৫ হাজার টাকা ঋণ করছি। দুইডারই মাসে সাড়ে ১০ হাজার টাকা করে কিস্তি। আজকে পপির লোক আইছিল। বইলা গেছে, আগামী রোববারের মধ্যে যেভাবেই হোক কিস্তির টাকাডা রেডি রাখতে হইব। আর দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে (ডিএসকে) কিস্তি সোমবারে। এহন কিভাবে যে কিস্তি দিয়াম বুঝতাছি না। এক-দুইডা মাস সময় দিতো আমরারে। আমরা কিছুডা আসান পাইতাম। গরীবরার লাগি কেউ নাই। সরকারও এ অত্যাচার দেহে না।’
বিকেলে আকাশ কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল। হালকা বৃষ্টি পড়া শুরু হয়ে গেছে। এর মধ্যেই বার বার বজ্র চমকাচ্ছে। তাড়াহুড়া লেগে গেল বিদ্যালয় মাঠের ধান-খড় গুটানোর।
বিদ্যালয়ের বারান্দায় কথা হয় কৃষক আব্দুল বাকির সাথে। তার চার কানি জমির মধ্যে তিন কানি জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনিও ঋণে জর্জরিত।
তার স্ত্রী বেদেনা আক্তারের নামে দুই এনজিও থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ঋণ তুলেছেন তিনি। এর মধ্যে সোসাইটি ফর সোসাল সার্ভিস (এসএসএস) থেকে ৯০ হাজার টাকা ও দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে) থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তুলেন। এসএসএসের সাড়ে নয় হাজার টাকা মাসিক কিস্তি নেয়ার জন্য বৃহস্পতিবার লোক আসবে। আর ডিএসকের এ মাসের সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার কিস্তি আগামী সোমবারের মধ্যে দিয়ে দিতে হবে।
অন্য সময় মাসের শেষে কিস্তি নিলেও এবার এনজিওর কর্মীরা অগ্রিম তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে কিস্তির টাকা রেডি রাখার জন্য।
এ বিষয়ে কথা হয় গ্রামীণ ব্যাংক করিমগঞ্জ উপজেলার গুনধর ব্রাঞ্চের ম্যানেজার জাকির হোসেন সরকারের সাথে। তিনি বলেন, ‘তাদের প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদায়ের শীতিলতার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তবুও তারা চেষ্টা করছেন কৃষকের হাত থেকে যেন ঋণের কিস্তি দিতে না হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একটি প্রতিষ্ঠান। মানুষের উন্নয়ন নিয়ে আমাদের কাজ। গুনধর ইউনিয়নে বর্তমানে আমাদের চার কোটি টাকা মাঠ পর্যায়ে আছে। যারা ঋণ নেয় তারা প্রতি কিস্তির সাথে কিছু টাকা আমাদের ব্যাংকে জমা রাখে। এখন যেহেতু হাওরে কৃষকের দুর্যোগ যাচ্ছে, আর গুনধর ইউনিয়ন যেহেতু হাওর অধ্যুষিত ইউনিয়ন, আমরা কৃষকদের বলব তাদের জমানো টাকা থেকে যেন আমাদের কিস্তির টাকাটা দেয়।’