মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেন ইরানের ওপর একটি সম্ভাব্য হামলা শানিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। গত ২৮ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতি তার হুমকির মাত্রা সাংঘাতিক মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরান যদি তার একগুচ্ছ শর্তে রাজি না হয়, তাহলে তিনি ‘দ্রুত এবং সহিংসভাবে হামলা চালাতে পারেন। এই হুমকিকে আরো জোরালো করতে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ ডেস্ট্রয়ার, বোমারু বিমান এবং ফাইটার জেটগুলোকে ইরানে সহজেই আঘাত হানতে পারে—এমন দূরত্বের মধ্যে মোতায়েন করেছে পেন্টাগন।
ইরানের নেতৃত্বের সামনে মার্কিন প্রশাসন যে দাবিদাওয়া তুলে ধরেছে, তার মধ্যে প্রধান হলো, দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। এছাড়া ব্যালিস্টিক মিসাইল উন্নয়ন সীমিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রক্সি গ্রুপগুলো, তথা হামাস, হিজবুল্লাহ এবং হুতিদের প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ট্রাম্প দৃশ্যত চলমান মুহূর্তটিকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন, যাতে দুর্বল অর্থনীতি এবং জানুয়ারির শুরু থেকে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিশাল বিক্ষোভের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়া তেহরানকে আরো চাপে ফেলা যায়।
ইরানের ‘থ্রেশহোল্ড' শিক্ষা: যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন নিশ্চিত নয়। কারণ, ইরান এমন কোনো ভঙ্গুর রাষ্ট্র নয় যে দ্রুত ভেঙে পড়বে। ৯৩ মিলিয়ন জনসংখ্যা এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাসম্পন্ন দেশটির একটি স্তরীভূত নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং এমন সব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা সংকট মোকাবিলায় বেশ সক্ষম। তাছাড়া সরকারের সামরিক শাখা ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কয়েক লাখ সদস্য তো আছেই।
৪৭ বছরের শাসনামলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানি সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। তাছাড়া নেতৃত্বের যে কোনো পরিবর্তনে সবকিছু রাতারাতি বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজেও এটি স্বীকার করেছেন; গত ২৮ জানুয়ারি আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, সরকার পতন হলে কী ঘটবে, তার ‘কোনো সহজ উত্তর নেই'। তিনি আরো বলেন, 'কেউ জানে না, কে ক্ষমতা গ্রহণ করবে'। নির্বাসিত বিরোধী নেতারা বিভক্ত এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন; ফলে এত বড় এবং বিভক্ত একটি দেশ শাসন করার সাংগঠনিক ক্ষমতা তাদের নেই।
এমন একটি অনিশ্চয়তার মধ্যেই বিপদ লুকিয়ে আছে! এর কারণ, ইরান একটি ‘থ্রেশহোল্ড স্টেট' বা প্রান্তিক স্তরে উপনীত একটি রাষ্ট্র। এটি এমন এক দেশ, যার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু এখনো উৎপাদনের শেষ সীমাটি অতিক্রম করেনি। এ ধরনের অস্থিতিশীল প্রান্তিক রাষ্ট্র তিনটি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এক. পারমাণবিক উপাদান ও বিজ্ঞানীদের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ হারানো; দুই. বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে প্রযুক্তি রপ্তানি বা বিক্রির সুযোগ তৈরি হওয়া; তিন. রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার আগেই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দৌড়ে নামার প্রবণতা।
ইতিহাস কী বলে?: ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় নিখোঁজ পারমাণবিক উপাদানের হদিস নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির জনক হিসেবে পরিচিত 'এ কিউ খান নেটওয়ার্ক' প্রমাণ করেছে যে, প্রযুক্তি হাতবদল হয়—যেমন, পাকিস্তানের খানের ক্ষেত্রে, যা উত্তর কোরিয়া, লিবিয়া ও ইরান অবধি পৌঁছে গিয়েছিল।
হামলা যে শিক্ষা দেয়: সরকার পরিবর্তন হোক বা না হোক, যে কোনো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ বৈশ্বিক পারমাণবিক বিস্তারের ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলে। ইরানের প্রান্তিক রাষ্ট্র বা থ্রেশহোল্ড স্তরে থাকা ছিল একটি কৌশলগত সংযমের বিষয়; কিন্তু ২০২৫ সালের জুনে যখন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাল, তখন সেই হামলা এবং ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি এই স্পষ্ট বার্তা দিল যে, প্রান্তিক স্তরে অবস্থানের বিষয়টি নিরাপত্তার কোনো নির্ভরযোগ্য গ্যারান্টি দেয় না।
পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা থাকা অন্য দেশগুলোর জন্য এই বার্তাটি অত্যন্ত কঠোর। তাছাড়া এটি গত তিন দশকের বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতাকে সামনে আনে। লিবিয়া ২০০৩ সালে পশ্চিমের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কের বিনিময়ে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করেছিল। অথচ তার ঠিক আট বছর পরই ন্যাটোর বিমান হামলায় দীর্ঘকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন ঘটে। অন্যদিকে, ইউক্রেন ১৯৯৪ সালে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের কাছ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাসে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার ত্যাগ করেছিল। অথচ ২০ বছর পর ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে এবং ২০২২ সালে পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু করে।
এখন সেই তালিকায় ইরান যুক্ত হতে পারে। দেশটি প্রান্তিক স্তরে সংযম প্রদর্শন করেছিল, তবু ২০২৫ সালে মার্কিন বোমার আঘাতে আক্রান্ত হয়েছে এবং এখন আবারও হামলার মুখে। এই শিক্ষাটি ইরানের প্রবীণ উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মদীর নজর এড়ায়নি। ২৭ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় টিভিতে তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের দাবিগুলোর অর্থ হলো 'নিজেকে নিরস্ত্রীকরণ করা, যাতে তারা যখন খুশি আপনাকে আঘাত করতে পারে।’ যুক্তিটি হলো, যদি পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করলে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়, অস্ত্র ত্যাগ করলে আগ্রাসনের শিকার হতে হয় এবং প্রান্তিক স্তরে থাকলে সামরিক হামলার শিকার হতে হয়, তাহলে প্রকৃত নিরাপত্তা কেবল পারমাণবিক অস্ত্র থাকার মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে বা কাজ অসমাপ্ত রেখে তা সম্ভব নয়। ইরানি নেতৃত্ব যদি কোনোভাবে মার্কিন হামলার পর টিকেও যায়, তারা নিশ্চিতভাবেই তাদের অস্ত্র কর্মসূচিতে দ্বিগুণ শক্তি প্রয়োগ করবে।
আইএইএর গ্রহণযোগ্যতা: একটি দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার লক্ষ্যে মার্কিন সামরিক হুমকি বা হামলা পারমাণবিক বিস্তার রোধে গঠিত আন্তর্জাতিক কাঠামোকেও দুর্বল করে। ইসরাইল ও মার্কিন হামলার আগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ঠিকঠাক কাজ করছিল—তারা শনাক্তকরণ ও যাচাইকরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। ইরানের ওপর তাদের নজরদারিই প্রমাণ করে যে, পরিদর্শন ব্যবস্থা কার্যকর। কিন্তু সামরিক হামলা বা হামলার বিশ্বাসযোগ্য হুমকি পরিদর্শকদের দূরে সরিয়ে দেয় এবং 'নিয়ম মেনে চললেই যে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না”, সেই সংকেত পাঠায়।
নিয়ম মানলে যদি কোনো সুরক্ষাই না পাওয়া যায়, তাহলে নিয়ম মানার প্রয়োজন কী? অর্থাৎ, আইএইএর গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর আস্থাই এখন ঝুঁকির মুখে।
ডমিনো ইফেক্ট: পারমাণবিক বিকল্প নিয়ে ভাবছে, এমন প্রতিটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই লড়াই পর্যবেক্ষণ করছে। ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব তাদের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষার কথা গোপন রাখেনি। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে সৌদি আরবও করবে।
অর্থাৎ, ইরানে মার্কিন হামলা ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করার বদলে বরং বিচলিত করে তুলতে পারে। উপসাগরীয় নেতারা মনে করতে পারেন যে, মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের অংশীদারদের জন্যই সংরক্ষিত। আর যদি মার্কিন সুরক্ষা সবার জন্য সমান না হয়, তাহলে স্বভাবতই নিজের নিরাপত্তা নিজে নিশ্চিত করাই হবে যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া।
উদাহরণস্বরূপ, পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা মার্কিন অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে একটি বিকল্প ব্যবস্থা। এছাড়া তুরস্কও সময়ে সময়ে স্বাধীন পারমাণবিক সক্ষমতার ইঙ্গিত দিয়ে আসছে। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, এই অঞ্চলের অন্যদের থাকলে তুরস্কের কেন পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না? অর্থাৎ, ইরানের ওপর আক্রমণ তুরস্ককে নিজস্ব অস্ত্র কর্মসূচির দিকে ঠেলে দিতে পারে। আর তাতে করে এই পারমাণবিক ঢেউ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতেই থেমে থাকবে না। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান মূলত মার্কিন নিরাপত্তার ওপর ভরসা করে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রয়েছে। তবে ইরান অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে 'মার্কিন নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা' সিউল এবং টোকিওকেও বিকল্প ভাবতে বাধ্য করবে।
এক নতুন পালটা ব্যবস্থা?: আরব উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো এই ঝুঁকিগুলো বোঝে। আর এ কারণেই তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে সামরিক পদক্ষেপ না নিতে অনুরোধ করেছে—যদিও তেহরান তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ।
আমেরিকার নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ইতিমধ্যেই চাপের মুখে। এ অবস্থায় যদি উপসাগরীয় দেশগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাতে করে মার্কিন হুমকি আমেরিকাকে এই অঞ্চলে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এটি বিশ্বের প্রতিটি উদীয়মান পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাষ্ট্রকে এই শিক্ষাই দেবে যে, একমাত্র পারমাণবিক বোমা থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
লেখক : ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক
দ্য কনভারসেশন থেকে সংগৃহীত; ইংরেজি থেকে অনূদিত