১ আগস্ট ২০২৬, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন গর্বের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বাধুনিক সশস্ত্র বাহিনীগুলোর অন্যতম গণমুক্তি ফৌজের (পিপলস লিবারেশন আর্মিÑ পিএলএ) প্রতিষ্ঠার ৯৯তম বার্ষিকী উদযাপন করেছে। চীনের জনগণের কাছে পিএলএ দিবস হলো এক গৌরবোজ্জ্বল ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন, যেদিন তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখ-তা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন রক্ষায় আত্মনিবেদিত কর্মকর্তা ও সৈনিকদের অবদান, ত্যাগ ও দেশপ্রেমকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। কিন্তু আমার কাছে এই দিনটির তাৎপর্য আরও গভীর ও ব্যক্তিগত। প্রতি বছরের পিএলএ দিবস আমাকে গণমুক্তি ফৌজের কর্মকর্তা ও সৈনিকদের সঙ্গে প্রায় চার দশকের বন্ধুত্ব, পেশাগত সম্পর্ক এবং বহু অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
চীনের সঙ্গে আমার যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে আমি চীনা ভাষা অধ্যয়নের জন্য বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটিতে (বিএলসিইউ) পৌঁছাই। সে সময় আমি কল্পনাও করিনি যে, চীনা ভাষা শেখার সিদ্ধান্তটি আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পরিণত হবে। এই ভাষা শুধু আমাকে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতাকে জানার সুযোগই দেয়নি, বরং চীনের জনগণ ও গণমুক্তি ফৌজের সঙ্গে আজীবন বন্ধুত্ব গড়ে তোলার দ্বারও উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
এরপর গত প্রায় চার দশকে আমি চীনের বহু প্রদেশ ও নগরী সফরের সুযোগ পেয়েছি। প্রতিটি সফরেই আমি একটি দেশকে আরও আধুনিক, আরও সমৃদ্ধ, আরও উদ্ভাবনী এবং আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে দেখেছি। এই অভূতপূর্ব রূপান্তরের পাশাপাশি আমি প্রত্যক্ষ করেছি গণমুক্তি ফৌজের ধারাবাহিক আধুনিকায়ন, যা আজ একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং ক্রমবর্ধমানভাবে পেশাদার সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
একজন সামরিক কর্মকর্তা এবং চীন অধ্যয়নকারী হিসেবে আমি প্রায়ই চীনের এই অসাধারণ অগ্রগতির পেছনের কারণগুলো নিয়ে ভাবি। বিভিন্ন গবেষক এর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে পারেন, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যÑ দূরদর্শী জাতীয় নেতৃত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা, জাতীয় নীতির সুশৃঙ্খল বাস্তবায়ন, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, চীনা জনগণের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং শক্তিশালী দেশপ্রেমবোধ। একই সঙ্গে, চীনের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য যে নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ অপরিহার্য ছিল, তা নিশ্চিত করতে গণমুক্তি ফৌজের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ছাড়া কোনো দেশই দীর্ঘস্থায়ী জাতীয় উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতির সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে আধুনিকায়নের প্রতিটি ধাপে গণমুক্তি ফৌজও দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে রূপান্তরিত করেছে। একসময় প্রধানত স্থলবাহিনীকেন্দ্রিক এই বাহিনী আজ স্থল, নৌ, আকাশ, সাইবার, মহাকাশ এবং তথ্যভিত্তিক যুদ্ধক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে পরিচালিত হতে সক্ষম একটি যৌথ সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই আধুনিকায়ন প্রতিফলিত করে চীনের সেই দৃঢ় অঙ্গীকারকে, যার লক্ষ্য জাতীয় সার্বভৌমত্ব, উন্নয়নগত স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করার পাশাপাশি আধুনিক যুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া।
গণমুক্তি ফৌজের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কখনোই কেবল একাডেমিক পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ ছিল না। সামরিক জীবনে আমি বাংলাদেশ ও চীনের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের বিভিন্ন বৈঠকে দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য অর্জন করেছি। এসব দায়িত্ব আমাকে গণমুক্তি ফৌজের কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলাবোধ এবং সৌজন্য খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দিয়েছে। আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে সরকারি সফরে আগত গণমুক্তি ফৌজের তৎকালীন চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ, জেনারেল ঝাং ওয়াননিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ। যদিও আমাদের আলাপচারিতা ছিল সংক্ষিপ্ত, তবুও তাঁর আত্মবিশ্বাস, বিনয় ও পেশাদারিত্ব আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সে সময় তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন যে, বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্ব চিরকাল অটুট থাকবে। তিন দশকেরও বেশি সময় পরে আজ আমি বিশ্বাস করি, ইতিহাস তার সেই কথার যথার্থতাই প্রমাণ করেছে।
সেই সফরের আরেকটি অবিস্মরণীয় স্মৃতি হলো চীনা সামরিক প্রতিনিধিদলের সম্মানে আয়োজিত সরকারি নৈশভোজে দোভাষীর দায়িত্ব পালন। বক্তব্য প্রদানকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম. নূর উদ্দিন খান মন্তব্য করেছিলেন যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অনেক দিক থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত একটি ক্ষুদ্র গণমুক্তি ফৌজ। এই মন্তব্য সে সময়কার ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতারই প্রতিফলন ছিল, যখন বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চীনের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হয়েছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি দুই বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে গড়ে ওঠা গভীর পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক ছিল।
১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে (ডিএসসিএসসি) এক বছর মেয়াদি কোর্সে অংশগ্রহণের সময় গণমুক্তি ফৌজ সম্পর্কে আমার উপলব্ধি আরও গভীর হয়। গণমুক্তি ফৌজের স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর তিনজন কর্মকর্তা আমার সহপাঠী ছিলেন। পুরো একটি বছর আমরা একসঙ্গে বসবাস করেছি, অধ্যয়ন করেছি এবং প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এর মাধ্যমে আমরা পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছি, একে অপরের কাছ থেকে শিখেছি এবং এমন এক বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছি, যা সামরিক জীবন শেষ হওয়ার পরও অটুট রয়েছে।
সেই বন্ধুত্বগুলোর একটি আজও অটুট রয়েছে আমার সাবেক কোর্সমেট লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) জিউ হাইইয়ানের সঙ্গে। আমরা দুজনই সক্রিয় সামরিক জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেছি, তবুও আমাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আমাদের এই বন্ধুত্ব এক অর্থে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করে তোলা জনগণের সঙ্গে জনগণের এবং সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কেরই প্রতীক। আমি জানি, চীনে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী কিংবা গণমুক্তি ফৌজের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একত্রে অধ্যয়নের সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশের আরও অনেক সামরিক কর্মকর্তার অভিজ্ঞতাও প্রায় একই রকম। এ ধরনের বন্ধুত্ব খুব কমই সরকারি ঘোষণাপত্রে স্থান পায়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অংশীদারিত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিগুলোর একটি হয়ে নীরবে কাজ করে।
গণমুক্তি ফৌজের ৯৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনে আমি কেবল একজন অবসরপ্রাপ্ত বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তা হিসেবেই নয়, বরং এমন একজন মানুষ হিসেবেও চীনের বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিয়েছি, যার জীবন চীনের সঙ্গে কয়েক দশকের বন্ধুত্বে সমৃদ্ধ হয়েছে। আমার অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে, সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মধ্যে প্রকৃত বন্ধুত্ব শুধু আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; এটি গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, পেশাগত উৎকর্ষ, সাংস্কৃতিক উপলব্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সম্পর্কের ভিত্তির ওপর।
গণমুক্তি ফৌজের সূচনা ১৯২৭ সালের ১ আগস্ট নানচাং অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। গত নিরানব্বই বছরে এটি একটি বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী থেকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর সামরিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই দীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল যাত্রাপথে গণমুক্তি ফৌজ চীনের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে তার ভূমিকা পালন করে এসেছে এবং একই সঙ্গে পরিবর্তিত কৌশলগত বাস্তবতা ও উদীয়মান প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে ধারাবাহিকভাবে অভিযোজিত করেছে।
আজকের গণমুক্তি ফৌজ সেই বাহিনী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যাকে আমার মতো বহু বিদেশি সামরিক কর্মকর্তা কয়েক দশক আগে প্রথম দেখেছিলেন। আধুনিক যুদ্ধ ক্রমশ যৌথ সামরিক অভিযান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সক্ষমতা, মহাকাশভিত্তিক সম্পদ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, মানববিহীন ব্যবস্থা, দূরপাল্লার নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা, সমন্বিত লজিস্টিক ব্যবস্থা এবং তথ্যগত শ্রেষ্ঠত্বের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে চীন তার ইতিহাসের অন্যতম বিস্তৃত সামরিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট এবং একই সঙ্গে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) চেয়ারম্যান শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে গণমুক্তি ফৌজ একটি আধুনিক, পেশাদার, সুশৃঙ্খল এবং তথ্যভিত্তিক ও বুদ্ধিমত্তানির্ভর যুদ্ধজয়ে সক্ষম সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সামরিক ও অসামরিক দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালনের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব সংস্কারের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর পার্টির নেতৃত্ব আরও সুদৃঢ় হয়েছে, কমান্ড কাঠামো আধুনিকায়িত হয়েছে, যৌথ অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ জোরদার হয়েছে এবং সামরিক বাহিনীর সব শাখায় বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ত্বরান্বিত হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর একটি হলো পূর্ববর্তী সামরিক অঞ্চলভিত্তিক ব্যবস্থার পরিবর্তে যৌথ সামরিক অভিযানকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে থিয়েটার কমান্ড কাঠামো প্রবর্তন। পাঁচটি থিয়েটার কমান্ড স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং অন্যান্য সহায়ক বাহিনীর সক্ষমতাকে সমন্বিত করে পরিকল্পনা ও অভিযান পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এটি এই উপলব্ধিরই প্রতিফলন যে, ভবিষ্যতের সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন বাহিনীভিত্তিক কার্যক্রমের পরিবর্তে সব ধরনের সামরিক সক্ষমতার মধ্যে নির্বিঘœ সমন্বয় অপরিহার্য।
গণমুক্তি ফৌজের স্থলবাহিনী জনবলনির্ভর একটি বাহিনী থেকে অধিক গতিশীল, দ্রুত মোতায়েনযোগ্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। আধুনিক সাঁজোয়া যান, দূরপাল্লার গোলন্দাজ সক্ষমতা, আর্মি এভিয়েশন, বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিট, মানববিহীন ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল কমান্ড নেটওয়ার্ক ক্রমেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংখ্যাগত শক্তির পরিবর্তে এখন অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে গুণগত উৎকর্ষ, পেশাদারিত্ব এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল সক্ষমতার ওপর।
গণমুক্তি ফৌজের নৌবাহিনী (পিএলএএন) বিশ্বের নৌবাহিনীগুলোর মধ্যে অন্যতম বিস্ময়কর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। অতীতে উপকূলীয় প্রতিরক্ষাকেন্দ্রিক দায়িত্ব পালনের সীমা অতিক্রম করে এটি আজ উন্নতমানের ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট, সাবমেরিন, উভচর আক্রমণ জাহাজ, পুনরায় রসদ সরবরাহকারী জাহাজ এবং বিমানবাহী রণতরীসমৃদ্ধ একটি আধুনিক ব্লু-ওয়াটার নৌবাহিনীতে পরিণত হয়েছে। এডেন উপসাগরে জলদস্যুবিরোধী অভিযানে অংশগ্রহণ এবং মানবিক সহায়তা ও নাগরিকদের উদ্ধার কার্যক্রমে এর সক্রিয় ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিম-লে এর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিরই প্রমাণ বহন করে।
একইভাবে গণমুক্তি ফৌজের বিমানবাহিনী (পিএলএএএফ) উন্নত যুদ্ধবিমান, কৌশলগত পরিবহন বিমান, আকাশপথে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা, সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ক্রমশ উন্নততর মানববিহীন আকাশযানসমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত সক্ষম আধুনিক বিমানবাহিনীতে পরিণত হয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষার পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলা, মানবিক সহায়তা এবং যৌথ সামরিক অভিযানে বিমানশক্তির ভূমিকা আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের কৌশলগত প্রতিরোধ সক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পিএলএ রকেট ফোর্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সাম্প্রতিক সাংগঠনিক সংস্কারের ফলে তথ্য সহায়তা, সাইবার অপারেশন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং অন্যান্য উদীয়মান ক্ষেত্রে সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গণমুক্তি ফৌজের আরেকটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় দিক হলো মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতি এর বিশেষ গুরুত্বারোপ। আধুনিক সামরিক সক্ষমতা শুধু অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে উচ্চশিক্ষিত কর্মকর্তা, দক্ষ জুনিয়র কমিশন্ড ও নন-কমিশন্ড কর্মকর্তা, পেশাদার সৈনিক এবং যোগ্য বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের ওপর। সামরিক শিক্ষা, প্রতিরক্ষা গবেষণা, নিজস্ব প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণে চীনের ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষ অর্জনের প্রতি তার দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ।
চীন জাতীয় প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের জন্য তার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যসমূহও প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৭ সালে গণমুক্তি ফৌজের শতবর্ষ পূর্তিকে সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জনের পরিকল্পনা এবং পরবর্তী বছরগুলোতে সামগ্রিক সামরিক আধুনিকায়নকে আরও এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার। এসব লক্ষ্য চীনের সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নগত স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি চীন যে তার প্রতিরক্ষা নীতিকে মূলত আত্মরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করে, তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জাতীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গণমুক্তি ফৌজ আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলদস্যুবিরোধী অভিযান এবং সামরিক কূটনীতিতে ক্রমবর্ধমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শান্তিরক্ষী প্রেরণের ক্ষেত্রে চীন অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী দেশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সৈন্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ সম্মান অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতি এই অভিন্ন অঙ্গীকার আমাদের দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ ও পেশাগত সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
চীন ধারাবাহিকভাবে ‘এক-চীন নীতি’র প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে আসছে এবং তাইওয়ান প্রণালির উভয় পাড়ের শান্তিপূর্ণ পুনঃএকত্রীকরণের প্রতি তার সমর্থনের কথা জানিয়ে থাকে। একই সঙ্গে চীন তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে উৎসাহিত করে বলে বিবেচিত যেকোনো কর্মকা-ের বিরোধিতা করে। তাইওয়ান প্রশ্ন চীনের অন্যতম মৌলিক জাতীয় স্বার্থের বিষয় এবং এটি গণমুক্তি ফৌজের কৌশলগত পরিকল্পনার বিভিন্ন দিককে প্রভাবিত করে চলেছে। আন্তর্জাতিক পরিম-লে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও, গণমুক্তি ফৌজের চলমান আধুনিকায়নের প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হলে চীনের সরকারি অবস্থান সম্পর্কে অবগত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে আমি গভীর পেশাগত আগ্রহ নিয়ে এসব উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ করে আসছি। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রতিটি সামরিক প্রতিষ্ঠানকেই ধারাবাহিকভাবে নিজেদের রূপান্তরিত হতে হয়। প্রতিটি দেশের নিজস্ব কৌশলগত বাস্তবতা থাকলেও, গণমুক্তি ফৌজের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে দূরদর্শী নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, যৌথ সামরিক সক্ষমতা, সুশৃঙ্খল বাস্তবায়ন, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরে। এগুলো এমন কিছু সর্বজনীন শিক্ষা, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের সামরিক পেশাজীবীদের জন্যই মূল্যবান হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও গণমুক্তি ফৌজের এই বিবর্তন অধিকতর পেশাগত সম্পৃক্ততার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সামরিক শিক্ষা, কমান্ড ও স্টাফ প্রশিক্ষণ, শান্তিরক্ষা মিশনের প্রস্তুতি, সামরিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, লজিস্টিকস, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তাসহ বহু ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিনিময় ও সহযোগিতা সম্প্রসারণ আগামী বছরগুলোতে গণমুক্তি ফৌজ এবং বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যকার পেশাগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
লেখক: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক পদাতিক কর্মকর্তা, বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটি (বিএলসিইউ) থেকে চীনা ভাষায় স্নাতক, উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেডের মহাসচিব, ঝোং মেং চাইনিজ একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা এবং দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্ব ও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক উন্নয়ন গবেষক।