ডায়াবেটিস এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোটি মানুষের ডায়াবেটিস রয়েছে, এদের অনেকেই জানেন না যে তারা এই রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ বা কারও কারও ইনসুলিন গ্রহণ যেমন জরুরি, তেমনি সঠিক খাদ্যাভ্যাসই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি। এটি নিরাময়যোগ্য রোগ নয়, তবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য।


বাংলাদেশে ডায়াবেটিস এখন একটি নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই বাড়ছে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা। একসময় মনে করা হতো এটি শুধু বয়স্কদের রোগ, কিন্তু এখন তরুণ, কিশোর এমনকি শিশুদের মধ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিস দেখা যাচ্ছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো-সুষম খাদ্য, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিন। এর মধ্যে খাদ্যাভ্যাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিদিন আমরা যা খাই, তা সরাসরি রক্তের গ্লুকোজের মাত্রাকে প্রভাবিত করে।


অনেকের ধারণা, ডায়াবেটিস হলেই ভাত, রুটি বা শর্করা একেবারেই ছেড়ে দিতে হবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন শুধু ওষুধ খেলেই হবে, খাবারের দিকে নজর দেওয়ার দরকার নেই। বাস্তবে-দুটো ধারণাই ভুল।


ডায়াবেটিস রোগীর খাবারের মূলনীতি ঃ ডায়াবেটিস রোগীর জন্য কোনো "বিশেষ খাবার" নেই। পরিবারের অন্য সদস্যরা যে স্বাস্থ্যকর খাবার খান, ডায়াবেটিস রোগীকেও সেটাই খেতে হবেÑতবে সঠিক পরিমাণে এবং সঠিক সময়ে।


তাই খাবারের মূলনীতি হলো- পরিমিত ক্যালোরি, নিয়মিত সময়ে খাওয়া, পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার, কম চিনি, পরিমিত শর্করা, পর্যাপ্ত প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, পর্যাপ্ত পানি।প্লেট মডেল: সবচেয়ে সহজ নিয়ম ঃ বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত "ডায়াবেটিস প্লেট মডেল" অনুসরণ করলে খাবার নির্বাচন সহজ হয়।একটি ৯-১০ ইঞ্চি প্লেট কল্পনা করুন। 


 প্লেটের অর্ধেক (৫০%) হবে শাকসবজি। যেমন- লাউ, পুঁইশাক, পালং, লালশাক, ডাঁটা শাক, করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, ঢেঁড়স, মিষ্টিকুমড়া (পরিমিত), শসা, টমেটো। 


 প্লেটের এক-চতুর্থাংশ (২৫%) হবে শর্করা। যেমন- ভাত, আটার রুটি, লাল চাল, ব্রাউন রাইস, ওটস, ভুট্টা, আলু (সীমিত)।


 প্লেটের এক-চতুর্থাংশ (২৫%) হবে প্রোটিন। যেমন- মাছ, মুরগি, ডিম, ডাল, ছোলা, মসুর, মুগ, রাজমা, সয়াবিন, চর্বিহীন গরুর মাংস (সীমিত), খাবারের সঙ্গে অল্প পরিমাণ স্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহার করা উচিত।
সারাদিনের খাবারের সময়সূচি ঃ সকালের নাস্তা (সকাল ৭-৮টা)। 


 একটি বিকল্প- ২টি আটার রুটি, একটি সেদ্ধ ডিম, শাকসবজি, চিনি ছাড়া দুধ বা চা। অথবা ওটস, দুধ, সামান্য বাদাম, মধ্যসকালের নাস্তা, একটি আপেল, অথবা একটি কমলা, অথবা একটি নাশপাতি, অথবা শসা। 


 দুপুরের খাবার- প্লেটের অর্ধেক সবজি, এক-চতুর্থাংশ ভাত, এক-চতুর্থাংশ মাছ/মুরগি/ডাল, সালাদ।


 বিকেলের নাস্তা- ভাজা ছোলা, চিনি ছাড়া দই, বাদাম (এক মুঠোর কম)।


 রাতের খাবার - দুপুরের মতোই। তবে রাতের খাবার ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে শেষ করা ভালো।
ফল খাওয়া যাবে?
অবশ্যই যাবে। ফল বন্ধ করা উচিত নয়। ফলে রয়েছে- ভিটামিন, মিনারেল, আঁশ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, তবে পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব ফল ভালো- খুব মিষ্টি নয় এমন আপেল, নাশপাতি, কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, জাম, ড্রাগন ফল, স্ট্রবেরি, পেঁপে, কিউই।
সীমিত পরিমাণে- আম, কলা, আঙুর, লিচু, কাঁঠাল, তরমুজ, আনারস ইত্যাদি। তবে একবারে অনেক ফল না খেয়ে অল্প করে দিনে ১-২ পরিবেশন যথেষ্ট।


ফলের জুস কেন নয়?

 জুস করলে আঁশ নষ্ট হয়।

 খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বেড়ে যায়।

 তাই সম্পূর্ণ ফল খাওয়াই উত্তম।

কোন সবজি বেশি খাবেন? বাংলাদেশে সহজলভ্য-করলা, লাউ, পটল, ঝিঙা, পালং, পুঁই, মুলা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শসা, টমেটো, ঢেঁড়স, বেগুন, কচুশাক। এসব যত বেশি খাবেন তত ভালো।
 আলু কি খাওয়া যাবে? যাবে। তবে পরিমাণ কমাতে হবে। আলু খেলে ভাতও কমাতে হবে। 
 মিষ্টি কুমড়া? সীমিত। কারণ এতে শর্করা রয়েছে। 
 ডাল কি নিরাপদ? হ্যাঁ। ডালে রয়েছে- প্রোটিন, আঁশ, আয়রন, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
 বাদাম, উপকারী- কাঠবাদাম, আখরোট, চিনাবাদাম (লবণ ছাড়া), তবে অতিরিক্ত নয়।  দুধ- লো-ফ্যাট দুধ ভালো।
 মিষ্টি দই নয়। চিনি ছাড়া টক দই ভালো।কোন খাবার সীমিত রাখবেন -সফট ড্রিংক, কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক, মিষ্টি, রসগোল্লা, জিলাপি, কেক, পেস্ট্রি, বিস্কুট, চকলেট, চিনি, গুড় (বেশি), মধু (বেশি) শর্করা কি একেবারে নিষিদ্ধ?না। এটি একটি বড় ভুল ধারণা। শর্করা শরীরের প্রধান শক্তির উৎস। মস্তিষ্কও প্রধানত গ্লুকোজ ব্যবহার করে। তাই শর্করা একেবারে বাদ দেওয়া উচিত নয়। বরং-
 সঠিক পরিমাণে
 সঠিক সময়ে
 কম গ্লাইসেমিক সূচকের শর্করা খাওয়া উচিত।


একেবারে শর্করা না খেলে কী হতে পারে? অনেকে দ্রুত ওজন কমানোর আশায় ভাত-রুটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। এতে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
১. দুর্বলতা - শরীর পর্যাপ্ত শক্তি পায় না।
২. মাথা ঘোরা- বিশেষ করে যারা ইনসুলিন বা কিছু ডায়াবেটিসের ওষুধ খান।
৩. হাইপোগ্লাইসেমিয়া- রক্তে শর্করা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। লক্ষণ- ঘাম, কাঁপুনি, ক্ষুধা, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
৪. পেশি ক্ষয়- শরীর শক্তির জন্য পেশি ভাঙতে শুরু করে।
৫. কোষ্ঠকাঠিন্য- অনেক সময় আঁশও কমে যায়।
৬. কিটোসিস- এটি একটি মারাত্মক জটিলতা। অত্যন্ত কম শর্করাযুক্ত খাদ্যে শরীর চর্বি ভাঙে এবং কিটোন তৈরি হয়। বিশেষ করে

টাইপ-১ ডায়াবেটিস বা ইনসুলিনের ঘাটতি থাকলে বিপজ্জনক ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অত্যন্ত কম শর্করাযুক্ত খাদ্য শুরু করা উচিত নয়।
 ভাত খাওয়ার সঠিক নিয়ম- একবারে পাহাড়সম ভাত নয়, ছোট প্লেট ব্যবহার করুন, বেশি সবজি খান, মাছ বা ডাল যোগ করুন, ধীরে ধীরে খান। 
 রান্নার ভালো পদ্ধতি- সেদ্ধ, ভাপে, গ্রিল, কম তেলে রান্না। 
 এড়িয়ে চলুন- ডিপ ফ্রাই, বারবার গরম করা তেল, অতিরিক্ত ঘি, অতিরিক্ত মাখন। 
 পানি- প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন (চিকিৎসক যদি কিডনি বা হৃদ্রোগের কারণে আলাদা নির্দেশনা না দিয়ে থাকেন)। 
 ব্যায়াম- খাবারের পাশাপাশি সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম। সপ্তাহে ২-৩ দিন শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে না থাকা।
 বিশেষ সতর্কতা- যাদের কিডনি রোগ, লিভারের রোগ, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, বয়স্ক রোগী, শিশু, ইনসুলিন ব্যবহারকারী তাদের খাদ্যতালিকা অবশ্যই চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
 ডায়াবেটিস রোগীর ১০টি প্রচলিত ভুল ধারণা
১. ভাত একেবারে খাওয়া যাবে না।
২. ফল খাওয়া নিষিদ্ধ।
৩. মধু নিরাপদ।
৪. শুধু চিনি বাদ দিলেই হবে।
৫. ডায়াবেটিক বিস্কুট যত খুশি খাওয়া যায়।
৬. ওষুধ খেলেই খাদ্য নিয়ন্ত্রণ দরকার নেই।
৭. বাদাম ক্ষতিকর।
৮. ডাল খেলে শর্করা বাড়ে।
৯. গুড় নিরাপদ।
১০. ব্যায়াম ছাড়া শুধু খাদ্যে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এসব ধারণার বেশিরভাগই ভুল।


সরকার ও জনগণের করণীয় ঃ ডায়াবেটিস মোকাবিলায় প্রয়োজন-
 জনসচেতনতা
 স্বাস্থ্যকর খাদ্যনীতি
 স্কুলে পুষ্টি শিক্ষা
 নিয়মিত স্ক্রিনিং
 হাঁটার উপযোগী পরিবেশ
 পরিবারকেও রোগীকে সহযোগিতা করতে হবে।


পানি কত পান করবেন?
পর্যাপ্ত পানি পান করুন। তবে কিডনি বা হৃদরোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
তাই বলা যায়, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ওষুধ, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাদ্যের সমন্বয়। শর্করা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া নয়, বরং সঠিক পরিমাণে গ্রহণ করাই বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। প্লেটের অর্ধেক শাকসবজি, এক-চতুর্থাংশ শর্করা এবং এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন-এই সহজ নিয়ম মেনে চললে অধিকাংশ মানুষ রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে, ওজন কমাতে এবং হৃদ্রোগ, কিডনি রোগ ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সক্ষম হবেন।
সচেতন খাদ্যাভ্যাসই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ।


ডা. জহুরুল হক সাগর
সহকারী অধ্যাপক,
নবজাতক-শিশু-কিশোর মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
হলি কেয়ার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনোস্টিক সেন্টার,
জিয়া সরনী, শনির আখরা, কদমতলি, ঢাকা।
ফোন: ০১৮৯১৯৮৪৬৭০: ০১৩৩৫১৩৬৯১০।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews