মি: জসিম (ছদ্ম নাম) মালয়েশিয়ার কারখানায় কাজ করেন ২০১৬ সাল থেকে। প্রথম মূল বেতন ছিলো ১৫০০ রিঙ্গিত। সে দেখতে ছিল হালকা পাতলা, নিজেও সংশয়ে ছিল যে এসব কাজ করতে পারবে কি না! কারণ বাংলাদেশে এ ধরনের কাজের দেখার কোনো সুযোগ নেই, কলকারখানা নেই। অজানা, অনভিজ্ঞতা ও অদক্ষতাকে সাথী করে মালয়েশিয়ায় পেনাং এ খ কারখানায় কাজ যোগ দেয়।

তিনি বলেন, প্রথমে অনেক কষ্ট হয়েছে। কাজ, কাজের পরিবেশ, নতুন জায়গা, দেশ থেকে অনেক দূরে, পরিবার আত্মীয় স্বজন কেউই নাই। এসব ভাবলে খুব খারাপ লাগত, মাঝে মাঝে মনে হতো এখান থেকে পালিয়ে দেশে চলে যাই। বাবা মা ভাইবোনের কথা মনে করে নিরবে কেঁদেছি। কিন্তু কাজ করতে এসে পালিয়ে যাওয়া এই কোম্পানির সাথে বেইমানি করা হবে, আমি মুসলমান, আমি বেইমানি করতে পারি না। আল্লাহর উপর ভরসা করে থেকে যাই।

প্রথমে কোম্পানিতে সে ৮ ঘণ্টা কাজ এরপর ২/৩ ঘণ্টা ওভার টাইম করে। কাজের প্রেসার সহ্য করা কঠিন ছিল। মি: জসিম বলেন এত কাজ জীবনেও করিনি। ভাবতাম এইরকম কাজ যদি দেশে করতাম তাহলে দেশেই আমি স্বাবলম্বী হতাম। আসলে কাজের কোনো বিকল্প নাই, সৎ হতে হবে। আমি যদি এই কারখানা থেকে পালিয়ে অন্য কোথাও যেতাম তাহলে কি আজ যে আমি লাইন ম্যানেজার হয়েছি, বেতন মাসে ৩৫০০/৪০০০ রিঙ্গিত মাসে মাসে পাচ্ছি সেটা কি পেতাম? কারণ এখান থেকে লোভে পরে কয়েকজন পালিয়ে অন্য কোথাও গিয়েছে কিন্তু আমার থেকে ভালো নেই। ওরা দৌড়ের উপরে আছে। তাদের মধ্যে একজন এরেস্ট হয় জেল খেটে এখন দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। আর বাকি দুজন কোথায় আছে জানি না।

সাধারণত ভালো কাজ, বেশি বেতন, ভালো আবাসন সুবিধা ইত্যাদির কথা এক ধরনের লোক আছে ওরা ভাগিয়ে নিয়ে যায়। তারপর সেই পলাতক কর্মীর নামে পুলিশ রিপোর্ট ও ইমিগ্রেশনে রিপোর্ট করে কোম্পানি, এর সাথে কোম্পানির জিনিস চুরি করা ইত্যাদি যোগ হলে অনেক কঠিন আইনি জটিলতা তৈরি হয়। তাদেরকে গ্রেফতার হতে হয়, ৩/৫ মাস জেল, আর্থিক জরিমানা এবং ২/৩ টি বেত্রাঘাত শাস্তি পেতে হয়। বেত্রাঘাত শাস্তি খুবই কঠিন এই শাস্তি জীবনী শক্তি কমিয়ে দেয়। তাছাড়া জেলখানার পর ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয় দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য। একসময় ফ্লাইট টিকিট পেলে নিজ দেশে ফেরত পাঠায়। এভাবে বৈধ কোম্পানি থেকে পালিয়ে যাওয়া, কিছু দিন এখানে সেখানে লুকিয়ে থেকে কাজ করা, একসময় গ্রেফতার, জেল, এবং ডিটেনশন সেন্টারে অপেক্ষা সব মিলিয়ে জীবন দেখে ১/২ বছর চলে যায় এবং তখন জীবন প্রকৃত নরকে পরিণত হয়।

মিস্টার জসিম বলেন, লোভ করতে গিয়ে বিপদে পড়ে। এমন লোভের দরকার নেই। এতে যে লোভে পরে তার কোনো লাভ হয় না বরং যারা পালিয়ে যাওয়ার লোভ দেখায় তারাই লাভবান হয়। মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশনের বিভিন্ন সময়ের সংবাদ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বৈধ নিয়োগকর্তা বা কোম্পানি থেকে যারা পালিয়ে যায় তারা আরেকটি চক্রের মধ্যে পরে, এই চক্র পরবর্তীতে তাদের বন্দী করে রাখে, তাদের চলাফেরা, খাওয়া সব কিছু কন্ট্রোল করে, এদের পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে ডকুমেন্ট বিহীন করে, ফলে প্রথমে চেক করলে এরা কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে পারে না এবং নদী পথে না আকাশ পথে অবৈধভাবে না বৈধভাবে এসেছে কোনো কিছুই নির্ণয় করা যায় না। তখন তাদের এরেস্ট করে তদন্তে নেওয়া হয়।

তদন্তে অনেকে দুঃখের কথা বলে কিন্তু করার কিছুই থাকে না, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। যারা এরেস্ট হয় না তাদের ১/২ জনকে নকল কাগজ ভিসা ধরিয়ে দেয়, এটিও একসময় ধরা পরে। মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন সময় নকল পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরি করে এমন গ্যাংদের গ্রেফতার করেছে। সম্প্রতি মানব পাচারের ইকবাল গ্যাং কে মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন ধরেছে। গ্লোবাল লেবার অর্গানাইজেশনের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান, ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, যে কাউকে প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধ করা এটি মানব পাচারের অপরাধ, শ্রম শোষণের অপরাধ। মালয়েশিয়া পুলিশ ও ইমিগ্রেশনের তথ্য অনুযায়ী এ ধরনের মালয়েশিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকরা অপরাধমূলক কাজগুলো করে সাধারণত দেশী বিদেশি ব্যক্তিরা মিলে।

ইমিগ্রেশনের তথ্য মতে সব থেকে বেশি শিকার হয়েছেন বাংলাদেশের কর্মীরা এবং এদের প্রত্যেকের পিছনে মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশীরা আছে। তাদের কারণে শিক্ষক, এক্সপাট, শিক্ষার্থী এবং বৈধভাবে কাজ করা লক্ষ লক্ষ ভালো মানুষগুলো সমস্যার শিকার হচ্ছে, তাদের চেক এর মুখে পড়তে হয়, হয়রানি হয় ইত্যাদি। তানাগানিতা মালয়েশিয়ায় অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সব থেকে পুরোনো এনজিও যাদের নিকট হাজারো দুঃখের কাহিনী জমা আছে।

তেমনি নর্থ সাউথ ইনিশিয়েটিভ যারা অভিবাসী কর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে, তাদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে, বাংলাদেশী কর্মীদের বিপদে পরার অর্থাৎ শ্রম শোষণের এবং মানব পাচারের একটি পদ্ধতি ছিল আউট সোর্সিং যেটাকে বাংলাদেশে ফ্রি ভিসা বলে থাকে। এই ফ্রি ভিসায় একসময় বাংলাদেশ থেকে কর্মী এনে নিজেদের দখলে একধরনের বন্দী করে রাখত, কাজ ও আবাসন দেবার জন্য টাকা নিতো, বেতনের একটি অংশ কেটে নিত এমনকি বাংলাদেশির বাড়ি থেকেও টাকা আনতে বাধ্য করত।

এসব একসময় খুব বাজে অবস্থায় গেলে মালয়েশিয়া সরকার বাধ্য হয় শুধু বাংলাদেশীদের জন্য সেই ফ্রি ভিসা বা আউট সোর্সিং নিষিদ্ধ করে। নর্থ সাউথ ইনিশিয়েটিভ এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও কো ফাউন্ডার আদ্রিয়ান পেরেইরা বলেন, আমরা দেখেছি যে আউট সোর্সিং বন্ধ হলেও বাংলাদেশ থেকে কর্মী এনে আসল নিয়োগকর্তার অধীনে না দিয়ে কৌশলে নিজেদের দখলে বা বন্দিত্বে রাখে। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী এটি গুরুতর অপরাধ, কর্মী অবৈধ হয় এবং সে সব সময় রিস্কের উপর থাকে।

বিভিন্ন মিডিয়ায় এবং সংবাদে মূলত এদের যারা অবৈধ হয়েছে তাদের করুন কাহিনী তুলে ধরা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো এই কর্মীরা জানেনা যে, ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী এটি যে অপরাধ তারা জানেই না, তাদেরকে কেউ বলেই নি! যদি তারা জানত তাহলে নিজেরা এমন ফাঁদে পা দিত না।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা যারা সুরক্ষিত অবস্থায় কর্মী প্রেরণের বন্দোবস্ত করে তারা কি মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশনের এই আইন সম্পর্কে জানে? তিনি আরো বলেন, উভয় দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী প্রেরিত কর্মী অর্থাৎ বাংলাদেশের নাগরিককে তার দেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তর মালয়েশিয়ার এসব আইন কানুন বিধি বিধান সম্পর্কে ধারণা দিবে এমন অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু মালয়েশিয়ায় আসা কর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায় তাদেরকে এসব কখনোই বলা হয় নি! এটি বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য খুবই দুঃখের ব্যাপার যা তাদের সাথে প্রতারণার মতো।

তিনি আশা করেন যে, এরপর যাদের প্রেরণ করা হবে তাদের অন্তত মালয়েশিয়ার হালনাগাদ আইন কানুন নিয়ম সম্পর্কে ভালো করে বুঝিয়ে দিবে। যেন মালয়েশিয়ায় আসার আগেই বুঝতে পারে যে মানব পাচার ও শ্রম শোষণের ও নির্যাতনের মধ্যে পরতে যাচ্ছে কি না। এটি নাগরিকের অধিকারও বটে। মিস্টার জসিম যাকে দিয়ে শুরু করা হয়েছে তিনি ৯টি বছর পার করেছেন, হেংলা পাতলা শরীর বেশ তাগড়া হয়েছে।

তিনি বলেন মালয়েশিয়ার খাবার বেশ ভালো, রাস্তার পাশে যে খাবার পাওয়া যায় সেগুলোও স্বাস্থ্যসম্মত কোনো সমস্যা হয় না। আমি ভাত খেয়ে বড় হয়েছি এখানে এসে সেই ভাত, সবজি, মাছ, মাংস খাচ্ছি। নিজের ইচ্ছেমত রান্না করে খাই, কোম্পানি কখনোই নিষেধ করে না। বরং তারাও মাঝে মাঝে আমাদের সাথে খায়। আমরা দেশে থাকা মায়ের মত অত ভালো রান্না করতে পারি না কিন্তু যেটুকু পারি সেটাই ওরাও পছন্দ করে। জসিম বড় বড় কোম্পানির নিজস্ব বড় হোস্টেল আছে সেখানে তো আরো ভালো ব্যবস্থা শুধু খাবারের সময় গিয়ে খাওয়া, যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের মতো। শুনেছি অনেক কোম্পানিতে বাংলাদেশী বাবুর্চি রাখা হয়েছে। আবাসন নিয়ে মালয়েশিয়ার আইন আছে যে, ঘরের আয়তন, টয়লেট, রান্না, ফ্যান, বিদ্যুৎ কেমন হতে হবে এমন স্ট্যান্ডার্ড সেট করে দেওয়া আছে। মালবাহী কনটেইনার এ কর্মী রাখা একদম নিষিদ্ধ। আগে এরুম কন্টেইনারে কর্মীদের মানবেতর অবস্থায় রাখা হতো সেটি মালয়েশিয়া সরকার নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্থায়ীভাবে  কন্টেইনারে রাখতে হলে বিশেষ নির্মাণ সেক্টরে সরকারের অনুমোদন নিতে হয় এবং সেই কন্টেইনারে অবশ্যই এসি থাকতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে মালয়েশিয়া সরকার সেগুলো বন্ধ করে দেয় এবং কোম্পানিকে শাস্তি দেয়। বেশ কয়েকবছর ধরে লেবার ডিপার্টমেন্ট কাজ করছে এমন কি মাঝে মাঝে মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রীকেও আবাসন নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়। বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। মিঃ জসিম বলেন, থাকার জন্য কোনো টাকা লাগে না, শুধু বিদ্যুৎ বিল এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার জন্য নাম মাত্র টাকা নেয়। কর্মীর নিকট থেকে এ ধরনের অর্থ নিতে মালয়েশিয়ার আইন অনুযায়ী লেবার ডিপার্টমেন্ট এর নিকট থেকে লিখিত অনুমতি নিতে হয়। মিস্টার জসিম বলেন সব মিলিয়ে মাসে ১০ রিঙ্গিত করে নেয়। তবে অনেক কোম্পানি এই ১০ রিঙ্গিতও নেয় না, একদম ফ্রি। কিন্তু যারা কোম্পানি থেকে পালিয়ে যায় বা এজেন্ট অন্য কোথাও নিয়ে যায় তারা এসব কোনো সুবিধাই পায় না, বরং সব কিছু নিজের টাকায় করতে হয়।

বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে যে, মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের নিকট থেকে মেডিকেল বিল পাওনা আছে, এমন অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও পাওনা আছে তাদের নিয়ে মাঝেমধ্যে স্বাস্থ্য দপ্তর মিটিং করে। বাংলাদেশের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হয় যে, আইন ও চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশী কর্মীর মেডিকেল বীমা থেকে এই টাকা আদায় করতে হবে, কর্মী নিজ থেকে টাকা দিবে না। আবার অনেকে চিকিৎসা নিতে কোনো হাসপাতালে ভর্তি হলে তার নিয়োগকর্তাকে না পেয়ে সরাসরি হাইকমিশনে পত্র ও বিল প্রেরণ করে। তখন হাইকমিশন খুজতে গিয়ে দেখে যে ওই রুগীর বৈধতা নেই, পালিয়ে গেছে, নিয়োগকর্তা পুলিশ রিপোর্ট করেছে অর্থাৎ তার আইনগত যে সকল সুবিধা ছিল সব বাতিল হয়ে গেছে এখন সব ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা হয়েছে। এমন কি যে বা যারা ওকে এমন বিপদে ফেলেছে তাদেরও খোঁজ মিলে না। ফলে সে একধরনের পরিত্যক্ত অবস্থায় হাসপাতালে পরে থাকে। তখন তার বাড়িতে যোগাযোগ করে কিছু টাকা আনার ব্যবস্থা করা হয়, স্থানীয় কমিউনিটির কেউ কেউ পাশে দাঁড়ায় এবং সরকার থেকেও বিল দেওয়া হয়।

কিন্তু অনেকে চিকিৎসার একপর্যায়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায় তখন বিল বাকি হয়ে যায়। এভাবে দিনের পর দিন বিল বকেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। ফলে সাধারণ বৈধ যারা বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী কর্মী, শিক্ষক, স্টুডেন্ট, এক্সপাট তারাও চিকিৎসা নিতে গিয়ে সেই সন্দেহের চোখে পরে বা অনেক ক্লিনিক ও হাসপাতাল চিকিৎসা দিতে রাজি হয় না।

মিস্টার জসিম তার অভিজ্ঞতায় বলেন, আমি অসুস্থ হলে কোম্পানির ডাক্তার আছেন তিনি দেখেন, তিনি রেফার্ড করলে হাসপাতালে ভরতি করে এবং ইন্সুরেন্স থেকে বিল দেয় এমন কি যে কয়দিন কাজ করতে পারে না সেই কয় দিনের টাকাও ইন্সুরেন্স কোম্পানি দিয়ে থাকে। ফ্রি চিকিৎসা তো পেয়েছি উল্টো যে কয়দিন কাজ করতে পারিনি তার টাকাও দিয়েছে। নর্থ সাউথ ইনিশিয়েটিভ এর মিস্টার আদ্রিয়ান পেরেইরা  বলেন, কতজন বাংলাদেশী দেশ ত্যাগ করার আগে এই ব্যাপারগুলো সম্পর্কে জানে? আমাদের জরিপে দেখেছি একজনও এসব সম্পর্কে জানতে পারে নি! তাদের শুধু চিকিৎসা নয় দুর্ঘটনা বীমা আছে যা ৭x২৪ অর্থাৎ সার্বক্ষণিক করা হয়েছে। রাস্তায় বা বাড়িতে যদি দুর্ঘটনার শিকার হয় বীমা থেকে সুবিধা পাবে। এবং সকসো তো আজীবন সুবিধা দিচ্ছে। মরে গেলে লাশ প্রেরণের খরচ দিচ্ছে।

মিঃ জসিম বলেন, তার কোম্পানিতে একজন দুর্ঘটনায় মারা গেলে সেই কর্মীর লাশ বিনা খরচে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে এবং কোম্পানি নিজ তহবিল থেকে তার পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা দিয়েছে এবং বিমা থেকেও ৭০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছে সেই ভাইয়ের পরিবার। আর সকসো থেকে খোঁজ করে তার স্ত্রীর জন্য আজীবন পেনশন, নাবালক সন্তানের জন্য টাকা দিচ্ছে মাসমাস। করোনা সময় থেকে মালয়েশিয়া সরকার সামাজিক সুরক্ষার আওতায় বিদেশি কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করে দেশী কর্মীদের সমান সুযোগ দিচ্ছে। এসব প্রাপ্তির শর্ত হলো বৈধভাবে নিয়োগকর্তার অধীনে কর্মরত থাকতে হবে।

মিস্টার জসিম. বলেন, সমস্যা হলো কর্মী যেমন দেশ থেকে আসার আগেই এসব সম্পর্কে জানে না তেমনি মালয়েশিয়াতেও কিছু এজেন্ট আছে তারা এসব তোয়াক্কা না করে কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। ফলে দুর্দশাগ্রস্ত কর্মীরা কিছুই পায় না। মালয়েশিয়া সরকারের উচিত প্রতিটি কোম্পানিতে গিয়ে কর্মীদের কল্যাণের বিষয়গুলো চেক করা। কারণ সরকার  এ সুবিধা বিদেশি কর্মীদেরকেও দিয়েছে , যারা মালয়েশিয়ার অর্থনীতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করে। মালয়েশিয়ার সামাজিক সুরক্ষার আওতায়  বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে বসে একজন ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে এবং আজীবন পাবে। তার কাহিনী ছিল অন্যরকম অর্থাৎ তাকে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছিল এবং এর পিছনে ছিল এক বাংলাদেশী এজেন্ট। এ নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। বিশেষ করে অভিবাসী সাংবাদিক মোহাম্মদ আলীর বদান্যতায় বাংলাদেশ হাইকমিশন বিষয়টি জানতে পারে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সিডেন্ট অর্থাৎ কর্মকালীন দুর্ঘটনায় শিকার হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। সে রকম দুর্ঘটনায় প্রবাসী পাবনার মো. দেলোয়ার হোসেন (৩২) এখন আজীবন পাচ্ছে পেনশন সুবিধা। বাম হাত হারিয়ে ফেলেন। একে তো হাত গেছে তার উপর কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া ছাড়াই সংশ্লিষ্ট এজেন্সি তাকে দেশে প্রেরণের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফ্লাইট টিকিট ধরিয়ে দেয়।

সাংবাদিক মোহাম্মদ আলী বিষয়টি দূতাবাসের নজরে আনে এবং তাকে দূতাবাসে হাজির করে। দূতাবাস মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশনের সাথে যোগাযোগ করে তার ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির বিষয়টি সেটেল না হওয়া পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় থাকার নিশ্চয়তা দেয়। ফলে  হাইকমিশন সংশ্লিষ্ট লেবার অফিসে তাকে নিয়ে গিয়ে তার সমুদয় কাগজপত্র দাখিল করে। লেবার অফিস তার কৃত্রিম হাত লাগিয়ে দেয়, তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ দেয়, এবং আজীবন দেশে বসে পেনশন পাবার ব্যবস্থা করে দেয়। সে নিয়মিত পেনশন পাচ্ছে বলেও হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে। তবে কিছু পদ্ধতিগত সমস্যা আছে বলে মোহাম্মদ আলী জানান যে, এ ধরনের পেনশন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যক্তি জীবিত আছেন কি না  ঘোষণ দিতে হয়। এজন্য সকসো ইমেইলে ফরম প্রেরণ করে সেই ফরম পূরণ করে ফিরতি ইমেইল প্রেরণ করলেই হয়।

অনেকে ইমেইল ব্যবহার করে না। কিন্তু বাংলাদেশে বসে মালয়েশিয়া থেকে সেবা পেতে হলে এটি করতেই হবে। এজন্য সরকারের জেলা কর্মসংস্থান অফিস বা ইউএনও অফিস, বা ওয়েজ কল্যাণ বোর্ড দায়িত্ব নেয় তাহলে খুব সুবিধা হয়। কারণ এই কর্মী ভাইয়ের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে যে সে ইমেইল চেক করে নি বা করতে পারে না, সে সেই বেঁচে থাকার ফরমটি পূরণ করে দেয় নি। ফলে তার পেনশন বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এর একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আন্তরিক সহযোগিতা কাগজপত্র ও তথ্যাদি ঠিক করে ইমেইলে প্রেরণ করে একই সাথে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন বিষয়টি নিয়ে সকসো দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করে সমাধান করে দিয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশে বসে এধরনের দুর্ঘটনাজনিত সুবিধা পেতে হলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব নিতে হবে বলে তিনি জানান। বাংলাদেশ হাইকমিশন এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানান, 'যারা অবৈধ থাকে বা যাদের অবৈধ করে রাখা হয় তারা ও তাদের পরিবার এসব সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। এজন্য আমরা কর্মীকে নিয়োগকর্তার অধীনে অবস্থান করতে অনুরোধ করি এবং সমস্যা হলে লেবার অফিস এবং হাইকমিশনকে জানাইতে অনুরোধ করা হয়। ফলে সমস্যার সমাধান হয়। এজন্য মালয়েশিয়ায় বসবাসকারী কমিউনিটির মাধ্যমেও হাইকমিশনকে অবগত করা যায়।'

মিস্টার জসিম কি সোশ্যাল মিডিয়া বা কিছু কিছু সংবাদে যে বেতন কাজ ও চটকদার বিভিন্ন সুবিধা দিবে বলে প্রচার করে সেগুলো দেখে কি অনুভব করে না যে , এখান থেকে চলে যেতে? তিনি হেসে বলেন পাগলে পাইছে আমারে! ওদের ফান্দে পডিয়া সব হারাবো। তিনি বলেন, আসলে আমাদেরকে কেউ ভালো ও সঠিক তথ্য দেয় না, যা দেয় তাও পূর্ণাঙ্গ নয়। সঠিক তথ্য পেলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। কিন্তু সেটা আমি কখনই পাই নি।

আলাপ করতে করতে মিস্টার জসিম নিজ হাতে থাকা মোবাইল ফোন থেকে লাজাডা (মালয়েশিয়ায় বৃহত্তম অনলাইন কেনাকাটার ওয়েব সাইট) একটি পণ্যের অর্ডার করে। জিজ্ঞেস করলে বলেন, দেশে থাকা আত্মীয় স্বজনের জন্য কিছু কেনাকাটা করছেন। তিনি বলেন, আমার ব্যাংক কার্ড আছে সেটা দিয়েই খরচ করি ক্যাশ রাখিনা। বেতন আমার নামে ব্যাংক একাউন্ট আছে সেখানেই পাঠিয়ে দেয়। সেখান থেকেই আমি দেশে টাকা পাঠাই, আমাকে রেমিটেন্স হাউজে যেতে হয় না। এতে আমার সুবিধা হয়েছে। আমার কোম্পানির সবার জন্য এই নিয়ম।'

মালয়েশিয়ার সাথে বাংলাদেশের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মীর ব্যাংক একাউন্ট থাকতে হবে এবং সে ব্যাংক একাউন্টে বেতন ভাতাদি দিতে হবে। এটি না মানলে কোম্পানির শাস্তি হবে। ছুটিতে দেশে যাবার প্রসঙ্গে বিয়ে করছেন কি না, কনে ঠিক করেছেন কি না, পরিবারের পছন্দ না কি নিজের পছন্দ, প্রেম ভালোবাসা হয়েছে কি না বলতেই লজ্জা পেলেন, বললেন- দেখেন, আমি বেকার ছিলাম, পরিবার তেমন সম্পত্তি নেই, আমিও পড়ালেখা ভালো না। এসব নিয়ে হতাশা ছিলো। এমন অবস্থায় কেউ মেয়ে দিবে না, আমিও সাহস দেখায়নি। এখন আল্লাহর রহমতে বাড়ি করেছি, কিছু সম্পত্তি কিনেছি। আর যদি বিদেশে নাও থাকি দেশে নিজেই কর্মসংস্থান করতে পারব এমন ব্যবস্থাও করেছি। ছুটিতে তো যাচ্ছি দেখি কি করা যায়।

মালয়েশিয়ায় লেবার আইন অনুযায়ী এবং চুক্তি অনুযায়ী সাপ্তাহিক ছুটি, সরকারি ছুটি এবং বছরে ২১ দিনের ছুটি পায় বিদেশি কর্মীরা, এমন কি ছুটি নিয়ে নিজ দেশে যাবার অধিকার আছে। মি: জসিম বলেন দোয়া করেন ছুটিতে দেশে যাচ্ছি, দুই সপ্তাহ থেকে চলে আসব। কোম্পানি ফ্রি টিকিট দিয়েছে। বলেছে আমি যেন পালিয়ে অন্য কোথাও না যাই।

উল্লেখ্য, মালয়েশিয়া মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা দেওয়ায় তিনি এখন থেকে দেশে ছুটিতে যাবেন আবার মালয়েশিয়ায় এসে কাজে যোগ দিবেন। এর আগে মাল্টিপল এন্ট্রি সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশী কর্মীর ছুটিতে দেশে গিয়ে ফিরে এসে অন্য কোথাও চলে যায় ফলে নিয়োগকর্তা শাস্তি পায়। অবৈধদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, মানব পাচার ও শ্রম শোষণের অভিযোগ উঠতে থাকে আন্তর্জাতিকভাবে এবং মালয়েশিয়াকে টায়ার টু তে নামিয়ে দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বাংলাদেশীদের জন্য মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা বন্ধ করে দেয়।

সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকারের সময় পুনরায় মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা চালু করেছে। মালয়েশিয়ার আইন অনুযায়ী বিদেশি কর্মী একটানা ১০ বছর কাজ করতে পারে। সে হিসাবে তার আর বেশিদিন মালয়েশিয়ায় থাকা হবে না মনে করে দিলে মি: জসিম বলেন, আমার কাজে বস খুশি, বলেছে ১০ বছর পর দেশে গিয়ে নিয়ম মেনে আবার ভিসা দিয়ে আমাকে নিয়ে আসবে। বলেছে তখন আমার একটি টাকাও কাউরে দিতে হবে না। সব কোম্পানি দিবে।'

উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ায় আইন অনুযায়ী বিদেশি ব্যক্তির ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত কাজ করতে পারে। সে হিসাবে মিস্টার জসিম আরো ১৭ বছর কাজ করতে পারবে।

এভাবেই মালয়েশিয়ায় কাজ করে পরিবারে সমৃদ্ধি এনেছে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির পরিবার।

মি. জসিমের গল্প শুধুই একটি ব্যক্তির গল্প নয় — এটি একটি শত শত শ্রমিকের সম্ভাব্য বাস্তবতার প্রতিবিম্ব। যাদের জীবনে লোভ, ভুল তথ্য বা নকল প্রতিশ্রুতি তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।

সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই আইনের জ্ঞান, সততা ও বৈধ পথে থাকা একমাত্র আলো হয়ে দাঁড়ায়।

মালয়েশিয়ার শ্রমিকদের জন্য সঠিক তথ্য ও সচেতনতা একটি মৌলিক মানবাধিকারের অংশ — এতে শুধুই ব্যক্তি নয়, বরং একটি পুরো সম্প্রদায়ের জীবন থিতিয়ে যাবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews