১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত তেরোতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ভূমিধস বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করেছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন। এই নির্বাচনে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী, গণহত্যাকারী দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে চায়নি। জয়ী করেছে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে নিগৃহীত, নিপীড়িত বিএনপিকে। জনগণের হিসাবনিকাশ পরিষ্কার। তবে এটাও সত্যি যে নির্বাচনে যারা লড়েছে, তারা মোটা দাগে বুর্জোয়া। তাদের ভিতর বিভাজনটা স্পষ্ট। ক্ষমতাসীনদের শাসনের অধীনে অতীতে যত নির্বাচন হয়েছে কোনোটাই সুষ্ঠু হয়নি। যেজন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এবার তত্ত্বাবধায়ক নয়, ক্ষমতাসীন অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান করল। গত দেড় বছরে তারা যে সুবিধাগুলো পেয়েছে এবং তৈরি করে নিয়েছে, সবগুলোই তারা দুর্দান্তভাবে ব্যবহার করেছে। সরকার-সমর্থিত দল ব্যতীত অন্য দল নির্বাচনে জয়ী না হওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের মিডিয়া অপপ্রচার চালানো হয়। এমনকি চালিয়েছে মব সন্ত্রাস ও দমনমূলক নীতি। হামলা, মামলা ও গ্রেপ্তার তৎপরতা। তাতে গণতন্ত্রপন্থিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে আশঙ্কা ছিল। আবার নির্বাচনে অংশ না নিলে সরকার-সমর্থিত দল ব্যতীত অন্য দলের অস্তিত্বই বিপন্ন হওয়ার কারণ হবে-তেমন আশঙ্কাও ছিল। কারণ দেড় বছর ধরে সরকার যা করেছে, গণতান্ত্রিক শক্তির জন্য তা সহ্য করা আরও কঠিন হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এবং নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। দলটি বর্তমানে কার্যত নিষিদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। একটা জোট গঠনে নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপি একটি ঐতিহাসিক দায়িত্বই পালন করেছে। নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলেও অন্তত অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। শতভাগ সুষ্ঠু হয়েছে কি না, সেটা ইতিহাসই বলবে। কিছু অভিযোগ তো আছেই।
কিন্তু জামায়াত জোটের আদর্শগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। এই সময়ে তাদের এ উত্থান অতীতের সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। দলটির পেছনে রাষ্ট্র ও সরকারের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন, আশকারা মোটাদাগে দৃশ্যমান হয়েছে। জনমনে ধারণা ছিল তারাই দেশ পরিচালনা করছে। গত দেড় বছরে সরকারসংশ্লিষ্ট কেউ কেউ বুলেটের গতিতে উন্নতি করছে। এবং টাকাপয়সা যা করছে, তা বিদেশে পাচার করেছে। তাদের উন্নতিতে বঞ্চিত মানুষ, যাদের সংখ্যা শতকরা অন্তত আশিজন, তাদের উপকারটা কোথায়? দেশের অর্থনীতির এই ভঙ্গুর দশা থেকে মানুষের পরিত্রাণের উপায় তাদের শ্রম। আর বঞ্চিত তো হচ্ছে সেই শ্রমজীবীরাই, যাদের শ্রমের দরুন দেশের এত সব উন্নতি। রাজনীতিকদের আওয়াজটা ছিল গণতন্ত্র উদ্ধারের। কিন্তু গণতন্ত্র তো কেবল ভোটের ওপর নির্ভর করে না, গণতন্ত্রের মূল কথাটাই হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা। তার কথা কি বিজয়ী দল কার্যকরভাবে ভাববে?
এই নির্বাচন যে কাজটা বেশ সুন্দরভাবে করল, সেটা হলো বুর্জোয়াদের রাজনীতির ভিতরকার অন্তঃসারশূন্যতার অধিকতর উন্মোচন। টাকার দৌরাত্ম্যের কথা বাদই দিলাম, সেটা তো ব্যাপক মাত্রায় ঘটলোই। কিন্তু দলবদল? সেটা ঘটল কোন টানে? সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটালেন দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তারা আওয়ামী লীগের শাসনের অত্যন্ত কঠিন সমালোচক ছিলেন, কিন্তু যোগ দেন জামায়াতে ইসলামীতে। তার চেয়েও বড় ব্যাপার-তারা রাজনীতিতে এসেছেন জিয়াউর রহমানের হাত ধরে; ছিলেন বিএনপিতে। দলের প্রার্থী হিসেবে এমপি, মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। বিএনপি যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা বলত। তারা দুজন ওই আদর্শের নিবেদিতপ্রাণ প্রচারক ছিলেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে বাঙালি জাতীয়তাবাদে। তারা যে জামায়াতের জোটে যোগ দিয়েছেন, সেটা কি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ত্যাগ করে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে? শেষ পর্যন্ত তাদের কি ধারণা হয়েছে-জাতীয়তাবাদ বিষয়ে তাদের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত ভ্রান্ত ছিল? এবং ওই আদর্শের প্রচারক হিসেবে মানুষকে এতদিন তারা বিভ্রান্ত করেছেন? তেমন একটা ঘোষণা দিলে তবু বোঝা যেত যে, দলবদলের ব্যাপারটা নিতান্ত সুবিধাবাদিতা নয়, ভিতরে সারবস্তু কিছু আছে। বাস্তবে তাদের এই বিচ্যুতি অনিবার্য রূপে সুবিধাবাদ। এবং তাদের কোনো প্রাপ্তিলাভও ঘটেনি।
নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছে। কেমন হবে তার ধরন এখনই তা বলার সময় নয়। এর পরে কী কী ঘটবে তা তো বলা যাচ্ছে না। সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি বিরোধী দল থাকা চাই, না-থাকলে চলে না। তাই এবারও সেটা থাকবে। তবে এবার সেটি জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোট। ভোট নিয়ে একটা যুদ্ধ রীতিমতো হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে এই বিজয় কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে চিন্তা করলে দুশ্চিন্তা বাড়বারই শঙ্কা। আপাতত তাকে তাই ছুটি দেওয়া যাক। তবে এটা সত্য হয়ে থাকবে যে সংসদে নির্বাচিত হওয়ার অর্থ মস্ত বড় একটা সরকারি চাকরি পাওয়া। যে চাকরির ক্ষমতা ও অর্থ উভয় প্রাপ্তির মস্ত মস্ত সুযোগ এনে দেয়। সেজন্যই তো এত প্রার্থী, এত অর্থের আদানপ্রদান। ব্যবসায়ীরা তো আছেনই, থাকবেনও, তাঁদের লোকেরাও থাকবে। সবাই মহা উৎসাহী। কোনোকালে রাজনৈতিক কর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, ভুলেও জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়াননি, তাতে কী? গরমে বিলের পানি কমেছে, মাছেরা সব খলবল করছে, ধরতে ছুটবেন না, এমন বোকা এরা নন। নির্বাচন এক ধরনের খেলাও বটে।
সিভিল সোসাইটি সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের কথা বলে। রাষ্ট্রও কিন্তু তাদেরই চায়। রাষ্ট্রের কামনাটা হলো এই রকমের : যারা নির্বাচিত হয়ে আসবে তারা রাষ্ট্রের প্রচলিত চর্চিত ব্যবস্থাপনার প্রতি সৎ থাকুক। যোগ্যতার সঙ্গে রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক চরিত্রটাকে অক্ষুণ্ন রাখার ব্যাপারে কাজ করে যাক। সিভিল সোসাইটি প্রদত্ত সততা ও দক্ষতার প্রকাশ্য সংজ্ঞা ও রাষ্ট্র প্রদত্ত অপ্রকাশ্য সংজ্ঞার ভিতর পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে সৎ (অর্থাৎ দুর্নীতিপরায়ণ নয়) এবং যোগ্য (অর্থাৎ সুশিক্ষিত, কর্মকুশল ইত্যাদি) মানুষ যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি যায়, তখন তারা যদি ব্যক্তিগত সততা রক্ষা করতে চায়, তাহলে হয় বিপদে পড়বে, নয়তো অযোগ্য বলে চিহ্নিত হবে। তাই দেখা যায়, ক্ষমতা পেলে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা তাদের ‘চরিত্র’ হারায় এবং আর পাঁচজনে যা করে তাই করতে থাকে। বরঞ্চ বেশি মাত্রায়ই করে। এবং রাষ্ট্রীয় মানদণ্ডে বিশেষ রকমের যোগ্য বিবেচিত হওয়ার দরুন শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি করতে থাকে। উন্নতির পথ যে রাষ্ট্রীয় অগণতান্ত্রিকতার সঙ্গে সহযোগিতার দ্বারা প্রশস্ত হয় তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ওই পথে এগিয়ে আসার জন্য তারা অন্যদের নীরবে আহ্বান জানাতে থাকে। এমন অভিজ্ঞতা তো আমাদের রয়েছেই।
তবে শুধু বাংলাদেশ বলে নয়, বিশ্বজুড়েই বুর্জোয়া গণতন্ত্র এখন বেশ ভালো রকমের মুশকিলের মধ্যে পড়েছে। এই সংকট পুঁজিবাদেরই সংকট। পুঁজিবাদ এখন তার অন্তিম সময়ে এসে পৌঁছেছে। তাই তো দেখা যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ঘরেবাইরে নিন্দিত একজন লোকও পুনরায় নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। এবং সেটা ঘটছে গণতন্ত্রের তীর্থস্থান বলে স্বীকৃত খোদ আমেরিকাতেই। অন্যত্রও দক্ষিণপন্থিরাই নির্বাচিত হয়ে আসছে। যাঁরা সমাজ-পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন, তাঁরা পিছিয়ে যাচ্ছেন। এমনটা ঘটাবার ক্ষমতা পুঁজিবাদ রাখে। পুঁজিবাদের যেটা স্বভাবগত, সেটাই সে করে চলেছে, করতলগত অর্থ, কূটকৌশল, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন হাতিয়ার ব্যবহার করে। এবং মানবতাবিদ্বেষী বর্ণবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ ইত্যাদি প্রচারে সামান্যতম বিরতি দিচ্ছে না। মানুষের সভ্যতার হাজার হাজার বছর ধরে অর্জিত জ্ঞান ও অর্জনের সমস্তটা নিয়ে একটি খাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সভ্যতা কী বিপজ্জনক যে-পথ ধরে এগোচ্ছে, সেই পথ ধরেই এগোবে এবং খাদের মধ্যে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে? নাকি পথ বদলে ব্যক্তিমালিকানাকে পরিত্যাগ করে, সামাজিক মালিকানার দিকে এগিয়ে নিজেকে এবং মানবজাতিকেও বাঁচাবে? বাঁচাবে প্রাণী এবং প্রকৃতিকেও? এককালে এই ধরাধামে ডাইনোসর নামে বিরাটাকার এক প্রাণী ছিল। তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মানব প্রজাতিও কী সেভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে? এবং সেই ধ্বংসের জন্য অন্য কেউ নয়, দায়ী হবে সে নিজেই? সবকিছুই তো ভেঙেচুরে যাচ্ছে। মানবিক সম্পর্কগুলো আর মানবিক থাকছে না। এগুলো তো নমুনা মাত্র। এদের তুলনাতেও কত কত ভয়ংকর সব ঘটনা যে প্রতিনিয়ত ঘটছে, যার খবর আমরা রাখি না। এবং না-রাখাটাই হয়তো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মঙ্গলজনক।
আমরা আশা করব এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বািচত সরকার দেশে শান্তি-স্থিতি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা সুদৃঢ় ও গতিশীল করবে।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়