কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে কক্সবাজারে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড ছিল না; এটি জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে একটি পুলিশ চেকপোস্টে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের মধ্যে, যারা এটিকে কেবল একটি অপরাধ নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন।
২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি আদালত ওই হত্যার জন্য তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাস ও ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরো ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে হাইকোর্ট এই রায় বহাল রাখেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়, যেখানে প্রদীপকে মূল পরিকল্পনাকারী এবং লিয়াকতকে সরাসরি গুলি চালানো ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও এখনো এই রায় কার্যকর হয়নি। আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আপিল বিভাগে আরো আপিলের সুযোগ থাকায় মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এই মামলায় জনগণের প্রত্যাশা শুধু রায় দেয়াতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই রায় বাস্তবায়নের মধ্যেই তারা প্রকৃত বিচার দেখতে চান। কারণ বিচার বিলম্বিত হলে অনেক ক্ষেত্রেই তা বিচার অস্বীকারের সমতুল্য বলে মনে হয়। এই বিলম্বের বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে।
প্রথমত, বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়া একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। একটি আলোচিত ও জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মামলার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন যদি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- আইনের শাসন কি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর? বিচার যদি দেরিতে হয়, তবে তা কার্যত বিচার না পাওয়ার সমতুল্য ‘Justice delayed is justice denied’ এই কথাটি এখানে বাস্তব হয়ে ওঠে। যখন মানুষ দেখে যে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে আইন সম্পর্কে অনাস্থা তৈরি হয়। এই অনাস্থা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সামাজিক সঙ্কটে রূপ নিতে পারে, যেখানে মানুষ আইনকে শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে আর বিশ্বাস করে না।
দ্বিতীয়ত, এটি সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের মনোবলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। একজন সাবেক সেনাকর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিচার বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে, তা বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত উভয় সদস্যের মধ্যেই উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তারা প্রশ্ন করতে পারেন, রাষ্ট্র কি তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা যথাযথভাবে রক্ষা করতে সক্ষম? একটি পেশাদার বাহিনীর জন্য মনোবল (morale) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই মনোবল অনেকাংশেই নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তার ওপর। যদি তারা অনুভব করেন যে তাদের সহকর্মীর ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হচ্ছে, তবে তা তাদের আত্মবিশ্বাস ও পেশাগত অনুপ্রেরণায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তৃতীয়ত, বিচার বিলম্ব নানা ধরনের আশঙ্কা ও সন্দেহের জন্ম দেয়। সমাজে তখন প্রশ্ন ওঠে এই বিলম্ব কি শুধুই প্রশাসনিক জটিলতার কারণে, নাকি এর পেছনে কোনো অভ্যন্তরীণ বা বহিরাগত প্রভাব কাজ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর সত্য হোক বা না হোক, এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। কারণ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা শুধু বাস্তবতার ওপর নয়, মানুষের উপলব্ধির ওপরও নির্ভর করে। যখন বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়, তখন গুজব, ভুল তথ্য এবং সন্দেহ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে সামাজিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা দুর্বল হয়ে পড়ে।
চতুর্থত, এর রাজনৈতিক প্রভাবও কম নয়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ প্রত্যাশা করে- ন্যায়বিচার দ্রুত, স্বচ্ছ এবং দৃশ্যমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। যদি তা না হয়, তবে সরকারের কার্যকারিতা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এ ধরনের বিলম্বকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। একই সাথে এটি সরকারের ওপর জনগণের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে শাসনব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এই চারটি বিষয়ের বাইরেও আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে- আইনের শাসনের প্রতীকী শক্তি। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা বিশ্বাস করে, অন্যায়ের বিচার অবশ্যই হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমানভাবে। বিচার বিলম্বিত হলে শুধু একটি মামলাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। অতএব, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলার ক্ষেত্রে দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার বাস্তবায়ন শুধু আইনি প্রয়োজন নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপনের একটি অপরিহার্য শর্ত। ন্যায়বিচার তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সময়মতো, নিরপেক্ষভাবে ও দৃশ্যমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি মামলার রায় কেবল আদালতের কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে জনগণের মনে তার প্রভাব সীমিত থাকে; কিন্তু যখন সেই রায় বাস্তবে কার্যকর হয়, তখনই আইনের শাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস দৃঢ় হয়।
রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি হলো আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয় এবং কোনো ক্ষেত্রে বিলম্ব বা দ্বিধা দেখায় না। একই সাথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- বিচার যেন কখনোই বাছাই করা বা নির্বাচিত (selective justice) না হয়। মেজর সিনহার ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি প্রতীকী রূপ নিয়েছে, কারণ এটি জাতীয়ভাবে আলোচিত এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এর বাইরেও দেশে বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ড, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ, গুম, হেফাজতে মৃত্যু বা রহস্যজনক নিখোঁজের মতো বহু ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর অনেকগুলোর বিচার এখনো অনিশ্চিত বা অসম্পূর্ণ। যদি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে একটি আলোচিত মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত হয়; কিন্তু অন্যান্য কম আলোচিত বা রাজনৈতিকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো উপেক্ষিত থাকে, তাহলে তা আইনের শাসনের মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ আইনের মূল নীতি হলো সমতা (equality before law)।
এ ধরনের নির্বাচিত বিচার একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে। এতে জনগণের মধ্যে একটি ধারণা জন্মায়, ন্যায়বিচার নির্ভর করে ঘটনাটির গুরুত্ব, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বা জনমতের চাপের ওপর। এর ফলে সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করে, তাদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন, যদি তাদের ঘটনা আলোচিত না হয় বা তারা প্রভাবশালী না হয়। এই মানসিকতা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয় এবং সামাজিক অসন্তোষ বৃদ্ধি করে। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এটি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা দুর্বল করে। যখন কিছু ক্ষেত্রে বিচার হয় আর কিছু ক্ষেত্রে হয় না, তখন দায়মুক্তির (impunity) সংস্কৃতি তৈরি হয়। অপরাধীরা মনে করতে পারে, তারা পার পেয়ে যেতে পারে, যদি তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক বা রাজনৈতিক চাপ কম থাকে। এটি দীর্ঘমেয়াদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে দুর্বল করে এবং অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়।
সব ধরনের অপরাধ তা যতই সংবেদনশীল বা অসংবেদনশীল হোক সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও বিচার করা হয়, তাহলে একটি শক্তিশালী বার্তা যায়- রাষ্ট্র কোনো অন্যায় সহ্য করবে না। এতে শুধু ভুক্তভোগীরাই ন্যায়বিচার পায় না; বরং পুরো সমাজে একটি ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়। ন্যায়বিচার কখনোই আংশিক বা নির্বাচিত হতে পারে না। এটি হতে হবে সর্বজনীন, নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যখন প্রতিটি নাগরিক নিশ্চিত হয়- তার অবস্থান, পরিচয় বা প্রভাব যাই হোক না কেন, আইন তার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। সুতরাং, মেজর সিনহার মামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার দ্রুত ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নের পাশাপাশি, দেশের সব ধরনের হত্যাকাণ্ড, গুম, হেফাজতে মৃত্যু এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোরও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিচার নিশ্চিত করা জরুরি যাতে ন্যায়বিচার কেবল একটি ব্যতিক্রম না হয়ে, একটি প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ডে পরিণত হয়।
অতএব, প্রয়োজন একটি সমন্বিত, স্বচ্ছ এবং সময়োপযোগী বিচারব্যবস্থা, যেখানে মামলার আপিল প্রক্রিয়া অযথা দীর্ঘায়িত না হয়, বিচার কার্যকর করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব বা বিলম্ব না থাকে, আইনের প্রয়োগ সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে নিশ্চিত হয়, বিচার শুধু হওয়াই যথেষ্ট নয়; তা দৃশ্যমানভাবে বাস্তবায়িত হওয়াও জরুরি। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে চায়- তার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে, ন্যায়সঙ্গতভাবে এবং দৃঢ়তার সাথে বিচার দিতে সক্ষম। মেজর সিনহার মামলা সেই সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই রায় যথাসময়ে কার্যকর হলে এটি একটি শক্ত বার্তা দেবে- কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং রাষ্ট্র ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, জাতি প্রতিশোধ চায় না; তারা চায় ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের নিশ্চয়তা। তাই এই মামলাসহ অন্যান্য অনুরূপ মামলায় দ্রুত বিচার কার্যকর করা এখন শুধু আইনি দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের একটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্তব্য।
লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক