মধ্যযুগ সাধারণত খ্রিষ্টীয় পঞ্চম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী কালপর্ব। এই সময়ের পয়লা অংশে (৫০০ থেকে ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ) ইউরোপে ছিল নিরন্ধ্র অজ্ঞতা, বর্বরতা। এর পরের শতাব্দীগুলোতে তারা প্রধানত মুসলিমদের উস্তাদিতে জ্ঞানের সাথে যুক্ত হতে থাকে। তবে গতি ছিল ধীর। এই কালপর্বও সংজ্ঞায়িত হয় ধর্মীয় গোঁড়ামি, যুদ্ধ ও বর্বরতার দ্বারা। অজ্ঞানতার থিকথিকে অন্ধকারে ভরা অধ্যায়গুলো পেছনে রেখে ইউরোপ নিজেদের জাগরণের নাগাল পেল রেনেসাঁর বীজতলায়। সেই বীজতলা তৈরির কাজ চলছিল চতুর্দশ শতক বা আরো আগ থেকেই। ষোড়শ শতকে এর সুফল দৃশ্যমান হতে থাকল।
মধ্যযুগীয় ইউরোপ অতিক্রম করেছে ক্রুসেডের রক্তস্রোতা ময়দান। ইউরোপের সম্মিলিত জাগরণের শৈশব ছিল এই ক্রুসেড। এর পেছনে ছিল ইসলামের প্রতি ঘৃণা, ভয়, প্রতিহিংসা ও দখলের নেশা। অনবরত ইসলামঘৃণা সেখানকার শৈশবের সামষ্টিক ট্রমায় পরিণত হয়। মধ্যযুগে এই ঘৃণাভাষ্য সরাসরি খিস্তিখেউড় আকারে প্রচারিত হতো। রেনেসাঁর পরে ইউরোপ তলব করতে থাকল পুরনো ঘৃণার নতুন প্রকাশরীতি।
খ্রিষ্টীয় মনের ইসলাম সমালোচনার প্রাথমিক ধারা তৈরি করেন জন অব দামেশকির মতো ব্যক্তিরা। জন ছিলেন উমাইয়া যুগের খ্রিষ্টীয় নেতা। তিনি তার রচনায় ইসলামকে নানাভাবে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। ইসলামকে তিনি খ্রিষ্টবাদের বিকৃত রূপ হিসেবে হাজির করেন। তার পদ্ধতি অনেক প্রাচ্যবিদের কাছে শ্রদ্ধা লাভ করে।
১১৪৩ খ্রিষ্টাব্দে কুরআনুল কারিমের প্রথম ল্যাটিন অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অনুবাদকর্ম আঞ্জাম দেন ফাদার পিটার দ্য ভেনারেবল। Lex Mahumet pseudoprophete (মিথ্যা নবী মুহাম্মদের আইন) নামে প্রকাশিত এই অনুবাদের মূলে ছিল অস্বীকৃতি ও বিকৃতি। তবুও সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে একেই মনে করা হতো আল কুরআনের নির্ভরযোগ্য অনুবাদ। ফাদার পিটার কুরআনুল কারিম, রাসূল সা: এবং ইসলামের আরো অন্যান্য বিষয়ের উপর দুশমনি ভরা বই লেখেন। Summa totius haeresis Saracenorum নামক এই গ্রন্থ ঘৃণা ও মিথ্যায় ফেনায়িত।
ক্রুসেড চলাকালে ইউরোপে ইসলাম ও মুহাম্মদ সা: সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক লেখালেখি হয়। ধারাবাহিকভাবে তাতে ইসলামকে দোষারোপ করা হয়। খ্রিষ্টান পাদ্রিরা যুদ্ধের প্রচারণার জন্য নানা বানোয়াট গল্প মানুষকে শোনাতে থাকে। দাবি করা হয়- রাসূল সা: মৃগীরোগী ছিলেন। তিনি ইহুদি-খ্রিষ্টান ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ইসলাম ধর্ম তৈরি করেন। তার জীবন ছিল অনৈতিক... ইত্যাদি।
তখনকার ইউরোপীয় ইসলাম-ভাষ্য ছিল বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী এবং মিথ্যা দ্বারা পরিপূর্ণ। এর সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শত্রুতা। কিন্তু এরই মধ্যে প্রবহমান ছিল আরেক অন্তঃসলীলা।
মধ্যযুগীয় ইউরোপে ইসলাম ও মহানবী সা: সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি একরৈখিক ছিল না। একদিকে ছিল বিরোধ, অন্যদিকে নির্ভরতা। একদিকে ছিল অধিগ্রহণ, অন্যদিকে প্রবল শত্রুতা।
ধর্ম ইসলামকে প্রত্যাখ্যান, বিকৃতি ও অবমূল্যায়নের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হচ্ছিল। অপর দিকে, বাস্তব জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ইউরোপ ক্রমশ ইসলামী সভ্যতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছিল। এই দ্বৈততা মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় মানসিকতার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
আন্দালুস ও সিসিলিতে মুসলিম শাসনের অধীনে যে জ্ঞানচর্চা বিকশিত হয়, তা ইউরোপীয়দের সামনে এক নতুন জগত উন্মোচন করে। কর্ডোভা, টলেডো ও সেভিলের মতো শহরগুলো হয়ে ওঠে জ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। ইউরোপীয় শিক্ষার্থীরা এসব অঞ্চল থেকে ইসলামী বিজ্ঞান, দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্রের ঔৎকর্ষ আহরণ করেন।
এই জ্ঞানের জন্য আরবি ভাষা শেখা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ইউরোপে ধীরে ধীরে আরবি ভাষা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। অভিজাতদের মধ্যে জন্ম নেয় আরববাদী সংস্কৃতি। গেবার্ট অব অরিল্যাক (Gerbert of Aurillac) আন্দালুসে গিয়ে গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা শেখেন। ইউরোপে ফিরে এসে আরবি সংখ্যা-পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের ব্যবহার প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন।
এই প্রবণতা পরবর্তীতে স্পেনে একটি বৃহৎ অনুবাদ আন্দোলনে পরিণত হয়। যার কেন্দ্র ছিল টলেডো। এখানে আরবি ভাষা থেকে ল্যাটিনে বিপুল বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক গ্রন্থ অনূদিত হয়। জেরার্ড অব ক্রিমোনা ছিলেন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও অনুবাদক।
সিসিলিতে মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি পণ্ডিতদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে একটি বহু সাংস্কৃতিক জ্ঞান-বিনিময় পরিবেশ গড়ে ওঠে। যা ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইউরোপীয়রা ইসলামী সভ্যতা থেকে দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানও গ্রহণ করে। আল-খারিজমির বীজগণিত, ইবনে সিনার কানুন ফিত ত্বিব এবং আবু রুশদের অ্যারিস্টটল ব্যাখ্যা ইত্যাদি ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পরবর্তী রেনেসাঁর ভিত্তি নির্মাণে সহায়ক হয়।
তবে এই জ্ঞান আহরণ সাধারণত উৎস-স্বীকৃতি ছাড়াই ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে বেনামীকরণের মধ্য দিয়ে জ্ঞানের ইসলামী উত্তরসূরিতাকে অস্বীকার করা হয়। অনেক সময় মূল লেখক, উদ্ভাবক বা বিশ্লেষকের নাম গায়েব করে দেয়া হয়।
ক্রুসেডের সময় এই দ্বৈততা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখনকার সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিতেও ইউরোপীয়রা মুসলিম সমাজ থেকে সামরিক কৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং নগর জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করে।
এর মানে পরিষ্কার। মুসলমানদের সাথে ইউরোপ জারি রেখেছিল জ্ঞানীয় সম্পর্ক। ধর্মীয় ক্ষেত্রে শত্রুতা; কিন্তু অন্যান্য জ্ঞানীয় প্রশ্নে অধিগ্রহণ। তারা মুসলমানদের থেকে সভ্যতাগত উন্নতির ক্ষেত্রগুলো আহরণের লক্ষ্যে তাদের শাগরেদি গ্রহণে উদগ্রীব থেকেছে। মধ্যযুগ শেষ হওয়ার পরও মুসলিম সভ্যতা থেকে অধিগ্রহণ ও আত্তীকরণ থেমে যায়নি। তখনো ইউরোপীয়রা ইসলাম ও প্রাচ্যকে অধ্যয়ন করেছে। বিশেষত উসমানী সাম্রাজ্যের বিকাশ ও বিস্তারের সময়টিতে।
এই প্রবণতার উদাহরণ হতে পারেন সপ্তদশ শতাব্দীর একজন প্রভাবশালী ফরাসি প্রাচ্যবিদ বার্থেলেমি ডি হারবেল্ট। ইউরোপীয় প্রাচ্যচর্চার প্রাথমিক পর্বে তিনি গুরুত্বপূর্ণ। স্পেনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ এবং ইতালির বন্দর নগরীগুলোর মুসলিম জগতের সাথে নিবিড় সংযোগ তাকে আরবি ভাষা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার দিকে আকৃষ্ট করে। ১৬৯৫ সালের ৮ ডিসেম্বর প্যারিসে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি প্রাচ্য ভাষা ও ইসলামী সভ্যতা নিয়ে কাজ চালিয়ে যান। তার প্রধান রচনা Bibliothèque orientale (প্রকাশিত ১৬৯৭, মরণোত্তর) ইউরোপে প্রাচ্য বিষয়ক একটি মানগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বকোষধর্মী এই বই মূলত মুসলিম পলিম্যাথ হাজি খলিফা ওরফে কাতিপ চেলেবির কাশফুজ জুনুন আন আসামিল কুতুব ওয়াল ফুনুনের ফরাসি রূপ। অর্থাৎÑ মুসলিম উৎস থেকেই তিনি তার জ্ঞান আহরণ করেছেন। কিন্তু সেই উৎসের ওপর নির্ভর করেও ইসলামের উপস্থাপনায় তিনি ভয়াবহ ধরনের বৈরী আচরণ করেছেন, অবমাননাকর ভাষ্য নির্মাণ করেছেন।
হারবেল্ট মহানবী সা:-কে প্রতারক হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যা ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত আক্রমণ। ইসলাম সম্পর্কে তার বয়ানে আছে তীব্র ধর্মীয় পক্ষপাত ও মানসিক ক্ষোভের বেপরোয়া জাহিরি। এই প্রবণতার জন্য পশ্চিমা বিবেকের উচিত লজ্জিত হওয়া এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা। তারা শতাব্দীর পরে শতাব্দী ধরে ইসলাম থেকে আহরণ করেছে এবং রাসূলুল্লাহ সা:-কে অবমাননা করেছে।
অষ্টম-নবম শতকে স্পেনের খ্রিষ্টান ধর্মযাজক য়োলোগিয়াস অব কর্ডোভা এবং পাউল আলভারাস নবী-অবমাননামূলক সাহিত্যধারা শুরু করেন। যদিও তারা কর্ডোভার মুসলিম বিদ্যাব্যবস্থার শিক্ষার্থী ছিলেন। জনপরিসরে উস্তানিমূলক নবী অবমাননাকে তারা আন্দোলনে পরিণত করেন। ‘তাদের দীর্ঘ ছায়া পরে ইউরোপীয় বৌদ্ধিক জগতে বিস্তৃত হয়।’
মধ্যযুগীয় গ্রন্থ The Song of Roland মুসলিমদের মূর্তিপূজক হিসেবে চিত্রিত করেছে। দেখানো হয়েছে, মুসলিমরা ‘Apollo’, ‘Tervagant’ ও ‘Mahomet’ পূজা করে, যা সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বিকৃত উপস্থাপনা।
মহাকবি দান্তে তার ডিভাইন কমেডির ধারণা আহরণ করেন নবীজি সা:-এর মেরাজের বিবরণ থেকে। কিন্তু তিনি তার ইনফার্নো অংশে মহানবী সা:-কে নরকের অষ্টম স্তরে স্থান দেন।
এই ধারারই নজির হতে পারে হামফ্রি প্রাইডক্সের গ্রন্থ দ্য ট্রু নেচার অব ইম্পোস্টার। এখানে মহানবী সা: সম্পর্কে উপস্থাপনা স্পষ্টতই বিদ্বেষপূর্ণ ও ভিত্তিহীন। আরব সমাজকে সহিংস ও লাম্পট্যময় হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে নবীজির চরিত্র বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়।
ক্যারেন আর্মস্ট্রং এ ধরনের রচনার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, এগুলো মূলত শতাব্দীজুড়ে সঞ্চিত কুসংস্কার, ভয় ও ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার পুনরাবৃত্তি।
মধ্যযুগীয় ইউরোপে মহানবী সা:-কে ঘিরে তৈরি করা হয় বহু কল্পকাহিনী। প্রচলিত কাহিনীর মধ্যে ছিল- প্রশিক্ষিত কবুতরের মাধ্যমে ওহি আসার ভান, শূন্যে ভাসমান কুরআনের অলৌকিকতা, কিংবা মৃগীরোগ সংক্রান্ত অপপ্রচার। ক্যারেন আর্মস্ট্রং কবুল করেছেন, এসবই মূলত ‘ভয় ও অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয়া কল্পনাপ্রসূত গল্প গঠন।’
এসব কাহিনী কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এগুলো শিক্ষিত বৌদ্ধিক পরিসরেও গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এর ফলে একটি দীর্ঘস্থায়ী ইসলামবিরোধী স্থির কুসংস্কার গড়ে ওঠে। যা সত্যনিষ্ঠ গবেষণার পরিবর্তে ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাজনৈতিক আশঙ্কা এবং সাংস্কৃতিক ভয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়। এই প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণে আর ডব্লিউ সাউদার্ন স্বীকার করতে বাধ্য হন, মধ্যযুগীয় ইউরোপে ইসলাম সম্পর্কে ধারণা গঠনে বাস্তব তথ্যের চেয়ে কল্পনা ও ভীতি অনেক বেশি কার্যকর ছিল।
তথ্যসূত্র :
George Makdisi, The Rise of Colleges: Institutions of Learning in Islam and the West (Edinburgh: Edinburgh University Press, 1981), 22-25.
Norman Daniel, Islam and the West: The Making of an Image (Oxford: Oneworld, 1993), 39-45.
John of Damascus, Writings, trans. Frederic H. Chase (Washington D.C.: Catholic University of America Press, 1958), 153-157.
Richard Southern, Western Views of Islam in the Middle Ages (Cambridge, MA: Harvard University Press, 1962), 38-41.
Kritzeck, James, Peter the Venerable and Islam (Princeton: Princeton University Press, 1964), 115-118.
Daniel, Islam and the West.
Menocal, 2002.
Haskins, C.H. (1927). The Renaissance of the Twelfth Century. Cambridge, MA: Harvard University Press.
Burnett, C. (2001). The Coherence of the Arabic-Latin Translation Program in Toledo. Science in Context, 14(1-2), pp. 249-288.
Saliba, G. (2007). Islamic Science and the Making of the European Renaissance. Cambridge, MA: MIT Press.
Noel Malcolm, Useful Enemies: Islam and the Ottoman Empire in Western Political Thought, 1450-1750 (Oxford: Oxford University Press, 2019).
Hamilton 2001.
Asín Palacios, M. (1919). La Escatología musulmana en la Divina Comedia. Madrid.
Prideaux, H. (1697). The True Nature of Imposture Fully Display’d in the Life of Mahomet. London.
Southern, R. W. (1962). Western Views of Islam in the Middle Ages. Cambridge: Harvard University Press.
লেখক : কবি ও গবেষক